বিশেষজ্ঞ পরামর্শ
স্টেরয়েডের কারসাজি, সুস্থ কোরবানির পশু চেনার উপায়
কাজী আশরাফ || রাইজিংবিডি.কম
ডা. মনিরুজ্জামান তরফদার
পবিত্র ঈদুল আজহার আর মাত্র দুদিন বাকি। জমে উঠতে শুরু করেছে রাজধানীর পশুর হাট। তবে ক্রেতার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ সুস্থ ও নিরাপদ পশু কেনা নিয়ে। স্টেরয়েডের কারসাজি, বিক্রেতার মন ভোলানো কথার ভিড়ে ভালো গরু কেনাই শুধু নয়, একজন সচেতন মানুষের এ সময় পশুর যত্ন এবং কোরবানির আগে-পরে করণীয় নিয়েও পূর্ণ ধারণা এবং প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন। রাইজিংবিডির সঙ্গে আলাপচারিতায় সে কথাগুলোই বলেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য কর্মকর্তা (প্রাণিসম্পদ) ডা. মনিরুজ্জামান তরফদার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কাজী আশরাফ।
রাইজিংবিডি: কোরবানির হাটে গিয়ে সুস্থ বা অসুস্থ গরু ক্রেতা প্রথম দেখায় কীভাবে বুঝবেন?
ডা. মনিরুজ্জামান তরফদার: সুস্থ গরুর সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো: দাঁড়িয়ে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করবে, চোখ উজ্জ্বল ও সতর্ক থাকবে, খাওয়ার আগ্রহ থাকবে, শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক থাকবে, শরীরে অতিরিক্ত কাঁপুনি বা দুর্বলতা থাকবে না, লেজ ও কান সচল থাকবে ও গোবর স্বাভাবিক হবে (অতিরিক্ত পাতলা বা খুব শুকনা হবে না)। অন্যদিকে অসুস্থ গরুর সাধারণ লক্ষণ হলো: ঝিমিয়ে থাকা, মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকা, নাক-মুখ দিয়ে অতিরিক্ত পানি বা ফেনা পড়া, কাশি বা হাঁপানি, খুঁড়িয়ে হাঁটা, শরীরে ক্ষত, গুটি বা ফোলা, খাবার না খাওয়া ও অতিরিক্ত জ্বর বা নিস্তেজতা।
রাইজিংবিডি: সুস্থ গরুর শরীরের তাপমাত্রা, চোখ-মুখ-নাকের অবস্থা কেমন থাকা উচিত?
ডা. মনিরুজ্জামান তরফদার: সুস্থ গরুর শরীরের তাপমাত্রা সাধারণত ৩৮ বা ৩৯ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের বেশি হলে জ্বর সন্দেহ করতে হবে। চোখ পরিষ্কার ও উজ্জ্বল থাকবে। লালচে বা অতিরিক্ত পানি পড়বে না। চোখ বসে যাওয়া বা ঘোলা হওয়া খারাপ লক্ষণ। নাক সামান্য ভেজা ও ঠান্ডা থাকবে। ঘন সর্দি, পুঁজ বা ফেনা থাকা অস্বাভাবিক। মুখ, মুখে ঘা বা অতিরিক্ত লালা থাকা উচিত নয়। লক্ষ্য রাখতে হবে দাঁত ও মাড়ি স্বাভাবিক রঙের কিনা।
রাইজিংবিডি: দাঁত দেখে গরুর বয়স বোঝা যায়। এর নিশ্চয়ই একটা ধারণা আছে।
ডা. মনিরুজ্জামান তরফদার: হ্যাঁ। গরুর নিচের পাটির সামনের দাঁত দেখে বয়স আন্দাজ করা হয়। যেমন: ২টি স্থায়ী দাঁত হলে প্রায় ২ বছর, ৪টি স্থায়ী দাঁত হলে আড়াই থেকে ৩ বছর, ৬টি দাঁত হলে সাড়ে তিন বছর, ৮টি পূর্ণ দাঁত হলে বুঝতে হবে গরুর বয়স ৪ অতিক্রম করেছে। কোরবানির জন্য গরুর ন্যূনতম বয়স ২ বছর। বাংলাদেশে সাধারণভাবে দুই দাঁত উঠেছে এমন গরু উপযুক্ত ধরা হয়।
রাইজিংবিডি: ক্ষতিকর হরমোন দিয়ে গরু কৃত্রিমভাবে মোটাতাজাকরণের অভিযোগ রয়েছে। কী দেখে এটা বোঝা সম্ভব?
