ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০৪ জুন ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

লকডাউন কার্যকরে যা করতে হবে

আবু বকর ইয়ামিন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৪-০৮ ৭:১৪:০২ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৪-০৮ ৩:২৭:০৮ পিএম
ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ, ড. সাদেকা হালিম. ড. মাহফুজা খানম ও ড. এম এম আকাশ

বিশ্বে করোনাভাইরাস ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। এ মহামারি থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। ছোঁয়াচে এ রোগের আবির্ভাবের পর থেকে এ পর্যন্ত যে পরিসংখ্যান, তাতে মনে হচ্ছে, আমরা মহাবিপদের ঝুঁকিতে আছি। কেননা, এ দেশের অনেক মানুষ কোভিড -১৯ সম্পর্কে উদাসীন। অর্থনৈতিক সমস্যা তো আছেই।

সরকার ঝুঁকিপুর্ণ এলাকা লকডাউন করলেও কেউ কেউ তা মানছে না। সংবাদ মাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন, এমনকি সেনাবাহিনী চেষ্টা করেও জনগণকে বোঝাতে পারছে না। অবশ্য কেউ কেউ জীবিকার তাগিদে ঘর থেকে বের হচ্ছেন।

লকডাউন কার্যকরে কী করণীয়, সে বিষয়ে রাইজিংবিডির সঙ্গে কথা বলেছেন শিক্ষাবিদ, সমাজবিদ, অর্থনীতিবিদ ও মনোবিদরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, আমাদের দেশের মতো উপমহাদেশের কিছু দেশে লকডাউন বাস্তবায়ন কষ্টসাধ্য।  একেবারেই শতভাগ লকডাউন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। কিছু ছাড় দিতে হবে। তবে, এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সচেতন থাকার বিকল্প নেই।

তিনি বলেন, একটা দিক অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যে, শুধু লকডাউন ঘোষণা করলেই হবে না। আরো কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। অনেক গরিব মানুষ আছেন, যাদেরকে জীবিকার জন্য বের হতে হচ্ছে, বেঁচে থাকার জন্য বের হতে হচ্ছে, তাদের জন্য সুব্যবস্থা অবশ্যই করতে হবে। তারপর তাদেরকে ঘরে বন্দি করলে সেটা তারা মেনে নেবে। কিন্তু মানুষ তো ক্ষুধা নিয়ে ঘরে বসে থাকতে পারে না। তাই লকডাউন যথাযথ পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়ন করতে হবে। কিছু মানুষ আছে যারা অকারণে বের হয়, তাদেরকে নিরুৎসাহিত করতে হবে। আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। উন্নত রাষ্ট্রগুলো যেভাবে লকডাউন কার্যকর করছে, তা পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও সাবেক তথ্য কমিশনার অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম বলেন, যেহেতু ভাইরাসটি দেশের বাইরে থেকে যারা এসেছেন তাদের মাধ্যমে ছড়িয়েছে, তাদের কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করা দরকার ছিল। আমাদের পর্যাপ্ত সুযোগও ছিল এক্ষেত্রে। কিন্তু আমরা সেটি যথাযথভাবে করতে পারিনি। এ কারণে তারা খুব সহজেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে গেছে এবং দিন দিন সংক্রমণের হার বাড়ছে। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় যে জাতীয় কমিটি আছে, তারা খুব সফলভাবে সবকিছু পরিচালনা করতে পারছে না। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিজিএমইএ, বিকেএমইএর মাঝে সমন্বয়ের অভাব আছে। তারা কোনো পরিকল্পনা সফলভাবে কাজে লাগাতে পারেনি। করোনাভাইরাস মোকাবিলা ও লকডাউন সফল করতে হলে সমন্বয়ের বিকল্প নেই।

তিনি বলেন, একটা বিষয় দেখা গেছে যে, ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সরকার যখন সবকিছু বন্ধ রেখেছে, তখন গার্মেন্টস ও বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও ছুটি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারপর সমন্বয়হীনতার কারণে মালিকরা গার্মেন্টস খোলার সিদ্ধান্ত নিলেন। অথচ বন্ধ রইল গণপরিবহন। তাই জীবিকার প্রয়োজনে শ্রমিকরা পায়ে হেঁটে হলেও কর্মস্থলে গেছেন। আবার বলা হলো, গার্মেন্টস বন্ধ। এখন এ শ্রমিকরা যাবে কোথায়? সেসব বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এ বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী বলেন, লকডাউন কার্যকর করতে হলে ঘরে থাকার বিকল্প নেই। কিন্তু আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক বিবেচনায় সেটি সম্ভব না। কিছু মানুষ ঘর থেকে বের না হলেও বিশাল একটি অংশকে বের হতেই হবে জীবিকার তাগিদে। তাদের দায়িত্ব নেবে কে? এজন্য শুধু সরকার নয়, সরকারের পাশাপাশি যারা বিত্তবান আছেন, জনপ্রতিনিধি আছেন, তাদেরকে দায়িত্ব নিতে হবে। গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য গার্মেন্টস মালিকরা রয়েছেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য তাদের প্রতিষ্ঠানের মালিকদের অবশ্যই দায়িত্ব নিতে হবে। অন্যথায়, মানুষ জীবিকার তাগিদে বেঁচে থাকার জন্য ঘর থেকে বের হবেই। আর যারা সখের বসে ঘর থেকে বের হন, চা খেতে কিংবা আড্ডা দিতে, তাদের বিষয়ে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে।

