Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     বুধবার   ০৩ মার্চ ২০২১ ||  ফাল্গুন ১৮ ১৪২৭ ||  ১৮ রজব ১৪৪২

ট্রয়: প্যারিস হেলেনের ভালোবাসার স্বর্গভূমে

ফাতিমা জাহান  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:২২, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৮:২১, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১
ট্রয়: প্যারিস হেলেনের ভালোবাসার স্বর্গভূমে

ট্রয় নগরীতে লেখক

‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’- শব্দ দুটো শুনলেই মনের ভেতর কেমন এক ভালোবাসা ভালোবাসা বোধ তৈরি হয়! যে কখনও প্রেমে পড়েনি, কখনও একটি গোলাপও পায়নি, তারও বুক দুরুদুরু করে! কে জানে এই বিশেষ দিনে যদি সেই বিশেষ মানুষটির দেখা পাওয়া যায়, চোখে চোখ পড়ে যায়, হৃদয়ে হৃদয় মিলে যায়!

এমন আরও কত কিছু। ইংরেজিতে যাকে বলে- ‘বাটারফ্লাই ইন দা স্টমাক’। এ এক বিচিত্র অনুভূতি, যার অভিব্যক্তি হয় না। মনে হয়, মাটি থেকে পা কয়েক ইঞ্চি উপরে ভাসছে, সমস্ত চরাচরে বাজছে মধুর সুর; অসুন্দর যে কোনো কিছু সুন্দর হয়ে তখন ধরা দেয় চোখে। একটা আচ্ছন্নতা; এক আলাদা ভালোলাগা ছেয়ে থাকে মনজুড়ে। সেই মানুষটির অপেক্ষায় কাটে সমস্ত রাত-দিন। পাশে থাকলেও মনে হয় এই মুহূর্ত যেন ফুরিয়ে না যায়, এমন একজনকে সেই বিশেষ নামে ডাকতে ইচ্ছে করে, যার হাত ধরে জীবন পার করে দেওয়া যায়।

এই প্রেম ভালোবাসার দিনে আমিই বা কীভাবে শুকনো খটখটে মরুভূমি বা ইট-পাথরের দালানের গল্প বলি! জগতের শাশ্বত প্রেমের ইতিহাসে কত গল্প আছে। সব গল্পে আছে বাঁধভাঙ্গা প্রেম আর উচ্ছ্বাস। সেই উচ্ছ্বাস দেখতে আমি হাজার সাগর, দেশ-মহাদেশ পাড়ি দিতে রাজি আছি। যেখানে গিয়েছিলাম এই অমর প্রেমের ইতিহাসের সাথী হতে, সে দেশটি তুরস্ক। এ রাজ্যের বাতাসে লেখা থাকে ভালোবাসার শ্লোক, প্রতিটি ইট-পাথর মত্ত থাকে সেই প্রেমিকযুগলের জন্য প্রার্থনায় যারা ভালোবেসে হয়েছিল বিদ্রোহী এবং ত্যাগী।

হেলেনকে নিয়ে প্যারিসের ট্রয় যাত্রা। শিল্পী: বাসটিয়ান লা লুফ 

সেই কন্যা হেঁটে বেড়ায় তার আপন ফুল বাগানে। কতই না সুখী ছিল সে প্রেমের সঙ্গে। যে প্রেম তাকে করেছে দেশান্তরি,  করেছে বিবাগী। সে প্রেমের জোয়ার সামলাতে যদি কেউ পারেন তবে তিনি হবেন দেবতা। মানুষ ভালোবাসে মানুষকে,  ভালোবেসে কাছে আসে, মর্ত্যের ভালোবাসার সৌন্দর্যই এমন। সে ছিল রানী, বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি তার রাজা বাহাদুর। কত শত চাকর নোকর, কত তাদের শান-শওকত। কত যে সমৃদ্ধ রাজার নগরী। একদিন ভালোবাসা এলো নাও বেয়ে। এভাবেও কেউ আসে?

