রোনান সুলিভান: তিন দেশের টান ছিঁড়ে লাল-সবুজে লেখা এক নতুন স্বপ্ন
ঢাকার আকাশে যখন বিমানের ডানায় ভর করে নামছিলেন দুই তরুণ, তখন হয়তো তাদের হৃদয়ে চলছিল অন্য এক অবতরণ; শিকড়ের কাছে ফিরে আসার। রোনান সুলিভান ও ডেকলান সুলিভান দুই ভাই, দুই স্বপ্নবাজ ফুটবলার। জন্ম তাদের যুক্তরাষ্ট্রে, বেড়ে ওঠাও সেখানেই। কিন্তু রক্তের ভেতর কোথাও নীরবে বইছিল আরেক দেশের গল্প, বাংলাদেশের।
রোনান বেনজামিন সুলিভান, বয়স মাত্র ১৮। আধুনিক ফুটবলের ভাষায় তিনি একজন ‘নাম্বার নাইন’। যে গোলের ঘ্রাণ পায়, যে সুযোগকে শিকার বানাতে জানে। যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়ন একাডেমিতে তার ফুটবল শিক্ষা। পাশেই যমজ ভাই ডেকলান, একই পথে হাঁটা আরেক যোদ্ধা। তাদের পরিবারও যেন ফুটবলের এক ক্ষুদ্র গ্যালাক্সি। চার ভাইয়ের সবাই ফুটবলার। বড় দুই ভাই কুইন ও কাভান ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারে নিজেদের জায়গা তৈরি করেছেন। কিন্তু গল্পটা শুধু ফুটবলের নয় এটা শিকড়ের গল্পও।
রোনানদের মা হেইকে সুলিভান যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হলেও তার মা, অর্থাৎ রোনানদের নানি সুলতানা আলম ছিলেন বাংলাদেশি। অন্যদিকে নানা ছিলেন জার্মান বংশোদ্ভূত। ফলে জন্মসূত্রে রোনানদের সামনে খোলা ছিল তিনটি দেশের দরজা- যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি এবং বাংলাদেশ।
এই তিন দেশের মধ্যে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তটা সহজ ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী ফুটবল কাঠামো, জার্মানির ঐতিহ্য; সবকিছুই তাদের সামনে ছিল সম্ভাবনার দরজা খুলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা বেছে নিলেন বাংলাদেশকে। একটি দেশ, যেটি হয়তো তাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ ছিল না, কিন্তু ছিল রক্তের গভীরে। এই সিদ্ধান্তে আবেগ যেমন ছিল, তেমনি ছিল দায়িত্ববোধ। নিজেদের শিকড়কে প্রতিনিধিত্ব করার এক অদৃশ্য টান, যা হয়তো কোনো যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ দলে ডাক পাওয়ার পর ঢাকায় পা রাখেন সুলিভান ব্রাদার্স। সবকিছু যেন দ্রুত এগোতে থাকে। সামনে সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপ, মালদ্বীপের মালে শহরে। প্রথম ম্যাচেই প্রতিপক্ষ পাকিস্তান, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী। চাপ, উত্তেজনা, প্রত্যাশা; সবকিছু মিলিয়ে এক বিস্ফোরক মঞ্চ। প্রথমার্ধে বাংলাদেশ আধিপত্য দেখালেও গোল আসেনি। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে যেন গল্পের মোড় ঘুরে যায়। আর সেই গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রোনান।
৫৪ মিনিট। বক্সের প্রায় ৩০ গজ দূর থেকে ফ্রি-কিক। দর্শকদের চোখ তখন বলের দিকে, আর রোনানের চোখ গোলপোস্টে। একটি নিখুঁত শট- ডান পায়ের স্পর্শে বলটি প্রথমে সোজা, তারপর হালকা বাঁক নিয়ে জালে জড়িয়ে গেল। গোলকিপার বুঝতেই পারলেন না, কখন বল তার নাগালের বাইরে চলে গেল।