ডা. মনিরুজ্জামান তরফদার: কৃত্রিমভাবে মোটাতাজাকরণ যদি করা হয় তাহলে গরুর শরীরে কিছু লক্ষণ প্রকাশ পাবে। যেমন শরীর অস্বাভাবিক ফুলে থাকা, চামড়া টানটান কিন্তু মাংস নরম, হাঁটতে কষ্ট হওয়া, চোখ লাল বা ফোলা, শরীরে পানি জমার মতো ভাব, ঘন ঘন হাঁপানো, অনেক সময় স্টেরয়েড খাওয়ানো গরু বাহ্যিকভাবে চকচকে দেখায়, কিন্তু শক্তি কম থাকে। যে গরুগুলো প্রাকৃতিক নিয়ম মেনে মোটাতাজা করা হয়েছে সেগুলোর মাংস শক্ত ও স্বাভাবিক, চর্বি সুষম, স্বাভাবিক খাবার খায়, চলাফেরাও স্বাভাবিক করবে। অন্যদিকে ওষুধে মোটা করা গরুর শরীরে পানি জমে ফুলে থাকে, মাংস তুলনামূলক নরম ও জলীয়, দ্রুত হাঁপায়, কিডনি ও লিভারের ক্ষতির ঝুঁকি থাকতে পারে এবং মানুষের শরীরে ওষুধের অবশিষ্টাংশ ক্ষতিকর হতে পারে।
রাইজিংবিডি: গরুর লাম্পি স্কিন ডিজিজ বা অন্যান্য চর্মরোগ বেশি দেখা যাচ্ছে, অ্যানথ্রাক্স বা ক্ষুরারোগে আক্রান্ত গরু চেনার উপায় কী? এসব রোগে আক্রান্ত পশুর মাংস খাওয়া কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?
ডা. মনিরুজ্জামান তরফদার: লাম্পি স্কিন ডিজিজের লক্ষণগুলো হলো শরীরে শক্ত গুটি, চামড়ায় ক্ষত বা ঘা, জ্বর, চোখ ও নাক দিয়ে পানি পড়া, লোম উঠে যাওয়া। যদি গুটিগুলো শুকিয়ে যায় এবং পশু সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে থাকে, তাহলে স্থানীয় ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন। অন্যদিকে অ্যানথ্রাক্সের লক্ষণ হলো, হঠাৎ মৃত্যু, নাক-মুখ দিয়ে কালচে রক্ত, শরীর দ্রুত ফুলে যাওয়া, রক্ত জমাট না বাঁধা- এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। মানুষের মধ্যেও ছড়াতে পারে। অন্যদিকে ক্ষুরারোগের লক্ষণগুলো হলো, মুখে ঘা, লালা ঝরা, খুঁড়িয়ে হাঁটা, খুরে ক্ষত। এই রোগে আক্রান্ত পশুর মাংস খাওয়া স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে এবং রোগ ছড়ানোর আশঙ্কাও থাকে।
রাইজিংবিডি: দূরদূরান্ত থেকে ট্রাকে করে আনার কারণে অনেক গরু হাটে ক্লান্ত বা অসুস্থ হয়ে পড়ে এ সময় কী ধরনের যত্ন প্রয়োজন?
ডা. মনিরুজ্জামান তরফদার: ক্লান্ত নাকি অসুস্থ- এর পার্থক্য বোঝার সহজ উপায় হলো, ক্লান্ত হলে কিছুক্ষণ বিশ্রামে স্বাভাবিক হয়, পানি খেলে চাঙা হয়, চোখ স্বাভাবিক থাকে, জ্বর থাকে না। আর প্রকৃত অসুস্থ হলে, দীর্ঘসময় ঝিমায়, খেতে চায় না, জ্বর থাকে, শ্বাসকষ্ট হয়, পাতলা পায়খানা বা কাশি থাকে। এসব ক্ষেত্রে গরু কেনার আগে ১৫-২০ মিনিট পর্যবেক্ষণ করুন। কেনার পর বাসায় নিয়ে পর্যাপ্ত পরিষ্কার পানি দিন। হঠাৎ বেশি খাবার দেবেন না, অতিরিক্ত ভিড়ে রাখবেন না। রোদে দীর্ঘসময় বেঁধে রাখবেন না। ভেজা ও নোংরা স্থানে রাখবেন না। ট্রাক থেকে নামানোর পর বা বাসায় নেওয়ার পর বিশ্রাম দিন, আলাদা দড়ি ও পরিষ্কার জায়গা ব্যবহার করুন।
রাইজিংবিডি: অতিরিক্ত গরমে হাটে গরুর পরিচর্যা কীভাবে করতে হবে?
