ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ০১ জানুয়ারি ২০২৬ ||  পৌষ ১৮ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

আপসহীনতার এপিটাফ

একটি রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক ‘হত্যাকাণ্ড’ এবং আমাদের দায়

শাহেরীন আরাফাত || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:৩৫, ১ জানুয়ারি ২০২৬  
একটি রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক ‘হত্যাকাণ্ড’ এবং আমাদের দায়

বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। ৩০ ডিসেম্বর সকাল ৬টার দিকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তিনি দীর্ঘদিন বিভিন্ন জটিল রোগে ভুগছিলেন। এই সংবাদটি কেবল একটি মৃত্যুসংবাদ নয়; এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি দীর্ঘ, ধীরলয় এবং নিষ্ঠুরতম রাজনৈতিক ‘হত্যাকাণ্ডে’র সমাপ্তি ঘোষণা।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় হয়তো তাঁর মৃত্যুর সনদে ‘হার্ট ফেইলিওর’ বা ‘মাল্টিপল অর্গান ফেইলিওর’ লেখা থাকবে; কিন্তু ইতিহাসের ব্যবচ্ছেদে একে স্পষ্টত চিহ্নিত করা হবে একটি ‘রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে। যে রাষ্ট্রব্যবস্থা তিলে তিলে দেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে, সেই ব্যবস্থার স্বরূপ উন্মোচন এবং আমাদের সম্মিলিত নিষ্ক্রিয়তার দায় স্বীকার না করলে এই মৃত্যুর কোনো সুবিচার হবে না।

আরো পড়ুন:

বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে প্রায় বিনা চিকিৎসায় থাকার ফলেই এসব রোগ প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। চিকিৎসকদের মতে, যদি তাঁকে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হতো, তাহলে তিনি বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত হলেও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারতেন।

বেগম খালেদা জিয়ার এই পরিণতি কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়। এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া, যার কুশীলব গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট হাসিনা-আওয়ামী লীগ, আর নীরব দর্শক ছিলাম আমরা—জনগণ। তাঁকে আইনের দোহাই দিয়ে বন্দী করা হয়েছে, চিকিৎসার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কোলে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। 

বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান স্পষ্টতই বলেছেন, খালেদা জিয়ার মৃত্যুর দায় থেকে ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা কখনো মুক্তি পাবে না। তিনি এ সময় অভিযোগ করে আরো বলেন, বিদেশে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ না দেওয়ার কারণেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত তাকে মৃত্যুর কাছে হার মানতে হয়।

বিএনপি থেকে দলীয়ভাবেও এ অভিযোগ করা হয়েছে, তাদের নেত্রীকে তৎকালীন ক্ষমতাসীনরা যথাযথ চিকিৎসা দেননি। এমনকি তাঁকে একাকীত্বে থাকতে বাধ্য করা হয়। ক্ষমতাসীনরা তখন বারবার বলেছে, ‘আইন তার নিজস্ব গতিতে চলেছে।’ কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই আইন কার? সংবিধানের যে দোহাই দিয়ে তাঁকে আটকে রাখা হয়েছিল, সেই সংবিধান কি আদতেই জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ের প্রতিফলন? পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যে সংবিধানকে জনগণের ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেই সংবিধানের অধীনে সাজানো বিচারব্যবস্থায় বেগম জিয়াকে বিচার করা হয়েছে। এটি ছিল মূলত একটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, যাকে ‘আইন’-এর মোড়কে বৈধতা দেওয়া হয়। এই ‘আইন’ এখানে ন্যায়বিচারের প্রতীক ছিল না, ছিল একটি মারণাস্ত্র।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার রিপোর্ট এবং আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের অনেকেই স্বীকার করেছেন, তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করার মতো প্রমাণের অভাব ছিল। মূলত নির্বাচনি প্রক্রিয়া থেকে প্রধান বিরোধী নেত্রীকে সরিয়ে দেওয়াই ছিল এই সাজার উদ্দেশ্য। কিন্তু আমরা দেখেছি, ‘আইন’-এর এই ভীতিকর প্রয়োগের মাধ্যমে কীভাবে একজন নাগরিকের ন্যূনতম মানবাধিকার হরণ করা হয়েছে।

খালেদা জিয়ার এই ট্র্যাজেডিকে কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দাবার চাল হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তিনি ছিলেন বৈশ্বিক রাজনীতির, বিশেষ করে নাইন-ইলেভেন পরবর্তী ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধ’র (ওয়ার অন টেরর) এক নির্মোহ ভিক্টিম। ২০০১ পরবর্তী সময়ে বিশ্বরাজনীতির যে মেরুকরণ, সেখানে বাংলাদেশের মতো ভূ-রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশে জাতীয়তাবাদী শক্তির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া পরাশক্তিগুলোর এজেন্ডার অন্তর্ভুক্ত ছিল।

