ঢাকা     বুধবার   ২৯ জুন ২০২২ ||  আষাঢ় ১৫ ১৪২৯ ||  ২৯ জিলক্বদ ১৪৪৩

বিদ্রোহী কবিতার জন্মশতবর্ষ

মারুফ রায়হান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:০১, ২৬ ডিসেম্বর ২০২১   আপডেট: ১৭:০৬, ২৮ ডিসেম্বর ২০২১
বিদ্রোহী কবিতার জন্মশতবর্ষ

বিদ্রোহী কবিতায় বিচিত্র বিবিধ ব্যঞ্জনা, ছন্দের সানন্দ সপ্রাণতা, মধ্যমিলের ম্যাজিক, অন্তমিলের অন্তরদোলানো মিউজিক, অনুপ্রাসের অনুরণন- সব মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব শিহরণ, আদ্যোপান্ত ঝংকার। এমনটি না হলে কবিগুরু কি আর কবিকণ্ঠে কবিতাটি শুনে তাঁকে বুকে জড়িয়ে নিতেন! পীড়নপিষ্ট, লাঞ্ছিত বঞ্চিত অবমানিত বিহ্বল বিপন্ন মানবগোত্রের সম্মিলিত শিল্পসম্মত মানবিক ইশতেহার এই বিদ্রোহী কবিতা। এ কবিতা নিজেকে নিজে কিংবা সম্মুখস্থ স্বজাতিকে শোনাতে শোনাতে নিজেকে উন্মাদই তো মনে হবে; তুরীয়ানন্দে, মুক্ত জীবনের আনন্দে, বাধা না মানা এক মোহন পরম উন্মাদ

আজ পঁচিশে ডিসেম্বর ‘বিদ্রোহী’ প্রসঙ্গে লিখতে বসে শিহরণ বোধ করছি ভেবে যে, ঠিক একশ’ বছর আগে এদিনে কাজী নজরুল ইসলাম রচনা করেছিলেন তাঁর অমর কবিতা ‘বিদ্রোহী’। বাংলা কবিতাভুবনে একক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম হলো একটি কবিতার জন্মশতবর্ষ স্মরণ ও উদযাপন। ভুলছি না, রবীন্দ্রনাথ শত বছর পরে তাঁর কবিতার পাঠকদের কথাটি কল্পনায় রেখে একটি কবিতা লিখেছিলেন ‘১৪০০ সাল’ নামে। ভাবনাটি অভিনব, সন্দেহ নেই। তাই কবিতার শিরোনাম রবীন্দ্রপ্রেমীরা বিস্মৃত হননি এবং বাংলা ১৪০০ সালের প্রথম প্রভাতে এবং পঁচিশতম দিবসে কবিগুরুর জন্মজয়ন্তীতে বিলক্ষণ কবিতাটি আবৃত্তিকারদের জন্য বিশেষ পছন্দ ছিল। কিন্তু নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা তেমন আনুষ্ঠানিক আড়ম্বরযুক্ত এবং সুনির্দিষ্ট সময়খচিত না হলেও এ কবিতার জন্মশতবর্ষের ক্ষণটিকে স্মরণ করছে বিশ্বব্যাপী বাংলা কবিতার অনুরাগীবৃন্দ। এ এক মহাবিস্ময়! এক দশক আগেই, কবিতাটির নব্বুই পূর্তির সময়ে আগাম সচেতনবার্তাটি জনসমক্ষে প্রচারিত হয় ঘটা করে, সেটিও উল্লেখ করবার মতো। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচনার ৯০ বছর পূর্তি উপলক্ষে নজরুল ইনস্টিটিউট এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় যৌথভাবে সম্মেলনের আয়োজন করেছিল। বিদ্রোহী কবিতার জন্মশতবর্ষ নানা কারণে তাৎপর্যপূর্ণ; এটি নজরুলের কথিত স্বপ্নমথিত ‘বাংলাদেশ’ নামের সবুজ একটি দেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছর। দেশটির রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে মসজিদের পাশে চিরশায়িত কবির নামে এই শহরেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইনস্টিটিউট। সেইসঙ্গে উদ্বোধিত হয়েছে বহু প্রতিষ্ঠান। জাতীয় কবির মর্যাদায় অভিষিক্ত কবি নজরুলের এই একটি কবিতা পাঠের (বা শ্রবণের) সুবাদে দেশটির সকল প্রান্তে সব শ্রেণিপেশার মানুষ কবিকে তাদের হৃদয়-আসনে চির অধিষ্ঠিত করেছে।

