ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ০৬ অক্টোবর ২০২২ ||  আশ্বিন ২১ ১৪২৯ ||  ০৯ রবিউল আউয়াল ১৪১৪

‘পুতুলনাচের ইতিকথা’: ভাষার জাদু

জাকির তালুকদার || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:৫৩, ৮ জুলাই ২০২২  
‘পুতুলনাচের ইতিকথা’: ভাষার জাদু

‘‘শ্রীচরণকমলেষু
আপনি বোধহয় জানেন আমি প্রায় দুই বৎসর হইল মাথার অসুখে ভুগিতেছি, মাঝে মাঝে অজ্ঞান হইয়া যাই। এ পর্যন্ত্য নানাভাবে চিকিৎসা হইয়াছে কিন্তু সাময়িকভাবে একটু উপকার হইলেও আসল অসুখ সারে নাই। কয়েকজন বড় বড় ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করিয়া আমি বুঝিতে পারিয়াছি কেবল ডাক্তারি চিকিৎসার উপর নির্ভর করিয়া থাকিলে সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করা সম্ভব হইবে কি না সন্দেহ। অথচ প্রথম অবস্থায় আরোগ্যলাভের ব্যবস্থা না করিলে অসুখ যত পুরাতন হইবে, ততই আরোগ্যের সম্ভাবনা কমিয়া যাইবে। সুতরাং অন্য চিন্তা স্থগিত রাখিয়া সর্ব্বাগ্রে আমাকে সুস্থ হইবার জন্য সর্ব্বপ্রকার চেষ্টা করিতে হইবে।

আমার যতদূর বিশ্বাস, সাহিত্যক্ষেত্রে তাড়াতাড়ি নাম করিবার জন্য স্বাস্থ্যকে সম্পূর্ণ অবহেলা করাই আমার এই অসুখের কারণ। আমার প্রথম পুস্তক ১৩৪০ সালে প্রকাশিত হয়। তিন চার বৎসরের মধ্যে বাঙ্গালা সাহিত্যের অধিকাংশ সমালোচক স্বীকার করিয়াছেন যে, রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের পরবর্ত্তী যুগে আমি সর্ব্বশ্রেষ্ঠ লেখক। অবশ্য mass এর নিকট popular হইতে আমার কিছুদিন সময় লাগিবে, কারণ massmind নূতন চিন্তাধারাকে অত্যন্ত ধীরে ধীরে গ্রহণ করে। এই নিয়মে শিক্ষিত শ্রেণী ছাড়া mass-এর মধ্যেও আমার popularity যে ক্রমে ক্রমে বাড়িতেছে তাহার পরিচয়ও আমি পাইতেছি। বাঙ্গালা দেশে সাহিত্যক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য আমাকে আর কিছু করিতে হইবে না।

কিন্তু দুঃখের বিষয় আমি যখন International fame- এর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করিতেছিলাম, সেই সময় এই অসুখ হইয়া সব গোলমাল করিয়া দিয়াছে। যে সময়ের মধ্যে এবং যে বয়সে আমি বাঙ্গালা সাহিত্যে যতখানি প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছি, বাঙ্গালা দেশে আর কেহই তাহা পারে নাই। অন্য দেশের সাহিত্যের ইতিহাসেও এরূপ দৃষ্টান্ত নাই। এজন্য আমার স্বাস্থ্যহানি ঘটিবে তাহা আমি জানিতাম, কিন্তু এরূপ একটি অসুখ যে হইবে তাহা আমি কল্পনাও করিতে পারি নাই। সাধারণভাবে স্বাস্থ্য খারাপ হইলে বৎসরখানেক লেখা ও পড়া কমাইয়া দিয়া নিয়মমত থাকিলে স্বাস্থ্য ভাল করা যাইবে আমার এইরূপই ধারণা ছিল।

