Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     সোমবার   ০১ মার্চ ২০২১ ||  ফাল্গুন ১৬ ১৪২৭ ||  ১৫ রজব ১৪৪২

এক প্রতিষ্ঠান থেকে ২ কোটি টাকার বই কেনার নির্দেশ ঢাকা জেলা প্রশাসনের

মেসবাহ য়াযাদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২১:২৭, ১৭ জানুয়ারি ২০২১   আপডেট: ০০:২৯, ১৮ জানুয়ারি ২০২১
এক প্রতিষ্ঠান থেকে ২ কোটি টাকার বই কেনার নির্দেশ ঢাকা জেলা প্রশাসনের

রাজধানীসহ ঢাকা জেলার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ২ কোটি টাকার বই সরবরাহের কার্যাদেশ পেয়েছে মাত্র একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে অন‌্যান‌্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান।

প্রকাশকরা প্রশ্ন তুলেছেন, ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ওপেন টেন্ডার আহ্বান ও যাচাই-বাছাই না করে এবং অনেক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বই থাকা সত্ত্বেও একটি প্রকাশনী কীভাবে ‘বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ গ্রন্থমালা’র সব বই সরবরাহের অনুমতি পায়?

তারা বলছেন, করোনার কারণে ব‌্যবসায়িক দিক থেকে খারাপ অবস্থায় আছেন পুস্তক প্রকাশনার সঙ্গে জড়িত মানুষজন। প্রতিবছর ফেব্রুয়ারিতে মাসব্যাপী একুশের বইমেলাকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার বই প্রকাশিত হয়। ফেব্রুয়ারি ছাড়াও সারা বছর সেই বই বিক্রি করেই টিকে থাকেন প্রকাশকরা। এবার বইমেলার বিষয়ে এখনও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই। এর মধ্যে একজন প্রকাশক এককভাবে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২ কোটি টাকার বই সরবরাহের অনুমতি পান কী করে?

ঢাকা জেলার (মহানগরসহ) সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ‘বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ গ্রন্থমালা'র ৪৬টি বইয়ের এক সেট করে সংগ্রহ করার জন্য গত ১০ জানুয়ারি চিঠি দেয় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়। ওই চিঠিতে স্বাক্ষর করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) শাহনাজ সুলতানা। ৪৬টি বইয়ের এক সেট করে সরবরাহ করবে তাম্রলিপি প্রকাশনী।

উল্লেখ্য, ঢাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ২ হাজার ২২৮টি। এর মধ‌্যে কলেজ ১৬৭টি, হাই স্কুল ৪৭৯টি, মাদ্রাসা ১৬৫টি, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৭২৮টি এবং বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৬৮৯টি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ও সময় প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘জানতে হবে ঢাকা জেলা প্রশাসন এরকম চিঠি দেওয়ার এখতিয়ার রাখে কি না? এখতিয়ার থাকলে ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে বই নির্বাচন করেছে কি না? অন্য কোনো প্রকাশনীর এরকম বই আছে কি না? এসব না জেনে একজন প্রকাশকের ৪৬টা বই কী করে নির্বাচন করেছে, সেটা ডিসি অফিসের দায়িত্ববান লোকজনই ভালো বলতে পারবেন। তারপরও আমি তাদের সাধুবাদ জানাই, করোনা মহামারির সময়ে প্রকাশকরা যখন ভয়াবহ দিন কাটাচ্ছেন, সেখানে প্রকাশনা শিল্পকে বাঁচানোর এরকম উদ্যোগ নেওয়ার জন্য। কিন্তু অবশ্যই সেখানে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অনেক প্রকাশনী থেকে বই সংগ্রহ করে একটা সেট বানানো দরকার ছিল বলে আমি মনে করি।’

বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক ও ভাষাচিত্র'র প্রকাশক খন্দকার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘করোনাকালে সব প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান যখন টিকে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত, তখন সমিতির পদ ভাঙিয়ে যারা এমন কাজ করেন, তারা আমাদের এই ইন্ডাস্ট্রির জন্য ক্ষতিকর। এ ধরনের স্বেচ্ছাচারী আচরণ ও ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই।’

বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির রাজধানী শাখার সভাপতি ও অন্যপ্রকাশের স্বত্বাধিকারী মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টা আমার জানা নেই। সত্যি হলে, কেন এক প্রকাশনীর বই, সেটা যারা চিঠি ইস্যু করেছেন, তারাই ভালো বলতে পারবেন। আমার মনে হয়, সব প্রকাশনী থেকে বেছে বেছে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মানসম্পন্ন বই নেওয়া দরকার ছিল। তাহলে শিক্ষার্থীরা যেমন ভালো বই পড়ে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধকে জানতে পারত, তেমনই অনেক প্রকাশকও উপকৃত হতেন।’

ঢাকা জেলার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এককভাবে ২ কোটির বেশি টাকার বই সরবরাহের কার্যাদেশ পেয়েছেন বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির পরিচালক (মেলা) ও তাম্রলিপির স্বত্বাধিকারী একেএম তারিকুল ইসলাম।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আপনারা জানেন, দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু কর্নার হচ্ছে। আমি মার্কেটিং পলিসি হিসেবে, আমার প্রকাশিত বই রাখার জন্য সব জায়গায় আবেদন করেছি। আমার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা জেলা প্রশাসকের অফিস যাচাই-বাছাই করে আমাকে বই সরবরাহের অনুমতি দিয়েছেন।’

টেন্ডারের মাধ্যমে কোটেশন নিয়ে বই যাচাই-বাছাই করেছে কি না? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এসব বই তো সরকারি ফান্ডে কেনা হচ্ছে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজস্ব ফান্ডে কিনবে। তাই এখানে টেন্ডারের প্রশ্ন আসে না।’

ঢাকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) শাহনাজ সুলতানা স্বাক্ষরিত চিঠি সম্পর্কে জানতে তার মুঠোফোনে গতকাল শনিবার (১৬ জানুয়ারি) অনেকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। এসএমএস দিয়েও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। রোববার (১৭ জানুয়ারি) সকালে আবার কল করা হলে তার ছেলে রিসিভ করেন। তিনি অফিসের ল্যান্ডফোনে কল করতে বলেন। কিন্তু অফিসের ফোনে কল করলে এক নারী বলেন, 'স্যার বাইরে আছেন। পরে কল করুন।’

আজ দুপুরে তাকে মুঠোফোনে পাওয়া যায়। উল্লিখিত চিঠি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ওই প্রকাশনীর মালিক আমাদের কাছে আবেদন করেছিলেন। আমরা সরল বিশ্বাসে যাচাই-বাছাই না করে তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে একটা চিঠি জেলা শিক্ষা অফিসার বরাবর পাঠিয়েছিলাম। এই চিঠি পাঠানোর এখতিয়ার আসলে আমাদের নেই। এ বিষয়ে আমাদের কাছে অভিযোগ এসেছে। আমরা সেই চিঠি বাতিল করে আজকেই আরেকটা চিঠি পাঠাব।’

মেসবাহ/রফিক

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়