আসলে তো এভাবেই আসতে হয়। ভালোবাসাবাসি হলো রানীতে আর অন্য রাজ্যের রাজার কুমারের। রাজপুত্রের ফেরার কালে রানী বেছে নিলো কাঁটাময় পথ। ভালোবাসা যেমন অপরাধ নয়, তেমনি অপরাধ নয় দেশান্তরি হওয়া। সে শুধু জেনেছিল ভালোবাসলে এমন কতশত রাজ্য ত্যাগ করা যায়। এমন হয় ভালোবাসলে? এমনই হয়। যে ভালোবেসে হয়েছে অমর আমি তার পবিত্রভূমির মাটি ছুঁয়ে দেখি। এতে পূণ্য বাড়ে, ভালোবাসা হয় গভীর। কিন্তু ভালোবাসলে যে আগাছার মত শত্রু গজায়, সে জানা ছিল না। ভালোবাসলে তার দায় শোধ করতে হয় কড়ায় গণ্ডায়। যে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসে, সে একটু বেশিই ভালোবেসে কাঙাল হতে চায়। রানী চলে যাবার ক্রোধে রাজা আক্রমণ করে দূরদেশে রাজপুত্রের রাজ্য। হাজার জাহাজ চলল রানীকে ফিরিয়ে আনতে। কেউ কারো চেয়ে কম হয়। যুদ্ধ চলে এক বছর, পাঁচ বছর, যুদ্ধ চলে দশ বছর। তারপরও রাজার বাহিনী সে রাজ্যকে টলাতে পারে না, পারে না নগরে প্রবেশ করতে।

এত যুদ্ধ, এত নিহত, এত ক্ষতিতেও প্রেমিকযুগলের ভালোবাসার একটুও খামতি ঘটেনি। প্রেম যদি সত্য প্রেম পায় তবে তা বাড়তে থাকে আঙ্গুর বাগানের মতো। সেকালে রাজা-বাদশাদের জন্য হত্যা, অপহরণ, লুটপাট  কোনো বড় ব্যাপার ছিল না। একালেও কি কোনো বড় ব্যাপার? কত প্রেম নীরবে ঝরে যায় নিষেধের বেড়াজালে, কত ভালোবাসার হত্যা হয় সামাজিকতার ভয়ে, তার খবর কেই-বা রাখে? হায় হৃদয়হীনতা!

ট্রয় নগরীতে ধ্বংসপ্রায় এম্ফিথিয়েটার 

রাজা বারবার পরাজয় মানার মানুষ নয়। সর্বশেষ উপায় হিসেবে চাতুরতার আশ্রয় নিলেন। রাজার সৈন্য ঢুকে পড়ল নগরীতে। জ্বালিয়ে দিলো নগরী। ধ্বংস হয়ে গেল পৃথিবীর সবচেয়ে সত্য ও সুন্দর  প্রেম। হত্যা করা হলো প্রেমিককে, আর রানীকে নিয়ে ফিরে যাওয়া হলো রাজার রাজ্যে। এই প্রেম-রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ আজও পূর্ণ প্রেমের সাক্ষী হয়ে দিগন্তের শোভা বাড়িয়ে চলেছে। মিলিয়ে যায়নি কেউ মিটিয়ে দিতে চাইলেও। সত্য ভালোবাসার এই প্রাচীণ নগরীতে তাই প্রেমিকেরা আজও প্রেমের বন্দনা করে। উৎসর্গ করা হয় কত কিছু অবুঝের ভালোবাসা পাবার আশায়।