এক-এগারোর কুশীলবরা ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলায় এগোলেও, ২০০৮ পরবর্তী ঘটনাবলী প্রমাণ করে, মূল টার্গেট ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর আপসহীন চরিত্র এবং নতজানু হতে না চাওয়ার মানসিকতাই সম্ভবত আন্তর্জাতিক মোড়লদের চক্ষুশূল হয়েছিল। তাঁর চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে না দেওয়া এবং এই ধীরলয়ের মৃত্যুতে তথাকথিত উন্নত বিশ্বের বা মানবাধিকারের ফেরিওয়ালা দূতাবাসগুলোর রহস্যজনক নীরবতা প্রমাণ করে—এই হত্যা প্রক্রিয়ায় তাদেরও পরোক্ষ সায় ছিল।

হিটলারকে ক্ষমতায় আসতে হয়েছিল নির্বাচনের মাধ্যমে। বাংলাদেশের সমসাময়িক ফ্যাসিস্ট শক্তির উত্থানও ঘটেছিল এক-এগারো পরবর্তী ২০০৮ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ, ফ্যাসিবাদ তার টিকে থাকার জন্য নিয়মিত নির্বাচনের মহড়া দেয় এবং একটি সামাজিক ভিত্তি দাঁড় করাতে চায়।

বাংলাদেশে এই ফ্যাসিবাদের সামাজিক ভিত্তি নির্মাণের প্রধান মতাদর্শিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’কে। ফ্যাসিস্ট শক্তি কেবল হিংসা বা হানাহানি করেই ক্ষান্ত হয় না, তারা তাদের দমন-পীড়নের পক্ষে একটি শক্ত মতাদর্শ বা তত্ত্ব দাঁড় করায়। তারা সমাজকে এমনভাবে বিভক্ত করে ফেলে যে, তাদের বিরোধিতাকারীদের নির্মূল করাটা ‘জাতীয় কর্তব্য’ বা ‘আইনের শাসন’ বলে মনে হতে থাকে। এই প্রক্রিয়ায় যদু-মধু-করিম বা মফিজদের মতো সাধারণ নাগরিকরা যেমন নিত্যদিন প্রাণ হারাচ্ছেন বা গুম হচ্ছেন, তেমনি খালেদা জিয়াও সেই একই প্রাণঘাতী প্রক্রিয়ার শিকার হয়েছেন।

আমরা অনেকেই এই শাসনব্যবস্থাকে ‘কর্তৃত্ববাদী’ বা ‘স্বৈরতান্ত্রিক’ বলে লঘু করার চেষ্টা করি। কিন্তু বেগম জিয়াকে মৃত্যুর দিকে ধাবিত করা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থায় বাস করছি। কর্তৃত্ববাদ বা স্বৈরতন্ত্র নিছক বলপ্রয়োগ করে; কিন্তু ফ্যাসিবাদ একটি ভাবাদর্শ তৈরি করে, সমাজকে বিভক্ত করে এবং একটি ‘জাতিবাদী’ উন্মাদনা (সেটা ধর্মীয় হতে পারে, সেক্যুলারও হতে পারে) তৈরি করে তার ক্ষমতার বৈধতা আদায় করে।

এই ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থায় আমরা প্রত্যেকেই অংশগ্রহণকারী। ২০১৮ সালে বিএনপি নেতারা সংসদে বসে থেকে এই অবৈধ সংসদকে বৈধতা দিয়েছেন। তারা তাদের নেত্রীর মুক্তির জন্য রাজপথে সেই প্রলয়ঙ্করী আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছেন, যা একটি ফ্যাসিস্ট শক্তিকে কাঁপিয়ে দিতে পারত। তারা আইনি লড়াইয়ের বৃত্তেই ঘুরপাক খেয়েছেন, অথচ জানতেন—ফ্যাসিস্টের আদালতে সুবিচার পাওয়া যায় না।

অন্যদিকে, তথাকথিত সুশীল সমাজ এবং আমরা সাধারণ জনগণ ‘আইনের শাসন’-এর মিথের ওপর ভরসা করে নীরব থেকেছি। এই নীরবতাই ছিল ঘাতকের সবচেয়ে বড় শক্তি। এ ধীরলয়ের হত্যাকাণ্ড সবার চোখের সামনেই ঘটেছে। এই হত্যা প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করতে করতে রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে আমরা নিজেদের অসুখ ও বিকৃতিগুলোও প্রকাশ করেছি। ফ্যাসিবাদ আমাদের অন্তরে ‘আইন’-এর নামে একজন মানুষের মানবিক অধিকার হরণ করাকেও জায়েজ করে দিয়েছে। আর আমরা তা মেনে নিয়েছি।