আমি এক বৎসর কাল আমার এই অসুখ সারাইবার জন্য ব্যয় করিব স্থির করিয়াছি। জোড়াতালি দেওয়া চিকিৎসার পরিবর্ত্তে আরোগ্য লাভের জন্য যাহা কিছু প্রয়োজন সমস্ত ব্যবস্থা করিব, কারণ তাহা না করিলে এই অসুখ সারিবে কি না বলা কঠিন। এক বৎসর চেষ্টা করিয়া যদি আরোগ্য লাভ না করিতে পারি, তাহা হইলে বুঝিতে পারিব আমার যে অত্যন্ত উচ্চ ambition ছিল তাহা সম্পূর্ণরূপে সফল করিতে পারিব না। আংশিক সাফল্য লইয়াই আমাকে জীবন কাটাইতে হইবে। এভাবে বাঁচিয়া থাকিবার ইচ্ছা আমার নাই।”

জ্যেষ্ঠভ্রাতা সুধাংশুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে ১৯৩৭ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর তারিখে লেখা এই চিঠিতে ‘সাহিত্যক্ষেত্রে তাড়াতাড়ি নাম করা’র যে কথা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, সেই তাড়াতাড়ি আসলে কতটা তাড়াতাড়ি ছিল?

এই চিঠি লেখার সময় অর্থাৎ ১৯৩৭ সালে লেখকের বয়স ছিল ২৯ বৎসর। আর যদি তাঁর প্রথম প্রকাশিত গল্পটিকে সাহিত্যচর্চার শুরুর বিন্দু হিসাবে ধরে নেওয়া যায় তাহলে তাঁর লেখালেখির বয়স ছিল মাত্র ৯ বৎসর। এই মাত্র ৯ বৎসর সময়ের মধ্যে তাঁর সাহিত্য সৃষ্টির পরিমাণ ও উৎকর্ষের মাত্রা একটি তালিকা তৈরি করে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে।

প্রথম গল্প ‘অতসীমামী’ বিচিত্রা পত্রিকায় ছাপার অক্ষরে বেরুল ১৯২৮ সালের ডিসেম্বর সংখ্যায়। ১৯২৯ সালে ঐ বিচিত্রা পত্রিকাতেই প্রকাশিত হলো দ্বিতীয় ও তৃতীয় গল্প যথাক্রমে ‘নেকী’ ও ‘ব্যথার পূজা’। প্রথম উপন্যাস ‘দিবারাত্রির কাব্য’ রচনা শুরু এই বছরেই। এই সময়েই সাহিত্যচর্চায় তাঁর অতি আগ্রহ নিয়ে পারিবারিক বিরোধের সূত্রপাত। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তত দিনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন যে, সাহিত্যচর্চাই হবে তাঁর জীবনের মূল কাজ। তাই কলেজের লেখাপড়া বা প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ায় আর সময় নষ্ট না করে পুরোপুরি তাঁর মনোনিবেশ ঘটল সাহিত্য রচনায়। ১৯৩৪ সালের মধ্যে লেখা হয়ে যায় ‘দিবারাত্রির কাব্য’ এবং ‘পদ্মানদীর মাঝি’র মতো যুগ-নির্ধারক উপন্যাস।

‘বঙ্গশ্রী’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে ‘দিবারাত্রির কাব্য’ আর ‘পূর্ব্বাশা’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে বেরুতে থাকে ‘পদ্মানদীর মাঝি’। পরের বছর ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকায় শুরু হয় ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’র প্রকাশ। এই ১৯৩৫ সালেই গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হলো তাঁর উপন্যাস ‘জননী’ ও ‘দিবারাত্রির কাব্য’ এবং গল্পগ্রন্থ ‘অতসীমামী’। ১৯৩৬ সালে একই বছরে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হলো তিন-তিনটি উপন্যাস- ‘পদ্মানদীর মাঝি’ ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ এবং ‘জীবনের জটিলতা’।