সেই সত্য ভালোবাসার নগরী দেখার আশা বুকে বেঁধে পাড়ি দিয়েছি কয়েক হাজার মাইল পথ, কোনো এক সাধনার ফলস্বরূপ আজ আচমকাই সত্য প্রজাপতি হয়ে, ধ্যানের অক্ষর হয়ে ছুঁয়ে দেখে রানী তোমার ভগ্ন প্রাসাদ। রানী যে প্রেমের দেবী আমার কাছে, অন্য দেবতার বন্দনা বৃথা তাই। এই নগরীর সকল পাথর, মাটি যার স্পর্শে বিকশিত, তার ছোঁয়ায় একদিন অবিনশ্বর হয়ে উঠতে পারে আমাদের কলুষিত প্রেম। তিনি হেলেন, আমাদের হেলেন অফ ট্রয়,  ভালোসতে যার এতটুকু কার্পণ্য হয়নি। আর যেখানে আমি যেতে চলেছি তা এক সময়কার ট্রয় নগরী, এখনকার তুরস্কে অবস্থিত।

পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য আমার কাছে ভালোবাসার দৃশ্য, সত্য ভালোবাসার দৃশ্য। চানাক্কালে বাস স্টেশনে বাস থেকে নেমে পাশে রোড ডিভাইডারে মিলল একটি আলিঙ্গনরত যুগলের ভাস্কর্য, ধবধবে সাদা রঙের, টকটকে লাল গোলাপবাগানের বেড়া দিয়ে ঘেরা। তুরস্কের পথেঘাটে এমন ভাস্কর্য অনেক দেখতে পাওয়া যায়, যেখানে প্রেমিক-প্রেমিকার ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। অনেক প্রেমিকযুগলকে এমনভাবেই প্রকাশ্যে ভালোবাসতে দেখেছি তুরস্কে। ভনিতা নেই, নেই কোনো বাধা। এরচেয়ে সুন্দর দৃশ্য আর হয় না। এরচেয়ে আনন্দের আর কিছু হতে পারে না।

চানাক্কালে আমার কাছে অনন্তকালের ভালোবাসার শহর। এ শহরে ছুটে এসেছিল এক প্রেমিকা তার প্রেমিকের হাত ধরে পরিনামের পরোয়া না করে- সে হেলেন। এমন ভালোবাসার জয় হোক।

‘ট্রয়’ সিনেমায় ব্যবহৃত কাঠের ঘোড়া 

তুরস্ক ৯৮ শতাংশ মুসলমান অধ্যুষিত রাষ্ট্র তবুও রক্ষণশীল নয় মোটেই। শুধু ভালোবাসা দেখলেই কি হবে? আমায় যে খুঁজে নিতে হবে হোটেল। ইমেইলে হোটেল থেকে জানানো হয়েছিল যে চানাক্কালে শহরে পৌঁছে বাস থেকে নেমে সাগরপাড়ি দিলেই মিলবে আমার ঠিকানা। এ যে ট্রয় রহস্য উন্মোচনের চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়। দ্বীপের নাম এজিবাত, তবে বিশাল এ ফেরিঘাটে অন্যান্য অনেক দ্বীপের সঙ্গে সংযোগ আছে বলে অনেক গন্তব্যের ফেরি বা জাহাজ ঘাটে ভিড়ে। 
ঠিকঠাক মতো ফেরি পেলে চল্লিশ মিনিটের ফেরি পথ।

তখন সন্ধ্যা নামি নামি করছে। আকাশটা মায়াময় লাল, গোলাপী আর নীলের মাঝে আঁকিবুঁকিতে ব্যস্ত। ডারডেনেলস স্ট্রেইট-এর হিমেল হাওয়ায় কোনো পথিক তার পথের ক্লান্তি ভুলে যেতে রাজি আছে। হোটেল ফেরিঘাট থেকে দুই মিনিটের পথ। এমন অদ্ভুত শুনশান হোটেল যে সারাদিনে কাউকে পাওয়া খুঁজে যায় না। কোথায় কি পাওয়া যায় জিজ্ঞেস করার কেউ নেই, কোথায় কিভাবে যাব তাও ভাগ্যক্রমে কাউকে পাওয়া গেলে তবেই জানা যায়। দ্বীপটি ডারডেনেলস স্ট্রেইট-এর মাঝে যা মর্মর সাগর, এজিয়ান সাগরকে সংযুক্ত করেছে। তুরস্ককে বিভক্ত করতে সহায়তা করেছে এশিয়ান আর ইউরোপিয়ান দুই ভাগে। আর হোটেলের জানালা দিয়ে এই অসীম পান্না সবুজ জল দেখতে দেখতে মনে হয় এই জলের শরীর কেটে কেটে হেলেন এসেছিল এ শহরে, প্রেমিকের কাছে৷