২.
১৯২১ সালের ডিসেম্বর, ক্রিসমাসের রাত। কলকাতার ৩/৪সি, তালতলা লেনের একটি বাড়িতে বসে কাঠ পেন্সিলে এই কালজয়ী কবিতা লিখতে শুরু করেন সদ্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধফেরত বাইশ বছরের যুবক কাজী নজরুল ইসলাম। খুব সম্ভবত বিদ্রোহী কবিতা প্রসঙ্গে যত লেখালেখি হয়েছে, বাংলা ভাষার অন্য কোনো কবিতা নিয়ে তার এক দশমাংশও হয়নি। তিনটি বহুল প্রচারিত বিষয়ের উল্লেখ করছি আজকের নবীন পাঠকের জন্যে।

ক.
কমরেড মোজাফফর আহমদ লিখেছেন, ‘তখন নজরুল আর আমি নিচের তলার পুব দিকের, অর্থাৎ বাড়ীর নিচেকার দক্ষিণ-পূর্ব কোণের ঘরটি নিয়ে থাকি। এই ঘরেই কাজী নজরুল ইসলাম তার ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি লিখেছিল। সে কবিতাটি লিখেছিল রাত্রিতে। রাত্রির কোন সময়ে তা আমি জানিনে। রাত দশটার পরে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলুম। সকালে ঘুম থেকে উঠে মুখ ধুয়ে এসে আমি বসেছি এমন সময় নজরুল বলল, সে একটি কবিতা লিখেছে।’
‘পুরো কবিতাটি সে তখন আমায় পড়ে শোনাল। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার আমিই প্রথম শ্রোতা।’

খ.
এ কবিতায় হিন্দু-মুসলমান দুজনেরই এত পুরাণ প্রসঙ্গ ঢুকেছে যে ব্রিটিশ সরকার সরাসরি একে রাজদ্রোহ বলে চিহ্নিত করতে পারল না। কখনো ঈশান-বিষানের ওঙ্কার বাজছে, কখনো বা ইস্রাফিলের শিঙ্গা থেকে উঠছে ঝঙ্কার। কখনো বা হাতে নিয়েছে মহাদেবের ডমরু-ত্রিশূল, কখনো বা আর্ফিয়াসের বাঁশি। কখনো বাসুকীর ফণা জাপটে ধরেছে। কখনো বা জিব্রাইলের আগুনের পাখা, কখনো চড়েছে তাজি বোরাক (পক্ষীরাজ ঘোড়া)-কে কখনো বা উচ্চৈঃ শ্রবায়। একে রাজদ্রোহ বলতে গেলে ধর্মের উপরে হাত দেওয়া হবে। -জৈষ্ঠ্যের ঝড়, অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্ত

গ.
‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি ষান্মাত্রিক মাত্রাবৃত্ত মুক্তক ছন্দে রচিত, এ কবিতায় মাত্রাবৃত্ত মুক্তক ছন্দ সমিল কিন্তু ছন্দের বৈশিষ্ট্য-আনা হয়েছে মাত্রাবৃত্তে প্রবহমানতা সঞ্চার করে। পর্ব বিভাগ ছয় মাত্রার চালে কিন্তু চরণের শুরুতে একটি অতিরিক্ত পর্ব এবং চরণের শেষে খন্ড পর্ব রয়েছে। ফলে পঙক্তিগুলি সমান নয়। এই বৈচিত্র্য প্রয়োজন হয়েছে ভাব ও বক্তব্যের কারণে, ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কবির আত্মগত ভাবোচ্ছ্বাসের যে বিচিত্র প্রকাশ তাতে ওই ছন্দ বৈচিত্রের প্রয়োজন ছিল। -বিশ শতকের বিস্ময়কর কবিতা ‘বিদ্রোহী’, ড. রফিকুল ইসলাম