এই তালিকাই বলে দিচ্ছে বাংলাসাহিত্যে চিরস্থায়ী স্থান লাভের মতো অবিস্মরণীয় দুই উপন্যাসসহ সংখ্যার দিক থেকেও বেশ বিপুল পরিমাণ রচনা তিনি সমাপ্ত করে ফেলেছিলেন মাত্র ৯ বৎসরের কঠিন সাধনায় ও অতিমানুষিক পরিশ্রমে। এই অর্জনের জন্য তাঁকে শারীরিক-মানসিক-পারিবারিকভাবে কী পরিমাণ মূল্য দিতে হয়েছিল, তা বাংলাসাহিত্যের উৎসাহী পাঠকমাত্রেরই জানা। বিশ্বসাহিত্যের প্রেক্ষাপটে যে উপন্যাসগুলি পৃথিবীবাসীর মহত্তম উত্তরাধিকার হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছে, সেগুলির মধ্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ একটি। আর বাঙালির সৃজনশীলতার ইতিহাসে এই উপন্যাস তো একটি চিরস্থায়ী উদাহরণ হিসাবে বেঁচে থাকবে।

০২.
‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ উপন্যাসের তাৎপর্য সম্যক উপলব্ধির সবচেয়ে ভলো পথ হচ্ছে এই উপন্যাসটি পাঠ করা। কখনো একাধিকবার পাঠ করা। তাই কী আছে এই উপন্যাসনামক রচনাটির মধ্যে, তা বলে দেওয়া বা ব্যাখ্যা করা এই রচনার উদ্দেশ্য নয়। শুধু এই উপন্যাসের মহত্ত্ব অনুধাবনের জন্য ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’র অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্য থেকে দুই-একটির উল্লেখ করা যেতে পারে।

যে সময়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ লেখেন, তাঁর বেশ আগে থেকেই মানিকের সমবয়সী লেখকরা তো বটেই, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও গদ্যরচনার ক্ষেত্রে চলিত ভাষার ব্যবহার শুরু করে দিয়েছেন। অথচ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ‘পুতুলনাচের ইতিহাস’ লিখলেন ক্রিয়াপদের সাধুরূপ ব্যবহার করেই। আবার সাধু ক্রিয়াপদ ব্যবহার করেও মানিকের বাক্যবন্ধগুলি অসাধারণ সাবলীলতার সঙ্গে বিচরণ করতে লাগল তৎসমের উদারা থেকে খাঁটি দেশজ রীতির তারসপ্তক পর্যন্ত। মানিক এই উপন্যাসে লেখেন: ‘হারুর মাথার কাঁচা-পাকা চুল আর মুখের বসন্তের দাগ ভরা রুক্ষ চামড়া ঝলসিয়া পুড়িয়া গেল। সে কিন্তু কিছুই টের পাইল না। শতাব্দীর পুরাতন তরুটির মুক অবচেতনার সঙ্গে একান্ন বছরের আত্মমমতায় গড়িয়া তোলা চিন্ময় জগৎটি তাহার চোখের পলকে লুপ্ত হইয়া গিয়াছে।’

এই তিনটি বাক্য থেকেই বাংলাগদ্যের সকল ঘরানার মধ্যে তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণের নজির আমরা পেয়ে যাই। এই অর্জিত স্বাচ্ছ্যন্দই ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’র আধুনিকতার চিহ্ন। গত শতকের তিরিশের দশকের গোড়ায় তৎকালীন বাংলাদেশসহ সমগ্র ভারতবর্ষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে যে দ্রুত পট-পরিবর্তনের পালা চলছিল, এই উপন্যাসটির কোথাও সেই আলোড়নের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি নেই। অথচ সম্পূর্ণ উপন্যাসটিই এই আলোড়নের তথা দ্রুত বিবর্তনের একটি ভাষিক রূপ। আধুনিকতা শুধু উপন্যাসটির বিষয় নয়, উপন্যাসটিই সর্বার্থে  আধুনিক। শুধু এই একটি কারণে হলেও ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ আমাদের সাহিত্যপাঠের তালিকায় অবশ্য-অন্তর্ভুক্তির দাবি রাখে। 