এ শহরের কেউ ইংরেজি জানে না। তবে হোটেল রুম থেকে এমন অপার সমুদ্রাভ সবুজ জলরাশি দেখার লোভ সামলানো যায়নি বলেই রোজ দু’বার ঘণ্টাখানেকের জাহাজ বা ফেরি ভ্রমণ সেরে ডেরায় ফিরতে হতো। সঙ্গে মুফতে ছিল দেশ-বিদেশের লোক দেখে বেড়ানো। কেউ বাইক চালিয়ে দলবেঁধে চলে এসেছে দেশের অন্য প্রান্ত থেকে। কেউ ১৯৪০ সালের ছাদ খোলা ফিটন, রোডমাস্টার বা ক্যাডিলাক গাড়ি চালিয়ে এসেছে ইউরোপ বা ইংল্যান্ড  থেকে। পুরনো আমলের গাড়ি চালিয়ে ভ্রমণ এক ধরনের নেশা অনেকের। কেউ পরিবার নিয়ে বেড়াতে এসেছে এই দ্বীপে, কেউ বা কাজে- দেখে দেখে কয়েক যুগ কাটিয়ে দেওয়া যায়।

ডারডেনালস স্ট্রেইট 

যে কাজে এসেছি এত দূর মানে ট্রয় নগরী দেখতে যাব আজ। হোটেল ছাড়লাম কাকভোরে। ফেরিঘাটে অপেক্ষা একটুও খারাপ লাগছিল না। সকালের সাগর আরো মোহময়। পাখির ঝাঁক যেন পাল্লা দিতে চাইছে জাহাজের সঙ্গে। মাথার উপরে গাঙচিলের উড়ন্ত খুনসুটি আর সমুদ্রাভ সবুজ সাগর, এক মায়াপুরী। লাফিয়ে, উড়ে যেন সাগর পার হয়ে গেলাম। চানাক্কালে শহর থেকে ট্রয় শহরের দূরত্ব প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার। বাস স্ট্যান্ডে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না বাসের জন্য। আধ ঘণ্টার মধ্যে বাস আমাকে নামিয়ে দিলো ঐতিহাসিক ট্রয় নগরীতে৷

খ্রিস্টের জন্মের প্রায় হাজার বছর আগের কথা, গ্রীসের স্পার্টা রাজ্যের রাজা মেনেলাস সুখে শান্তিতে বসবাস করছিলেন রানী হেলেনকে নিয়ে। পাশের রাজ্য ট্রয় থেকে রাজপুত্র হেক্টর ভাই প্যারিসকে নিয়ে রাজনৈতিক আলাপ আলোচনার জন্য আসেন স্পার্টায়। যখন মেনেলাস আর হেক্টর রাজনৈতিক আলাপে ব্যস্ত তখন সুদর্শন প্যারিস প্রেমে পরে যান হেলেনের৷ রানীরও একই দশা। ফেরার সময় প্যারিসের সঙ্গে চুপিসারে হেলেন পালিয়ে যান ট্রয় নগরে স্পার্টা ছেড়ে। রানীকে না পেয়ে রাজা দিশেহারা হয়ে সৈন্যসামন্ত নিয়ে সাগরপাড়ি দিয়ে আক্রমণ করেন ট্রয় নগরী। কিন্তু লাগাতার দশ বছর যুদ্ধ যাকে বলা হয় ‘ট্রোজান ওয়ার’ চলার পরও মেনেলাস সুবিধা করে উঠতে পারেননি, প্রবেশ করতে পারেননি ট্রয়ে। শেষ চাল হিসেবে তাঁর সৈন্যরা একটি বড় কাঠের ঘোড়াকে ট্রয় নগরীর সামনে রেখে লুকিয়ে থাকেন। ট্রয়ের যোদ্ধারা মনে করেন রাজা মেনেলাস হার মেনে পালিয়ে গিয়েছেন আর তাদের জন্য ঘোড়াটি রেখে গেছেন। এই ভেবে ঘোড়াটিকে শহরের ভেতরে এনে রাখে। আসলে ঘোড়াটির ভেতরে লুকিয়ে ছিল মেনেলাসের সৈন্যরা, যারা রাতের অন্ধকারে বেরিয়ে এসে ট্রয় নগর আক্রমণ করে, জ্বালিয়ে দেয় শহর। প্যারিসকে হত্যা করে হেলেনকে নিয়ে রাজা ফিরে যান নিজ রাজ্যে।