৩.
বিদ্রোহী কবিতা একা একা পড়বার নয়, নয় কানে কানে কাউকে শোনানোরও। এ হলো লোকসমাজের কবিতা। এক নবজাগরণের উচ্চকিত উত্তুঙ্গ উৎসবের। শুধু কি বঙ্গসমাজের? কবিতা কালের পরিচয়বাহী হয়েও হতে পারে কালোত্তীর্ণ। নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সীমানা ছাড়িয়ে হয়ে উঠতে পারে সমগ্র গ্রহের। যদিও বাংলা ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষাতে এ কবিতার অনুবাদ দুরূহ। না, অসম্ভব বললেই যথার্থ হবে। বাংলা যার মাতৃভাষা, কবিতা যাকে স্পর্শ করে পরমপ্রিয় স্বজনের ওষ্ঠস্পর্শের মতোই, বাংলায় যিনি স্বপ্ন দেখেন এবং বিশ্বের যে প্রান্তেই থাকুন, বাঙালিসমাজেই বসবাস করেন- এমন যে কেউ, যদি তিনি হোন অক্ষরজ্ঞানবঞ্চিতও, তবু তাকে এ কবিতার সঠিক পাঠ ( শব্দের ওজন ও মাত্রা এবং ছন্দ ও পর্ববিভাজন বুঝে) এক উদ্দীপিত সাহসী, প্রতিবাদী দ্রোহী সত্তায় রূপান্তর ঘটাবে, ক্ষণকালের জন্যে হলেও। শিল্পশাখার সবচেয়ে শুদ্ধ সংবেদী কবিতা নামের মাধ্যমটিরই যে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত স্বকীয় শক্তি রয়েছে, যা ইতিহাসের জননায়কের আহ্বানের মতোই অর্থপূর্ণতায় সমর্পিত করে, সম্পূর্ণ সমর্থন যোগায়, তারই প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত এ কবিতা। পীড়নপিষ্ট, লাঞ্ছিত বঞ্চিত অবমানিত বিহ্বল বিপন্ন মানবগোত্রের সম্মিলিত শিল্পসম্মত মানবিক ইশতেহার এই বিদ্রোহী কবিতা। এ কবিতা নিজেকে নিজে কিংবা সম্মুখস্থ স্বজাতিকে শোনাতে শোনাতে নিজেকে উন্মাদই তো মনে হবে; তুরীয়ানন্দে, মুক্ত জীবনের আনন্দে, বাধা না মানা এক মোহন পরম উন্মাদ। কবিতায় অবশ্য মাত্র দুবার উচ্চারিত হয়েছে- আমি উন্মাদ আমি উন্মাদ। উন্মাদ বিনা প্রচল পঙ্কিল আগ্রাসী স্বৈরস্বভাবী শাসনশোষণের অত্যাচারী সিংহাসনে কী উপায়ে শব্দের চাবুক চালানো সম্ভব! মানবের সুন্দরতম স্বাধীন সত্তার প্রতিপক্ষ তো কেবল কোনো সাম্রাজ্যবাদী কুটিল নিষ্ঠুর রাষ্ট্রের ধ্বজাধারী নয়, কখনো বা স্বয়ং ঈশ্বরও বটেন; কবির ভাষায় শোক-তাপ হানা খেয়ালী বিধাতা। বাংলার বীর (কিংবা স্বয়ং কবি) তাই ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী। ভগবান-বুকে কবি-কথিত বীর তাই এঁকে দেন পদচিহ্ন।
বিদ্রোহী কবিতায় বিচিত্র বিবিধ ব্যঞ্জনা, ছন্দের সানন্দ সপ্রাণতা, মধ্যমিলের ম্যাজিক, অন্তমিলের অন্তরদোলানো মিউজিক, অনুপ্রাসের অনুরণন- সব মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব শিহরণ, আদ্যোপান্ত ঝংকার। এমনটি না হলে কবিগুরু কি আর কবিকণ্ঠে কবিতাটি শুনে তাঁকে বুকে জড়িয়ে নিতেন! (তথ্যসূত্র: অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্য্যরে লেখা)
বিদ্রোহী কবিতার বহুসঞ্চারী বয়ানের উপসংহার-বার্তা হিসেবে এই দুটি চরণকে চিহ্নিত করলে ভুল হবে না।

আমি     বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দেবো পদ-চিহ্ন!
আমি     খেয়ালী-বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন!

