ঢাকা     মঙ্গলবার   ১৬ জুন ২০২৬ ||  আষাঢ় ২ ১৪৩৩ || ৩০ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

ইরান সংকট শেষে এবার ইউক্রেনে নজর ট্রাম্পের, চিন্তায় ইউরোপ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:৩৩, ১৬ জুন ২০২৬   আপডেট: ১৪:৪৪, ১৬ জুন ২০২৬
ইরান সংকট শেষে এবার ইউক্রেনে নজর ট্রাম্পের, চিন্তায় ইউরোপ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

ইরান সংকট কাটিয়ে ওঠার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দিকে মনোনিবেশ করায় কিয়েভের মিত্র দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। 

আরো পড়ুন:

ফ্রান্সে চলমান জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সম্ভাব্য কোনো বড় ধরনের মতবিরোধ এড়াতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ইউরোপীয় নেতারা। 

মঙ্গলবার (১৬ জুন) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকো। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, নিজের জন্মদিনের পরের দিন (সোমবার) ফ্রান্সে পৌঁছে ট্রাম্প বেশ হাসিখুশি ছিলেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁর সঙ্গে একটি বৈঠকে বসার আগে সাংবাদিকদেরকে ট্রাম্প বলেন, সবকিছুই ‘চমৎকার’ চলছে। 

এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানান, তিনি এখন তার এই নতুন সময় কাজে লাগিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধান করবেন। যেটি তিনি ২০২৪ সালের নির্বাচনি প্রচারণার সময় ক্ষমতায় আসার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

ম্যাখোঁর পাশে বসে ট্রাম্প বলেন, “যেহেতু ওটা (ইরান সংকট) শেষ হয়েছে, এখন আমরা এর (ইউক্রেন যুদ্ধ) ওপর মনোযোগ দেব এবং দেখব এর সমাধান করা যায় কি না। প্রতি মাসে ২৫ হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে, যাদের বেশিরভাগই সৈনিক। এমনটা হওয়া উচিত নয়।”

তবে ইউক্রেনের ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলোর কাছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই কথাগুলো খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়।

ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের ভয়- ইরান সংকট সামলানোর চাপ থেকে মুক্ত হয়ে ট্রাম্প এখন ইউক্রেন শান্তি আলোচনার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। এর ফলে ইউরোপীয়রা কোণঠাসা হয়ে পড়তে পারে এবং রাশিয়ার ওপর সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টি ও ইউক্রেনকে পূর্ণ সমর্থনের যে কৌশল তারা নিয়েছে, তা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

পলিটিকোকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কূটনীতিক বলেন, “ট্রাম্প অন্য কাজে (ইরান যুদ্ধে) ব্যস্ত থাকাটা আমাদের জন্য খুব একটা খারাপ ছিল না।”

ইউক্রেন যুদ্ধ কীভাবে শেষ করা যায় সেই প্রশ্নটি মঙ্গলবার (১৬ জুন) আবার সামনে আসবে, যখন ট্রাম্প এবং অন্যান্য জি-৭ নেতারা ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে দুই ঘণ্টার একটি কার্যনির্বাহী অধিবেশনে বসবেন।

জেলেনস্কি প্রকাশ্যেই বলে আসছেন যে, যুদ্ধ শেষ করতে মার্কিন সম্পৃক্ততা খুবই জরুরি। তিনি জানান, রবিবার (১৪ জুন) ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপের সময় তাদের মধ্যে ‘শান্তি ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে এমন কিছু ভালো আইডিয়া’ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা পলিটিকোকে বলেন, “প্রেসিডেন্টের একটি মানবিক হৃদয় আছে এবং তিনি চান এই যুদ্ধ মিটে যাক যেন কাণ্ডজ্ঞানহীন এই হত্যাযজ্ঞ বন্ধ হয়। প্রেসিডেন্ট ও তার দল রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে কঠোর পরিশ্রম করছে এবং তিনি আশাবাদী যে শেষ পর্যন্ত আমরা একটি শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারব।”

কিন্তু ইউরোপীয়দের মূল আশঙ্কার জায়গা হলো ট্রাম্পের একতরফা নীতি। রবিবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলার পর ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, তিনি ‘কিছু করার’ পথ দেখতে পাচ্ছেন। এতে ইউরোপীয়রা আবারো নিজেদের গুরুত্ব হারানোর ভয় পাচ্ছে।