অনেকে আবার এও বলে থাকেন- হেলেন পালিয়ে আসেননি, প্যারিস তাকে অপহরণ করেন। বিভিন্ন ম্যুভিতেও সেরকম দেখানো হয়। ঘটনার সত্যতা যাই হোক না কেন, ট্রয় নগরী মোট নয়বার ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় বাইরের রাজ্যের হামলায় বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ নির্মিত হয়েছিল কয়েক হাজার বছরের ইতিহাসে এবং পঞ্চম শতাব্দীতে নগরীটি কালের গর্ভে পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায়। অবশ্য বাসটিয়ান লা লুফ দিহারমের চিত্রকর্মে হেলেন ও প্যারিসের মুখের অভিব্যক্তি দেখে কিন্তু মনে হয় হেলেন খুশী মনেই চলেছে প্যারিসের সঙ্গে।

ট্রয়ের দুর্গ প্রাচীর 

গ্রীক পুরাণে লেখা, দেবতা জিউস ও দেবী লিডার কন্যাসন্তান হলেন হেলেন। প্রেমের দেবী আফ্রোদিতি একবার যুবরাজ প্যারিসকে এই বর দান করেন যে, বিশ্বচরাচরের সবচেয়ে সুন্দর নারী হেলেন হবে তার সঙ্গিনী, প্যারিসের প্রেমে পড়ে যাবে সে। এভাবেই তৈরি হবে হেলেন আর প্যারিসের প্রেম উপাখ্যান। আর হেলেন হবে ‘হেলেন অফ ট্রয়’ আর কারও নয়।

ইতিহাসে ট্রয় নগরী সম্পর্কে বেশ কিছু ভিন্ন ভিন্ন ঘটনার বর্ণনা দেওয়া আছে। কবি হোমার কাব্যগ্রন্থ ‘ইলিয়াড’ ও ‘ওডিসি’তে ট্রয় সম্পর্কে লিখেছেন। ট্রয় নগরীতে পা ফেলে দেখি এখন রং চটা, পলেস্তারা খসা জীর্ণ এক ভাঙা মেলাঘর। নগর আছে, বাজার আছে, এম্ফিথিয়েটার আছে, রাজপ্রাসাদ, দুর্গ সবই আছে শুধু ছাদহীন, দেয়ালহীন ধ্বংসপ্রাপ্ত এক বিরাণ ধূ ধূ প্রান্তর। এক সময়কার সমৃদ্ধশালী নগর এখন নিভু নিভু প্রদীপের সলতের শেষ অংশ। প্রবেশপথ পেরোলে দেখি ট্রোজান ওয়ারে ব্যবহৃত কাঠের ঘোড়ার মতো একটি ঘোড়া। এটি হলিউডের ‘ট্রয়’ ম্যুভির শ্যুটিং করার সময় ব্যবহার করা হয়েছিল।