এমন গোল আমরা সাধারণত দেখি বিশ্ব তারকাদের পা থেকে। সামাজিক মাধ্যমে অনেকে তুলনা করেছেন লিওনেল মেসির ফ্রি-কিকের সঙ্গে। কিন্তু রোনানের জন্য এটি ছিল নিজের গল্প লেখার প্রথম অধ্যায়।
এরপর ৬৪ মিনিটে আরেকটি গোল। এইবার হেডে। শেখ সংগ্রামের ক্রস, আর নিখুঁত পজিশনিংয়ে রোনানের মাথার ছোঁয়া। গোলকিপারের কোনো সুযোগই ছিল না। অভিষেক ম্যাচেই জোড়া গোল। ম্যাচসেরা পুরস্কার। আর বাংলাদেশের জন্য ২-০ গোলের জয়।
রোনানের পারফরম্যান্স শুধু গোলেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তার মুভমেন্ট, পজিশন সেন্স, খেলার পড়ার ক্ষমতা- সবকিছুই আলাদা করে নজর কাড়ে। অনেক দিন ধরেই বাংলাদেশ একটি প্রথাগত স্ট্রাইকারের অভাবে ভুগছিল। সেই শূন্যতা পূরণের ইঙ্গিত যেন প্রথম ম্যাচেই দিয়ে দিলেন তিনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তার খেলার মধ্যে ইউরোপীয় ছাপ স্পষ্ট। বল ছাড়া দৌড়, সঠিক জায়গায় থাকা, এবং সুযোগ তৈরি করার ক্ষমতা। এগুলোই একজন আধুনিক ফরোয়ার্ডের মূল গুণ।
পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ জয়ের পর বাংলাদেশের সামনে আসে ভারত। আরও বড় পরীক্ষা। রোনানের জন্যও এটি ছিল নিজেকে প্রমাণ করার আরেকটি সুযোগ। যদিও একটি ম্যাচ বা দুটি গোল দিয়ে কাউকে বিচার করা যায় না, তবুও প্রথম ছাপটাই অনেক কিছু বলে দেয়। আর রোনান সেই প্রথম ছাপেই নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছেন জোরালোভাবে।
বাংলাদেশের ফুটবল দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় সমস্যার মুখোমুখি- গোল স্কোরার নেই। মাঝমাঠে বল তৈরি হয়, উইং দিয়ে আক্রমণ হয়, কিন্তু শেষ মুহূর্তে গিয়ে গোলের দেখা মেলে না। রোনানের মতো একজন স্ট্রাইকার এই জায়গাটিতেই পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন। তার মধ্যে আছে- পজিশন সেন্স, ফিনিশিং দক্ষতা, শারীরিক সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ। এই চারটি উপাদান মিলেই একজন সম্পূর্ণ ফরোয়ার্ড তৈরি হয়। আর যদি সঠিকভাবে তাকে গড়ে তোলা যায়, তবে তিনি হতে পারেন বাংলাদেশের আক্রমণের মূল ভরসা।
রোনান সুলিভান এখনও কেবল শুরু করেছেন। তার সামনে দীর্ঘ পথ, অসংখ্য চ্যালেঞ্জ। কিন্তু শুরুটা যদি এমন হয়, তবে ভবিষ্যতের গল্পটা আরও উজ্জ্বল হতে পারে। তিনি কেবল একজন ফুটবলার নন- তিনি একটি সম্ভাবনার প্রতীক। প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্যও একটি বার্তা- শিকড়ের টান কখনও মুছে যায় না।
ঢাকার মাটি, মালের মাঠ; সবখানেই তিনি যেন খুঁজে ফিরছেন নিজের পরিচয়। আর সেই খোঁজের মধ্যেই জন্ম নিচ্ছে নতুন এক স্বপ্ন- বাংলাদেশ ফুটবলের নতুন সকাল। রোনান সুলিভান- একটি নাম, যা হয়তো আগামী দিনে হয়ে উঠতে পারে লাল-সবুজের গোলের নতুন ঠিকানা।
ঢাকা/আমিনুল
২৭ হাজার টন ডিজেল নিয়ে চট্টগ্রামে এল ‘পিভিটি সোলানা’