খালেদা জিয়া একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, ফলে মৃত্যুকে মোকাবিলা করবার ধৈর্য এবং দুঃসাহস তাঁর ছিল। তিনি জানতেন, যে অপরাধে তাঁকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে সেটা রাজনৈতিক মামলা। এটাও জানতেন তাঁর বিচারটা প্রহসন। তিনি হয়তো আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্য বিদ্যমান বিচার ব্যবস্থা মেনে নিয়েছিলেন। তিনি বিপ্লবী ছিলেন না; ছিলেন উদারনৈতিক নির্বাচনবাদী এক রাজনৈতিক দলের প্রধান। এ জন্যই হয়তো ওই প্রহসনের বিচার মেনে নিয়েছিলেন। তবে বিপ্লবী নেতা না হয়েও তিনি চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে আন্দোলনের আইকন ছিলেন। কারণ তিনি আপস করেননি। খেলার প্রচলিত নিয়ম মেনেই শেষ পর্যন্ত লড়ে গেছেন। তাঁর এই নীরব অথচ সুদৃঢ় অবস্থান তাঁকে সমকালীন সুবিধাবাদী রাজনীতির ভিড়ে এক অনন্য উচ্চতায় আসীন করেছে। তিনি মাথা নত করেননি।

তবে নির্বাচনবাদী তৎপরতার কারণেই জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ের সঙ্গে বিএনপির দূরত্ব তৈরি হয়। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন তারা জোরদার করতে পারেননি; খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতেও তারা শক্তিশালী ভূমিকা নিতে পারেননি; বরং চব্বিশের জানুয়ারিতে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ বিনা চ্যালেঞ্জেই একদলীয় নির্বাচন সম্পন্ন করে সংসদ গঠন করে।

খালেদা জিয়ার মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় আমাদের নিজেদের ব্যর্থতাকেও। আইন, সংবিধান ও নাগরিক অধিকার সম্পর্কে আমাদের অজ্ঞানতা বা অসচেতনতার সুযোগেই ফ্যাসিবাদ মহীরূহ হয়ে ওঠে। যখন আমরা বিচারহীনতাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেই, তখন আমরাও পরোক্ষভাবে প্রতিটি নাগরিক হত্যার বা নিপীড়নের প্রক্রিয়ায় শামিল হয়ে যাই।

সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক হলো, ক্ষমতাসীন ফ্যাসিস্টদের বয়ানকে যখন আমরা নির্বিচারে মেনে নেই। আমরা যখন বিশ্বাস করতে শুরু করি যে, খালেদা জিয়াকে বুঝি আসলেই আইনী প্রক্রিয়ায় দণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং এর সঙ্গে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার কোনো সম্পর্ক নেই—তখনই আমরা আমাদের স্বাধীন চিন্তাশক্তি হারিয়ে ফেলি। আমরা ফ্যাসিস্ট বয়ানে বন্দি হয়ে যাই।

বেগম খালেদা জিয়া আজ আর আমাদের মাঝে নেই। তবে যে ফ্যাসিস্ট শাসক প্রতিশোধপরায়ণতা থেকে তাঁকে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর দিকে ধাবিত করেছেন, তিনি তাঁর উৎখাত দেখে যেতে পেরেছেন। মুক্ত হয়ে দেশের মাটিতে শায়িত হবেন; একজন আপসহীন নেতার কাছে এটি আরাধ্য।

ফ্যাসিবাদের শিকার খালেদা জিয়া আজ আর কোনো দলের নন; তিনি গোটা দেশের। এমন জাতীয় নেতার প্রস্থান বরাবরই বেদনার। তবে তিনি যে রাষ্ট্রব্যবস্থার নির্মম যাতাকলে পিষ্ট হয়ে বিদায় নিলেন, সেই ব্যবস্থাটি এখনো বিদ্যমান। তাঁর এই পরিণতি থেকে যদি আমরা শিক্ষা না নেই, যদি আমরা ফ্যাসিবাদের এই সূক্ষ্ম ও ছদ্মবেশী রূপ চিনতে না পারি, তবে আগামী দিনের রাজনীতি আরও গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।

তাঁর এই মৃত্যু যদি আমাদের চেতনায় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রকৃত প্রতিরোধের আগুন জ্বালতে না পারে, তবে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। ফ্যাসিবাদকে কেবল স্লোগান দিয়ে প্রতিহত করা যায় না; একে প্রতিহত করতে হলে এর বুদ্ধিবৃত্তিক, আইনি ও সামাজিক ভিত্তিগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে হয়। খালেদা জিয়ার মৃত্যু হোক সেই প্রশ্ন তোলার, সেই সচেতনতা তৈরির এক সূচনা বিন্দু।

লেখক: সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক 

ঢাকা/তারা//

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়