ঢাকা     মঙ্গলবার   ২৯ নভেম্বর ২০২২ ||  অগ্রহায়ণ ১৫ ১৪২৯ ||  ০৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪১৪

সংকটে আধ্যাত্মিক ইতিহাসের সাক্ষী ‘জালালী কবুতর’

নূর আহমদ, সিলেট || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১০:৫২, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২   আপডেট: ১০:৫৩, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২
সংকটে আধ্যাত্মিক ইতিহাসের সাক্ষী ‘জালালী কবুতর’

জালালী কবুতর

‘ঝাঁকে উড়ে আকাশ জুড়ে, দেখতে কি সুন্দর, জালালের জালালী কইতর’ বাউল আব্দুল হামিদের এই গানে দোলেননি শাহজালালের এমন ভক্তের সংখ্যা খুবই কম। তবে দিন যত যাচ্ছে সেই জালালী কইতর (কবুতর) এর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। দেশিয় কবুতরের যন্ত্রণায় সিলেটের আধ্যাত্মিক ইতিহাসের সাক্ষী জালালী কবুতর মিশ্র জাতে রূপ নিচ্ছে। আর তাই ‘জালালী কইতর’ হিসেবে পরিচিত এই কবুতরকে বাঁচাতে এখনই উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সিলেটের বিশিষ্টজনরা।

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, হযরত শাহজালাল (রহ.) এর সিলেট আগমনের সঙ্গে জালালী কবুতরের ইতিহাস একই সূত্রে গাঁথা। ১৩০১ সালে ইসলাম প্রচারে ইয়েমেন থেকে হজরত শাহজালাল (রহ.) ভারতের দিল্লিতে আসেন। সেখানকার ওলি নিজামউদ্দিন আউলিয়া (রহ.) শাহজালাল (রহ.) আধ্যাত্মিক শক্তিতে মুগ্ধ হয়ে তাকে নীল ও কালো রঙের এক জোড়া কবুতর উপহার দেন। হজরত শাহজালাল (রহ.) ৩৬০ জন আউলিয়া নিয়ে ১৩০৩ সালে তৎকালীন আসামের অন্তর্ভুক্ত সিলেট (শ্রীহট্ট) জয় করে উড়িয়ে দিয়েছিলেন সেই কবুতর জোড়া। শাহজালালের সঙ্গী এই কবুতরের বংশধরেরা ‘জালালী কবুতর’ নামেই পরিচিত। সেই থেকে সিলেটের আধ্যাত্মিক ইতিহাসের সঙ্গে মিশে রয়েছে জালালী কবুতর।

সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় ৭০০ বছর ধরে স্বমহিমায় এ ঘর থেকে ও ঘরে উড়ছে জালালী কবুতর। তবুও কালের বিবর্তনে ঐতিহ্যের প্রতীক এ কবুতর আজ হারাতে বসেছে অস্তিত্ব। হযরত শাহজালাল এবং হযরত শাহ পরানের মাজারসহ হাতেগোনা কয়েকটি জায়গায় তাদের দেখা মিললেও এর সংখ্যা খুব বেশি নয়। বর্তমানে দেখাগেছে দরগাহ বিভিন্ন ভবনে তৈরী করে দেয়া কবুতরের বাসাগুলো দখল করে নিয়েছে দেশি জাতের কবুতর। ফলে আবাসস্থল হারাচ্ছে জালালী কবুতর।

দেশিয় কবুতরের যন্ত্রণায় হারিয়ে যেতে বসেছে ‘জালালী কবুতর’

একসময় ক্বিন ব্রিজ এলাকায় খুব বেশি জালালী কবুতরের বিচরণ ছিলো বলে জানান সিলেটের প্রাচীনতম সাহিত্য পত্রিকা আল ইসলাহ এর বর্তমান সম্পাদক সেলিম আউয়াল। 