বিষয়টিকে আরেকটু খোলাসা করে বলার চেষ্টা করা যেতে পারে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ যখন সাধুরীতি ছেড়ে চলিত বাংলায় গদ্য লিখতে শুরু করেন, তখন চারদিকে সাড়া পড়ে গিয়েছিল। কেননা তাঁর গদ্যের সাধুরূপ থেকে চলিতভাষিকরূপ এতই ভিন্ন ছিল যে তা কোনো সাধারণ পাঠককেও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হয়নি। ফলে মনে চচ্ছিল নতুন এক রবীন্দ্রনাথ হাজির হয়েছেন ‘সবুজপত্রে’র পাতায়। কিন্তু মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যখন সাধুভাষা ত্যাগ করে চলিত রীতিতে গল্প-উপন্যাস লিখতে শুরু করলেন, তখন পাঠক বুঝতেই পারেনি তাঁর এই রীতিবদল। কারণ মানিক প্রথম থেকেই এমন এক সাধুরীতি ব্যবহার করছিলেন যা আসলে পাঠকের কাছে সাধুরীতি বলে মনেই হচ্ছিল না! দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার যখন ঠাকুরমার ঝুলির গল্পগুলি আমাদের শোনান তখন তা সাধুভাষায় লেখা না চলিতভাষায় লেখা সেটি পাঠকের কাছে কোনো গুরুত্ব বহন করে না। মানিকের বেলাতেও তেমনটিই ঘটেছিল। ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’র ত্রিয়াপদে সাধুরীতির ব্যবহার থাকলেও সর্বনামের ক্ষেত্রে ছিল চলিত রীতি। এমনই চলিত তা, যাকে বলা যেতে পারে চলিত রীতির যথেচ্ছাচার, এমনকি স্বেচ্ছাচার। 

একই উপন্যাসে মানিক লিখে গেছেন- তাহার তার তাহাকে তাকে তাদের তাহাদের- সবকিছুই। আবার ক্রিয়াপদেই সাধু চেহারার যে অন্ত্যজ এবং মাটি-মাখা রূপ তিনি ব্যবহার করেছেন, তা নিয়ে তৎকালীন ভাষা ও সাহিত্যের অভিভাবকবৃন্দ অস্বস্তিতে ভুগেছেন বিস্তর। বাংলা উপন্যাসে ‘বিয়াইয়াছে’ শব্দটি যে লেখা যায় তা ইতোপূর্বে আমাদের পাঠকদের জানা ছিল না। একইভাবে মানিক অবলীলায় লিখে গেছেন- বিয়াইয়া, রাগাইয়া, চেঁচাইয়া, ঝিমাইতেছে, ফুটাইতেছে। অর্থাৎ সাধুরীতিতে লেখা শুরু করেও সেই লেখার মধ্যেই তিনি পাঠককে প্রস্তুত করে নিচ্ছেন চলিত ভাষায় পা রাখার জন্য। তাই ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ সেই বিরল লিখনভঙ্গির উপন্যাস যেখানে সাধুরীতি বা চলিতরীতি নিয়ে পাঠক মাথা ঘামানোর অবকাশই পাননি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আগে এই রচনারীতির কথা কারও মাথাতেই আসেনি। ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’র আগে এই বিপ্লবাত্মক ঘটনা বাংলাভাষার কোনো গ্রন্থে ঘটেনি। বাংলা উপন্যাসের ভাষারীতির ক্ষেত্রে ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ সেই কারণেই একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা, একটি বিপ্লব। 

অনেকগুলো কারণে ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ অবশ্যপাঠ্য। কিন্তু যারা শুধু বাংলা উপন্যাসের ভাষাতে কালান্তর খুঁজতে চান, তাদেরকেও ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’র কাছে ফিরে ফিরে আসতেই হবে। 

/তারা/ 

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়