ঘোড়া পেরিয়ে সামনে এগোলে রাখা আছে তখনকার আমলের রসুইঘরে ব্যবহৃত আধ ভাঙা মাটির বিশাল হাড়িপাতিল, জলের পাত্র। এরপর এম্ফিথিয়েটার। একমাত্র এম্ফিথিয়েটারটিই বোধহয় নিজ আকারে এখনও রয়ে গিয়ে নিজের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে। তুরস্কের অন্যান্য প্রাচীণ এম্ফিথিয়েটারে যেমন যাওয়া যায়, সিঁড়িতে বসা যায় এটিতে ঢোকার অনুমতি নেই। ক্ষয় হবার ভয়ে এরকম ব্যবস্থা করা হয়েছে। এরপর লম্বা পথ পেরিয়ে হাতের ডান দিকে দেখা মিলবে আসল শহরের। যেখানে মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়া কয়েকটি পাথরের ভীত দেখে মনে হলো একটা ভবন ছিল, আর মাঝখানে গোলাকার কুয়া। এই কুয়া থেকেই বুঝি হেলেন সুন্দরীর জন্য জল তোলা হতো। 

চানাক্কালে শহরে যুগলের ভাস্কর্য          

আরও খানিক সামনে এগোলে বিশাল খালি এলাকা, একসময় ট্রয় রাজ্যের অংশভূত ছিল। ডানে আরেকটি পথ চলে গিয়েছে। সেদিকটায় রাজার প্রসাদ। অন্যান্য ভবনের মতোই মাটিতে বিলীন। একটা স্থাপনা বেশ সুন্দরভাবে এখনও টিকে আছে। ঢালু স্লোপের মতো জায়গাটিকে বলা হয় র্যা ম্প। ট্রয় রাজ্যের প্রায় সব সম্পদ লুট করা হয় বিভিন্ন সময়ে যার মধ্যে খুব অল্প জিনিস আছে খোদ তুরস্কে। পৃথিবীর মোট আটটি শহরের জাদুঘরে সেসব সংরক্ষিত আছে। র্যা ম্প থেকে এগোলে শহরের দুর্গ। একমাত্র দুর্গের দেয়ালই কোনো রকমে টিকে আছে৷ সেটিকে লম্বা লোহার ভীত আর প্লাস্টিক ফাইবারের ছাউনি দিয়ে সংরক্ষণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। কোনো ভবন এখন টিকে নেই। দেয়াল বলে কিছুই নেই, শুধু ভীতগুলো কোনরকমে গায়ে গা লাগিয়ে পড়ে আছে নির্বাক। যাদের এখন সবাক করবার মন্ত্র কারো জানা নেই। একমাত্র দেয়াল যা টিকে রয়েছে এবং প্রত্নতত্ত্ববিদগণ আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন দাঁড় করিয়ে রাখার তা হলো নগর দুর্গ, যাতে আর কোনোরূপ ক্ষতি হতে না পারে।

এই সেই নগরী যেখানে হেলেন হেঁটে বেড়াতেন, যেখানে প্যারিস আর হেলেন চাঁদের আলোয় একে অন্যের মুখ দেখে প্রেম নিবেদনে ব্যস্ত থাকতেন। আজ সে প্রাঞ্জল নগরী ঘুমিয়ে পড়া এক নীরব জনপদ হয়ে মাটিতে মিশে পড়ে আছে৷ একে একে বাজার, থিয়েটার, দুর্গ, প্রাসাদ পার হয়ে দেখি শূন্য উদ্যানের চারিদিকে ফুটে রয়েছে ছোট ছোট লাল, হলুদ বুনোফুল। যেন চুপি চুপি হেলেনের প্রেমের রঙ বিলিয়ে যাচ্ছে। এরা আফিম বাগানের সদৃশ্য, প্রেম তো আফিমই, ধরলে ছাড়া যায় না।  আমার মনে হলো এই নগরীকে বলি:

‘ফুলের আঘাতে মরে যাবার আশায় 
আমিও ঝুঁকি ফুলবাগানের আশ্রয়ে।’

ফেরার পথে ফুলের দোকান থেকে একগুচ্ছ গোলাপ কিনে এই অবিনশ্বর প্রেমকে স্মরণ করতে করতে রেখে এলাম শহরের সেই আলিঙ্গনরত ভাস্কর্যের সামনে। 


ছবি: লেখক 
 

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়