তেল-গ্যাস-খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ বলেন, লকডাউন বাস্তবায়নে আমাদের শুরু থেকেই একটি কম্প্রিহেনসিভ পরিকল্পনা দরকার ছিল। সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে এই পরিকল্পনার দরকার ছিল। এজন্য সরকার অনেক সময়ও পেয়েছে। তখন যদি সরকার পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করত, তাহলে এ অবস্থা হতো না। এখনো সেটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব, যদি সরকার সে হিসেবে ব্যবস্থা নেয়। যারা জীবিকার তাগিদে বের হচ্ছে তাদের ভরণপোষণের ব্যবস্থা ও ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করতে হবে।

তিনি বলেন, লকডাউনে সবাইকে ঘরে থাকতে হবে। কিন্তু যাদের ঘর নেই, সেসব মানুষের ক্ষেত্রে পরিকল্পিতভাবে ক্ষণস্থায়ী ঘর করার ব্যবস্থা করার দরকার ছিল। ক্যাম্পেইন করতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে যে, তার বাঁচার জন্যই তাকে আলাদা থাকতে হবে, তাকে দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. এম এম আকাশ বলেন, লকডাউন করতে হবে সিলেক্টিভলি। এটা জেনারেলি করা যাবে না। কেউ আক্রান্ত হলে সে এলাকা লকডাউনের পর্যায়ে নিতে হবে। তবে এর মধ্যে দেখতে হবে, কে সংক্রমিত আর কে নয়। যে সংক্রমিত নয়, তাকে আটকে রাখার সুযোগ নেই। তাকে ছেড়ে দিতে হবে। কারণ, জীবিকার তাগিদে সে বের হবে এবং তাকে সে সুযোগ দিতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মাহফুজা খানম বলেন, মানুষের জীবিকা নিশ্চিতের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটি করতে হবে তা হলো—তাদেরকে বোঝানো। অনেকে এখন পর্যন্ত বিষয়টিকে সিরিয়াসলি নিতে পারেনি। এখনো অনেক মানুষ বুঝতে চায় না যে, এটি খুবই মারাত্মক ভাইরাস। যারা জানে না, তাদেরকে সেটি বোঝাতে হবে। অনেক মানুষ ভাবছে যে, তারা সংক্রমিত হবে না। তারা অসচেতনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদেরকে ধরে ধরে বোঝাতে হবে । সেসব মানুষকে অর্থনৈতিক সাপোর্ট দিতে হবে সরকারকে।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, যেহেতু এই ভাইরাসটি একজন আরেকজনের কাছাকাছি যাওয়ার মাধ্যমে ছড়ায়। সেহেতু মানুষকে ঘরের মধ্যে আবদ্ধ বা  নির্দিষ্ট এলাকা লকডাউন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।  তাহলে যে ঘরের মধ্যে আবদ্ধ, তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করতে হবে সরকারকে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে অবশ্যই ওই এলাকার দরিদ্র মানুষদের ডাটাবেজ আছে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে প্রত্যেকের কাছে মোবাইল আছে, মোবাইলের মাধ্যমে তারা তাদের সাথে যোগাযোগ করতে হবে। তালিকা অনুযায়ী তাদের ঘরে খাবার পৌঁছে দিতে হবে।

বিশিষ্ট সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, কথা বলা যতটা সহজ, করা ততটা সহজ নয়। একটা এলাকা লকডাউন করা মানে এই নয় যে, ওই এলাকার মানুষকে শুধু আটকে রাখলেই হবে। সে খাবে কী, থাকবে কোথায়? সেসব বিষয়েরও ব্যবস্থা করতে হবে। তার বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করতে হবে।

তিনি বলেন, একটা মানুষকে অথবা একটা পরিবারকে যখন নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা হবে, তখন তার সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্য সুরক্ষার দিক দেখতে হবে। একটা ঘরের প্রত্যেকটা মানুষকে আলাদা রাখার সুযোগ নেই। যেখানে একাধিক মানুষ একসঙ্গে বসবাস করে, সেখানে কতটা দূরত্ব বজায় রেখে চলতে পারবেন তারা? 

 

ঢাকা/ইয়ামিন/রফিক