ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৪ মাঘ ১৪২৬, ২৮ জানুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

নাভির আশপাশে ব্যথার পাঁচ কারণ

এস এম গল্প ইকবাল : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১২-০৪ ২:৪১:১৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১২-০৪ ২:৪১:১৭ পিএম

নাভির চারপাশে ব্যথা মারাত্মক কোনো কারণে না হলে অ্যান্টাসিড খেলে অথবা খাবারের তালিকায় পরিবর্তন আনলে মুক্তি মিলতে পারে। কিন্তু সবসময় এমন নাও হতে পারে। এ কারণে ব্যথার প্রকৃতি জেনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। এটি হতে পারে অন্যান্য কোনো রোগের প্রাথমিক উপসর্গ। জীবননাশের ঝুঁকি এড়ানোর অন্যতম উপায় হচ্ছে স্বাস্থ্য সমস্যার সম্ভাব্য সকল উপসর্গ সম্পর্কে জ্ঞান রাখা।

ক্রন’স রোগ : ক্রন’স হচ্ছে অন্ত্রের এমন একটা প্রদাহজনিত রোগ যা সাধারণত ক্ষুদ্রান্ত ও বৃহদান্ত্রকে আক্রমণ করে। এ রোগ নাভির পেছনে ব্যথা সৃষ্টি করতে পারে। এই অনুভূতি হালকাও হতে পারে, তীব্রও হতে পারে। মাংসপেশির সংকোচনে সৃষ্ট এ ব্যথা সাধারণত খাবার খাওয়ার ২০-৩০ মিনিট পর অনুভূত হয়। গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজির সহকারী অধ্যাপক ইলানা মেসার বলেন, ‘যখন আপনি ক্রন’স রোগ শনাক্ত করতে যাবেন, তখন শুধু পেটের ব্যথার ওপর নির্ভর করেই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না, আপনাকে অন্যান্য উপসর্গেরও খোঁজ করতে হবে।’ ক্রন’স রোগের অন্যান্য উপসর্গ হচ্ছে: তীব্র ডায়রিয়া, ক্লান্তি ও ওজন হ্রাস। এই রোগের কারণ অজ্ঞাত। ডা. মেসারের মতে, এ রোগের সর্বাধিক কমন বয়স হচ্ছে ১৮ থেকে ২৪ বছর। ক্রন’স রোগের কিছু জটিলতা হচ্ছে: পুষ্টিহীনতা, আলসার ও অন্ত্রে প্রতিবন্ধকতা।

স্ট্র্যানগুলেটেড আম্বিলিক্যাল হার্নিয়া: যখন শিশু জন্ম নেয়, তখন চিকিৎসক নাভিরজ্জু কেটে দেন- এ নালী গর্ভাবস্থায় গর্ভস্থ শিশুকে খাইয়ে থাকে। এরপর স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় মাংসপেশিগুলো নিরাময় লাভ করে। কিন্তু কখনো কখনো এসব মাংসপেশি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয় না। অন্ত্র বা চর্বিযুক্ত কলা এসব ছিদ্র দিয়ে বের হয়ে নাভিতে বড় স্ফীতি সৃষ্টি করে- এটাই আম্বিলিক্যাল হার্নিয়া নামে পরিচিত। প্রতি পাঁচজন নবজাতকের মধ্যে একজনের আম্বিলিক্যাল হার্নিয়া হয়ে থাকে, যার ৯০ শতাংশই পাঁচ বছর বয়সের মধ্যে সেরে ওঠে, জনস হপকিনস মেডিসিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী। অন্যান্য ১০ শতাংশ শিশুর এ হার্নিয়া থেকে যায়, যেখানে ছেলের চেয়ে মেয়ে তিনগুণ বেশি। আম্বিলিক্যাল হার্নিয়া নিয়ে কোনো সমস্যা ছাড়াই পুরো জীবন কাটিয়ে দেয়া সম্ভব। কিন্তু কখনো কখনো বের হয়ে আসা কলা বেকায়দায় পড়ে রক্ত সরবরাহে ঘাটতি হতে পারে- এ অবস্থাকে স্ট্র্যানগুলেটেড আম্বিলিক্যাল হার্নিয়া বলে। ডা. মেসার বলেন, ‘ব্যথা অনুভূত হলে বুঝতে হবে যে এটি ওমেন্টাম (পাকস্থলির কলা) বা অন্ত্রে চাপ প্রয়োগ করছে।’ রক্ত প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে কলা মারা যেতে পারে ও জীবননাশক ইনফেকশন তৈরি হতে পারে। আপনার আম্বিলিক্যাল হার্নিয়া থাকলে উপসর্গগুলো জেনে রাখা ভালো: নাভিতে ব্যথার পাশাপাশি হার্নিয়া ঠেলে ভেতরে ঢোকাতে ব্যর্থ হবেন, নাভিতে লাল বা পার্পল স্ফীতি দেখা যেতে পারে, কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে, জ্বর আসতে পারে, পেট ফুলে যেতে পারে ও বমি হতে পারে।

