রাতে পাম্পে লাইনে থাকা মোটরসাইকেল পাহারা দিতে ৫০ টাকা
মাসুম লুমেন, গাইবান্ধা || রাইজিংবিডি.কম
জ্বালানি তেল সংকটের এই সময়ে গাইবান্ধায় তেল পেতে অভিনব পদ্ধতি দেখা গেছে। তেল নিতে আসা মোটরসাইকেলগুলো লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে, সেই লাইন অনুসারে তেল দেওয়া হয়। তেল নিতে আসা মোটরসাইকেলগুলোকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি দিন-রাত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।
সম্প্রতি লাইনে প্রথম দিকে এমন কিছু মোটরসাইকেল দেখা গেছে, যেগুলো সাধারণত গ্যারেজে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। এমন ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা হচ্ছে।
শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) রাত ১০টার দিকে এমন এক চিত্র দেখা গেছে, গাইবান্ধা- দারিয়াপুর সড়কের গাইবান্ধা ফিলিং স্টেশনে। সেখানে চালকদের কাঁথা হাতে রাতভর সড়কে থাকতে দেখা গেছে। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, লাইনের প্রথমে রয়েছে কিছু অকেজো মোটরসাইকেল। নম্বরবিহীন লক্কর-ঝক্কর। কিছু মোটরসাইকেলের হেড লাইট নেই। এগুলো গ্যারেজের পরিত্যক্ত মোটরসাইকেল।
এদিকে রাতে লাইনে থাকা মোটরসাইকেল পাহারা দেওয়ার জন্য নতুন সিস্টেম তৈরি হয়েছে। সংখ্যায় আনুমানিক প্রায় ৫০০টি মোটরসাইকেল সারা রাত ধরে পাহারা দেবে এমন দায়িত্ব নিয়ে তোলা হচ্ছে জনপ্রতি ৫০ টাকা। এর বিপরীতে মোটরসাইকেলের মালিকদের দেওয়া হচ্ছে একটি করে টোকেন।
টাকা আদায়কারীর ভাষ্য, সারা রাত পাহারা দেওয়া হবে। এ কারণে টাকা নেওয়া হচ্ছে।
তেল নিতে এসেছেন মোটরসাইকেল চালক আব্বাস উদ্দিন। তিনি মার্কেটিংয়ে কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘‘তেল নিতে এসে লাইনে সারা রাত থাকতে হয়। আমরা লাইনে দাঁড়ানোর জন্য এসে দেখি শত শত মোটরসাইকেল আগে থেকে দাঁড়ানো। যে পাম্পেই যাই, সেখানেই বেশ কিছু পরিচিত মোটরসাইকেল দেখতে পাই। যেগুলো একেবারে অচল এবং চলার অনুপযোগী। সেগুলো লাইনের সামনের দিকে দেখা যায়। এই মোটরসাইকেলগুলো পেট্রোল ভরে বাইরে নিয়ে বেশি দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে আনা হয়েছে।’’
দেশের সংকটময় মুহূর্তে এমন নোংরা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।
সদর উপজেলার খোলাহাটি ইউনিয়নের বাসিন্দা মিথুন রহমান। তিনি একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরি করেন। তিনি বলেন, ‘‘পাম্প কর্তৃপক্ষ এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) সকাল থেকে বাঁশ দিয়ে পাম্পের চারপাশে বেঁধে রেখেছে। কোনো গাড়ি ভিতরে ঢুকতে দেয়নি। অথচ দুপুরে গিয়ে দেখি ভিতরে গাড়ি।
আসলে পাম্প কর্তৃপক্ষ তাদের নিজেদের লোকদের এ সব অকেজো গাড়িতে তেল ভরিয়ে বাহিরে বোতলজাত করে বেশি দামে বিক্রি করে।’’
মোটরসাইকেল চালক সৈয়দ জাভেদ বলেন, ‘‘গ্যারেজের অকেজো বাইকগুলো ট্যাংকি লাগিয়ে সিরিয়াল নেয়। তেল নেওয়া হলে এ সব বাইক স্টার্ট না দিয়ে ঠেলে নিয়ে যায়। পরে এ সব পেট্রোল প্রতি লিটার ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় গোপনে বিক্রি করে। তেল সংকট ঘিরে এই চক্র তৈরি হয়েছে।’’
আরেক বাইকচালক মেজবাউল হক মিঠু জানান ভিন্ন তথ্য। তিনি জানান, কিছু মোটরসাইকেল আছে, যেদিন যেখানে তেল দেয়, সেই পাম্পে হাজির হয়। আসার আগে তেলের ট্যাংক খালি করে আনে। এখানে কিছু গ্যারেজ ব্যবসায়ী এবং পাম্প মালিক পক্ষের গোপন আঁতাত রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, যার ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে, গাড়ির কাগজ আছে, আইডি কার্ড আছে, শুধু তাকে তেল দেওয়া উচিৎ। না হলে এই সংকট মুহূর্তে কালোবাজারিদের দৌরাত্ম্য কমবে না। প্রশাসনেরও সঠিক তদারকি প্রয়োজন।
ভাঙাচোরা এসব মোটরসাইকেলের বিষয়ে জানতে চাইলে গাইবান্ধা ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী নয়ন মিয়া বলেন, ‘‘এ সব গাড়ি কারা রেখে গেছে জানি না। এ সব গাড়িতে যাতে পেট্রোল বা অকটেন না দেওয়া হয়, ট্যাগ অফিসারকে জানানো হবে।’’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লোকমান হোসেন বলেন, বিষয়টি জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে এসব অবৈধ গাড়ির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঢাকা/মাসুম/বকুল
জিলকদ মাস শুরু সোমবার