সেলিম আউয়াল বলেন, ‘ক্বিন—ব্রিজ এলাকায় একসময় প্রচুর জালালি কবুতর দেখতে পাওয়া যেত। এখন অন্য এলাকা তো দূরের কথা শাহজালাল (রহ.) দরগা এলাকাতেও আগের মতো জালালি কবুতর নেই। আর তাই এই কবুতরকে বাঁচাতে বাজারি কবুতরগুলোকে আলাদা করার ব্যবস্থা করা।’  

অন্য প্রজাতির কবুতর বৃদ্ধির জন্য দরগায় আসা অতিউৎসাহী ভক্তদের দায়ী করেছেন মাজার সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা ও সিলেটের গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব এনামুল হক জুবের। 

তিনি বলেন, ‘জালালী কবুতর সিলেটের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যেরই অংশ। শৈশবের দিনগুলো কেটেছে এই কবুতরের সঙ্গে। মাজারের পাশে বাসা হওয়ায় কেবল মাজারে নয় আশপাশের বাসা বাড়িতে ছিল এর বিচরণ। বর্তমানে দেশি প্রজাতির বেশ কিছু কবুতর ঢুকে গেছে। আর এজন্য মাজারে আসা কিছু ভক্তরা দায়ী। তারা বাজার থেকে কবুতর এনে দরগায় ছেড়ে দেন। এজন্য কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই কঠোর হবার পাশাপাশি অন্য প্রজাতির কবুতর সরিয়ে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। তা না হলে একদিন সিলেটের জালালী কবুতর সাধারণ কবুতরের ভিড়ে হারিয়ে যাবে।’

শাহজালাল (রহ.) জালালী কবুতরের জন্য তৈরিকৃত ঘর এখন দেশি জাতের কবুতরের দখলে

জালালী কবুতর নিয়ে বাংলাদেশে গবেষণা হয়েছে। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক্স অ্যান্ড এনিম্যাল ব্রিডিং বিভাগের শিক্ষক ডা. নয়ন ভৌমিক বাংলাদেশে জালালী কবুতর নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি তার গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেন, জালালী কবুতরের স্ত্রী ও পুরুষ যুগলের মধ্যকার বন্ধন অন্য যে কোনো প্রজাতির কবুতরের চেয়ে অনেক দৃঢ়। শুধু তাই নয় জালালী কবুতর নিজস্ব সঙ্গী ছাড়া অন্য কোনো কবুতরের সঙ্গে মিলিত হয় না। জালালী কবুতর স্বতন্ত্র প্রজাতির না হলেও এর আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। দেশে একই রঙের যে বুনো কবুতর দেখা যায়, জালালী কবুতর তার চেয়ে সামান্য ছোট। রঙের পার্থক্যের মধ্যে জালালী কবুতরের রঙ সুরমার মতো, ঠিক আকাশী নীল নয়। তবে অন্যদের চেয়ে আরেকটি বিষয় তাদের আলাদা করেছে, তা হচ্ছে বসবাসের ঠিকানা। উড়ে যত দূরেই যাক না কেন, ফেরার ঠিকানা একটিই। মাজারেই ফিরে আসে এ জালালী কবুতর।

শাহজালাল (রহ.) দরগা মাজারের মোতাওয়াল্লি ফতেহ উল্লাহ আল আমান এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘কিছু ভক্ত বাজার থেকে কবুতর এনে লুকিয়ে ছেড়ে দেন। আবার কিছু অন্য প্রজাতির কবুতর জালালি কবুতরের সাথে চলে আসে। আমরা অবশ্য মাঝে মধ্যে অন্য প্রজাতির কবুতর সরিয়ে ফেলি। জালালি কবুতরের প্রজনন বাড়ানোরও ব্যবস্থা করছি।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ভক্ত আশেকানদের মাজারে কবুতর নিয়ে না আসার আহবান জানাই। জালালী কবুতরকে রক্ষা করতে হলে আমাদের সবাইকে সচেতন ভূমিকা রাখতে হবে।’

মাসুদ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়