বদহজম: নাভির ওপরে ব্যথা হলে বদহজমের লক্ষণ হওয়ার ভালো আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু বদহজমজনিত ব্যথা বা অস্বস্তি কেবলমাত্র নাভির পাশে হয় তা নয়, পেটের যেকোনো স্থানেই হতে পারে। সেইসঙ্গে পেটভরা অনুভূতি ও বমিভাবও থাকতে পারে। এসবের স্থায়ীত্ব কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত হতে পারে। চর্বিযুক্ত খাবার, ভাজা খাবার ও মসলাদার খাবার হচ্ছে বদহজমের সবচেয়ে পরিচিত ট্রিগার বা উদ্দীপক। এ প্রসঙ্গে ডা. মেসার বলেন, ‘যেকোনো চর্বি জাতীয় খাবার হজম হতে দীর্ঘসময় লাগে, তাই এসব খাবার বেশি সময় ধরে পাকস্থলিতে অবস্থান করে। এমনকি খুব বেশি তেলে ভাজা মাছ খেলেও বদহজম হতে পারে।’

বদহজম এড়াতে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ এসব খাবার এড়িয়ে চলতে, ধীরে খাবার খেতে, চিবিয়ে খাবার খেতে ও খাবার খাওয়ার ঠিক পর শরীরচর্চা থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দিচ্ছে। অ্যান্টাসিড সেবনে সাময়িক অস্বস্তি দূর হতে পারে, কিন্তু আপনার উপসর্গ কয়েকদিনের বেশি থাকলে চিকিৎসককে জানান।

অ্যাপেন্ডিসাইটিস: অ্যাপেন্ডিক্স হচ্ছে একটি ক্ষুদ্র অর্গান যা বড় ও ছোট অন্ত্রের সংযোগস্থলে অবস্থিত। জনস হপকিনস মেডিসিনের প্রতিবেদনে আছে, অ্যাপেন্ডিসাইটিস হচ্ছে অ্যাপেন্ডিক্সের প্রদাহ ও প্রায়ক্ষেত্র এর প্রথম উপসর্গ হচ্ছে নাভির পাশে ব্যথা। ডা. মেসার বলেন, ‘সাধারণত অ্যাপেন্ডিক্সের প্রদাহে মধ্য পাকস্থলিতে তীব্র ব্যথা শুরু হয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এ ব্যথা ডানে নিচের পেটে এক-চতুর্থাংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।’

চিকিৎসকেরা নিশ্চিত নন, কী কারণে অ্যাপেন্ডিসাইটিস হয়, কিন্তু ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সি লোকদের মধ্যে এ সমস্যা সবচেয়ে বেশি ধরা পড়েছে এবং এ সমস্যাটি পরিবার বা বংশের মধ্যে প্রবাহিত হতে পারে। অ্যাপেন্ডিক্সের প্রদাহে জরুরি মেডিক্যাল সেবার প্রয়োজন হয়, অন্যথায় অ্যাপেন্ডিক্স ফেটে গেলে মৃত্যুও হতে পারে। সাধারণত উপসর্গ প্রকাশের ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে অ্যাপেন্ডিক্স ফেটে যেতে পারে।

তাই আপনার ব্যথার সময় বাড়তে থাকলে ও শ্বাসক্রিয়া বা নড়াচড়ার সময় এ ব্যথা আরো বেড়ে গেলে এবং সেইসঙ্গে বমি, বমিভাব, জ্বর, ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য ও ক্ষুধামান্দ্য থাকলে জরুরি মেডিক্যাল সেবা নেয়ার কথা ভাবুন।

পিত্তপাথর: পিত্তথলিতে কোলেস্টেরল জমে যে শক্ত স্তূপ সৃষ্টি হয় সেটাই হচ্ছে পিত্তপাথর। এ অর্গানে এক বা একাধিক পাথর ডেভেলপ হতে পারে এবং এসব পাথরের আকার পোস্ত বীজ থেকে গলফ বলের মতো হতে পারে। ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড মেডিক্যাল সেন্টারের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, অধিকাংশ লোকই জটিলতা সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত পিত্তপাথর সম্পর্কে জানতে পারেন না। ডা. মেসার বলেন, ‘চল্লিশোর্ধ্ব ও অতি ওজনের নারীদের মধ্যে পিত্তপাথর সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে।’

কখনো কখনো পিত্তপাথর পিত্তনালীতে আটকে থেকে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে, যার ফলে পেটে ব্যথা অনুভূত হবে। মায়ো ক্লিনিকের মতে, সবচেয়ে পরিচিত উপসর্গ হচ্ছে হঠাৎ করে মধ্য পেটে ঠিক ব্রেস্টবোনের নিচে তীব্র ব্যথা। এ পাথর অতিক্রান্ত হওয়ার সময় ব্যথার স্থান শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে- এসময় নাভির পাশে ব্যথা অনুভব হতে পারে। এ পাথর অতিক্রম না করা পর্যন্ত আট থেকে নয় ঘণ্টা ধরে পেশি সংকোচন অথবা পেটের ব্যথায় ভুগতে পারেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ব্যথা দূর না হলে অথবা আরো বেড়ে গেলে অথবা ত্বক হলদে হলে অথবা ঠান্ডা অনুভূতি সহকারে উচ্চ জ্বর আসলে পিত্তথলির প্রদাহের মতো জটিলতা আছে কিনা নিশ্চিত হতে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।

 

ঢাকা/ফিরোজ/তারা