এর জবাবে সোমবার ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট যুক্তি দেখান যে, ইউরোপ এখন ইউক্রেনের অস্ত্রের বিল পরিশোধ করছে, তাই এ বিষয়ে তাদেরও কথা বলার অধিকার আছে। তিনি টিএফ-১ চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, “সঠিক আলোচনা হবে সেটিই, যেখানে ইউক্রেন ও রাশিয়া টেবিলের একপাশে বসবে এবং ইউরোপীয় ও আমেরিকানরা তাদের পাশে থাকবে।”

সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন বলেন, ইউক্রেনকে আর্থিক সহায়তা বাড়ানো জি-৭-এর আলোচ্য সূচির শীর্ষে থাকা উচিত।

তিনি উল্লেখ করেন, চলতি এবং আগামী বছরের জন্য কিয়েভের প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তার দুই-তৃতীয়াংশ (প্রায় ৯০ বিলিয়ন ইউরো) ইইউ বহন করছে। বাকি এক-তৃতীয়াংশের জন্য তিনি অন্যান্য সহযোগীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা বলেন, “প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হওয়া এই সংঘাত বন্ধে জি-৭-এর ‘একতা ও সংকল্প’ অপরিহার্য।

তবে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর আগেই ট্রাম্প ইউরোপীয়দের উদ্বেগের কারণ বাড়িয়ে দিয়েছেন- বিশেষ করে নিজের জন্মদিনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে দীর্ঘ ফোনালাপের মাধ্যমে।

ট্রাম্প বলেন, “গতকাল প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এবং প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে আমার খুব ভালো আলোচনা হয়েছে এবং আমি মনে করি, হয়তো আমরা সেখানে কিছু করতে পারব। আমার মনে হয় তারা দুজনেই আলোচনার বিষয়ে বেশ আগ্রহী।”

ইউরোপের উদ্বেগ আরো বাড়িয়ে দিয়ে পুতিনের উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ জানিয়েছেন, ইউক্রেন বিষয়ে ট্রাম্পের নিযুক্ত আলোচক স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার অদূর ভবিষ্যতে মস্কো সফর করবেন।

মঙ্গলবার (১৬ জুন) জি-৭ নেতাদের ইউক্রেন বিষয়ক বৈঠকে দুটি প্রশ্ন আলোচনায় প্রাধান্য পেতে পারে: কীভাবে পুতিনকে শান্তির জন্য গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করতে রাজি করানো যায় এবং ইউক্রেনের মিত্রদের পক্ষ থেকে কে আলোচনার নেতৃত্ব দেবে।

ইইউ রাশিয়ার ওপর ২১তম নিষেধাজ্ঞার প্যাকেজ চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা করছে, যা রাশিয়ার তেলবাহী ট্যাঙ্কারের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, যারা বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার কারণে রাশিয়ার ওপর জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করেছে, তারা এই পথে হাঁটবে কি না বা ইউক্রেনকে বাড়তি অর্থ দেবে কি না- তার কোনো নিশ্চিত ইঙ্গিত নেই।

ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের দাবি, তারা চান যুক্তরাষ্ট্র যেন তাদের সঙ্গে একমত হয়ে একটি শক্ত অবস্থানে থাকে এবং কোনোভাবেই ইউক্রেনের ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব না দেয়।

জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য (ই-থ্রি জোট) গত সপ্তাহে মস্কোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের প্রাথমিক পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং ইউক্রেনের জন্য শক্তিশালী নিরাপত্তা গ্যারান্টির দাবি জানিয়েছে।

তবে ট্রাম্প যদি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় সরাসরি জড়িয়ে পড়েন, তাহলে তিনি ইউরোপের এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে একমত না-ও হতে পারেন, এমনকি তিনি ইউরোপকে আলোচনার টেবিলে না-ও চাইতে পারেন।

ইউরোপীয়দের এই আশঙ্কার মধ্যেই ট্রাম্প প্রশাসনের এক কর্মকর্তা পলিটিকোকে বলেন, “দেখা যাচ্ছে যে এই পৃথিবীতে ডোনাল্ড ট্রাম্পই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি দুই পক্ষকে একসঙ্গে বসিয়ে এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটাতে পারেন।”

ঢাকা/ফিরোজ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়