ডা. মনিরুজ্জামান তরফদার: অতিরিক্ত গরমে হাটে গরুর জন্য পর্যাপ্ত ছায়ার ব্যবস্থা করতে হবে। দিনে বারবার পরিষ্কার পানি দিতে হবে। দুপুরের রোদে হাঁটানো কমাতে হবে। হিট স্ট্রেস এড়াতে শরীরে পানি ছিটানো যেতে পারে। অতিরিক্ত গাদাগাদি করা যাবে না। দ্রুত নষ্ট হয় এমন খাবার না দেওয়া ভালো। অবশ্যই অসুস্থ পশুকে আলাদা রাখতে হবে। হিট স্ট্রেসের লক্ষণগুলো হলো, জোরে শ্বাস নেওয়া, জিভ বের করে হাঁপানো, অতিরিক্ত লালা, দুর্বল হয়ে পড়ে যাওয়া।
আরেকটি বিষয় হলো, কোরবানির পশু বিশেষ করে গরু, ছাগল বা ভেড়া দীর্ঘসময় বৃষ্টিতে ভিজে থাকলে কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বড় হাটে ভিড়, কাদা ও অপরিষ্কার পরিবেশ থাকলে ঝুঁকি আরও বাড়ে। বৃষ্টিতে দীর্ঘসময় ভেজা থাকলে শরীরের তাপমাত্রা কমে গিয়ে জ্বর বা দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে ছোট বাছুর, ছাগল ও দুর্বল পশুদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া হতে পারে। কাদা ও ভেজা জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকলে খুর নরম হয়ে সংক্রমণ হতে পারে, ভেজা লোম ও অপরিষ্কার পরিবেশে ত্বকের সমস্যা বাড়ে।
হাটে বৃষ্টির পানি থেকে পশু রক্ষা করতে হবে। এজন্য তাঁবু বা ত্রিপলের ব্যবস্থা করে মাথার ওপর ভালো কভার দিন যাতে সরাসরি বৃষ্টি না লাগে। পাশে কিছুটা খোলা রাখুন যেন বাতাস চলাচল করতে পারে। উঁচু ও শুকনা জায়গায় পশু রাখুন, কাদাযুক্ত নিচু জায়গা এড়িয়ে চলুন। সম্ভব হলে খড়, বাঁশের চাটাই বা কাঠের পাটাতন বিছিয়ে দিন। ভেজা হলে দ্রুত মুছে শুকনা করুন, শুকনা কাপড় বা বস্তা দিয়ে শরীর মুছে দিন। বিশেষ করে রাতে ভেজা অবস্থায় না রাখাই ভালো।
রাইজিংবিডি: কোরবানির পশু জবাইয়ের আগেই কী ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া উচিত?
ডা. মনিরুজ্জামান তরফদার: পশুকে আগে ভালোভাবে গোসল করিয়ে নিতে হবে। শরীরে কাদা, গোবর বা ময়লা যেন না থাকে। জবাইয়ের ১ থেকে ২ ঘণ্টা আগে পর্যাপ্ত পানি পান করানো ভালো। পশুকে শান্তভাবে ধরতে হবে, মারধর বা ধাক্কাধাক্কি করা যাবে না। জবাইয়ের জন্য ধারালো ছুরি রাখতে হবে। চামড়া ছাড়ানোর জন্য আলাদা ছুরি ব্যবহার করতে হবে। এসব ছোট প্রস্তুতি পরবর্তীতে চামড়া ছাড়ানো সহজ করে। মনে রাখতে হবে, চামড়ার মান নষ্ট হওয়ার কয়েকটি সাধারণ কারণ হলো, চামড়ায় কাটা দাগ পড়ে যাওয়া, ছুরির গভীর দাগ লাগা, এলোমেলোভাবে চামড়া কাটা, টানাটানি করে ছিঁড়ে ফেলা, মাটিতে টেনে নিয়ে ময়লা লাগানো, সময়মতো সংরক্ষণ না করায় চামড়ায় পচন ধরে। এই ভুলগুলো এড়াতে পারলেই চামড়ার মান অনেক ভালো থাকবে।
ঢাকা/তারা//