বাংলা কবিতাবিশ্বে আশ্চর্য অভিনব কিছু অন্তমিল আমরা সবিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করি এ কবিতায় (যেমন, শির/ জয়শ্রীর, আইন/ মাইন, হিন্দোল/ তিন দোল, মন যা/ ঝনঝা, দুর্মদ/ মদ, সৈনিক/ গৈরিক, বহ্নি/ ধন্যি, সত্য/ মর্ত্য, প্রভৃতি), তবু উদ্ধৃত অংশে চিহ্ন-র সঙ্গে সহজাত স্বতোঃস্ফূর্ত সহজ সংকলিত ‘ছিন্ন’ শব্দটির প্রয়োগ না করে তিনি করেছেন ‘ভিন্ন’ শব্দ, যা নিশ্চিতরূপেই ভিন্নতা ও ঋজুতা এনেছে উপসংহারে। বীর কর্তৃক ভগবানের বক্ষ ছিন্নভিন্ন করার চিত্রকল্পই পাঠকের বোধে অনুরণন তোলে।   
চির-বিদ্রোহী বীরের এই বিবৃতটিও পাঠককে স্মরণে রাখতে বলি:

আমি   রুষে উঠি’ যবে ছুটি মহাকাশ ছাপিয়া,
  ভয়ে    সপ্ত নরক হাবিয়া দোজখ নিভে নিভে যায় কাঁপিয়া!
  আমি   বিদ্রোহ-বাহী নিখিল অখিল ব্যাপিয়া!

বিদ্রোহ-বাহী বীরের রোষে সাতটি নরকের আগুন কেঁপে নিভে নিভে যায়- এমন অত্যাশ্চর্য চিত্রকল্পটি নজরুলই প্রথম কবিতাজগতে উপস্থাপন করলেন।

৪.
বিদ্রোহী কবিতার শততম জন্মক্ষণটিতে আমরা যখন এ কবিতা পড়ছি, বলা ভালো নিজেকে ও অন্যদের শোনাচ্ছি, তখন কি কেবল একটি কালজয়ী কবিতার জন্মেরই বন্দনা করছি! তা নয় শুধু। আমরা বলতে চাইছি, এখনও পৃথিবীতে রয়েছে সাম্রাজ্যবাদ আধিপত্যবাদ পুঁজিবাদ বর্ণবাদ- উত্তরাধুনিক রূপেই বিদ্যমান এসব, আছে ত্রাস গুমখুন, আছে বাকস্বাধীনতার টুঁটি চেপে ধরা। তখন, করোনাকবলিত বিশ্বে করোনাবাণিজ্যপ্লাবী এশিয়ায় আফ্রিকায় ইউরোপ আমেরিকায়, আমরা চাইছি নতুন দিনের নজরুল, দ্রোহের নতুন কবিতা। অবশ্যই শত বছর আগের বিদ্রোহ কবিতাটিই সেটির ভিত্তি রচনায় প্রেরণা জোগাবে। এমনভাবে ভাবতে পারার জন্যে কাজী নজরুলই আমাদের আহ্বান করছেন যেন।  

ইতি টানার আগে বলি, এ কবিতা আর কিছু নয় আরাধ্য কাঙ্ক্ষিত বীরেরই চিত্রায়ন। বীরকে আহ্বান করছেন কবিই। যদিও শেষ পঙক্তিতে ‘একা’ বীরের কথা বলা হলেও, এই বীর শুধু কবি নজরুলের বিদ্রোহী-বীর সত্তাই নয়, এটি কবির স্বদেশের প্রতিটি মুক্তিকামী মুক্ত-সত্তার মানবের অন্তর্গত বীরেরই দর্পিত-স্পর্ধিত অনন্য উদ্ভাসন। প্রতিটি কবিতার জন্মের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক প্রেক্ষাপট, কবিহৃদয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের অভিঘাত এবং গভীর অনুভূতির সম্মন্ধ থাকে। পরাধীন দেশে পশ্চাদপদ সমাজে বিজাতীয় শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়ন নির্যাতনের বাস্তবতায় বিদ্রোহী কবিতার জন্ম হয়েছে বটে, কিন্তু আজ একশ’ বছর পরে, আমরা স্পষ্টত অনুভব করে উঠতে পারছি যে, কবিতাটি হয়ে উঠেছে সর্বজনীন ও সর্বকালীন। এটি নিষ্পিষ্ট আহত মানবের সুপ্ত বীরসত্তারই সুতীব্র অমোঘ উচ্চারণ। কবিতাটিকে এখন আর কেবল বাঙালির অনিবার্য উপলব্ধি হিসেবে দেখলে চলে না, এটির অন্তর্নিহিত ভাষ্য ও বার্তা পৃথিবীর যে কোনো ভাষার প্রকৃত মানুষের আত্মস্বর হয়ে ওঠার দাবি রাখে।

ঢাকা/শান্ত

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়