ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ৯ ১৪২৭ ||  ০৬ সফর ১৪৪২

নীলগিরি ও নীলাচলের বাঁকে বাঁকে

তরিকুল ইসলাম মাসুম || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:২৬, ৪ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১০:৩৯, ২৫ আগস্ট ২০২০
নীলগিরি ও নীলাচলের বাঁকে বাঁকে

আমাদের বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্যুরের জন্য চট্টগ্রামে পাঁচদিন অবস্থান করার পর আমরা রওয়ানা দিলাম বান্দরবানের উদ্দ্যেশে৷ চট্টগ্রামের রাঙ্গাদিয়া থেকে আমাদের গাড়ি চললো প্রায় এক ঘণ্টা৷ পটিয়া এবং চন্দনাঈশ উপজেলা পেরিয়ে একটু বিরতির পর আবার চলতে লাগলো৷

চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার মহাসড়কের সাতকানিয়া উপজেলাধীন ধর্মপুর রোড থেকে বান্দরবান রাস্তার দুপাশে একটু পর দেখা গেলো পাহাড় আর বনজঙ্গল৷ মাঝে একটি সেনানিবাস পড়ল, সাথে বাহারী স্কুল-কলেজ৷ 

আগের রাতে আমাদের সবার প্রিয় প্রফেসর ড. মামুন আল রশীদ স্যার আমাদের সাথে যুক্ত হয়েছেন ৷ তিনি ঢাকা থেকে বিমানে চট্টগ্রাম এসে ট্যুরের হাল ধরেছেন, ফলে আমরা বেশ উৎসাহ পেলাম৷

তিন পার্বত্য জেলার অন্যতম বান্দরবান৷ এখানে রয়েছে বেড়ানোর মতো সুন্দর সব জায়গা৷ বান্দরবান শহরের এক পাশেই আছে বোমাং রাজার বাড়ি৷ বোমাং রাজার উত্তরসূরীরা এখন বসবাস করেন এ বাড়িতে৷ আর বান্দরবান শহরের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে সাঙ্গু নদী৷ সাঙ্গু নদীর তীরে ছোটখাটো একটা ঝকঝকে শহর, পথে হাটলে মনে হবে এ পথ যেন শেষ না হয়৷

দিনের দার্জিলিং খ্যাত নীলগিরিতে এক দুপুর 
আমরা একটু সকালেই হোটেল প্যারাডাইস থেকে নাস্তা করে চারটি চান্দের গাড়ি ভাড়া করে রওয়ানা দিলাম নীলগিরি পথে৷ বান্দরবান শহর থেকে প্রায় ৫২ কিলোমিটার দূরে অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র নীলগিরি৷ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে দুই হাজার দুইশত ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এ পর্যটন কেন্দ্র থেকে চারপাশের দৃশ্য দেখতে ছবির মতো৷

আঁকাবাঁকা পথ আর উচু নিচু পাহাড়ের সর্পিল রূপ এক ভিন্ন মাত্রা এনে দেবে, অনেকেই গাড়িতে বসে স্থির থাকতে পারবে না৷ হার্ট দুর্বল হলে অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা আছে৷ অবশ্য এই পথেই প্রতিদিন রুমা এবং থানচি উপজেলার আদিবাসীরা যাতায়াত করেন প্রতিদিন৷ যাওয়ার সময় প্যান্টের পকেট থেকে কিছু টাকা গাড়িতে উঠার সিড়িতে পড়ে গিয়েছিল৷ এর মধ্যে একশত টাকার একটি নোট উড়ে যায়, বাকিটা হাত দিয়ে ধরে ফেলেছিলাম৷ অবশ্য অনেকের ক্যাপ, চশমা এসবও পরেছে বিভিন্ন সময়ে পাহাড়ি ঐ আঁকাবাঁকা রাস্তায়৷

রুমা এবং থানচির সংযোগ সড়কের পাশেই আর্মি ক্যাম্প৷ এখানে সবাইকে আইডি কার্ড বা জাতীয় পরিচয়পত্রসহ গাড়ির নম্বর ড্রাইভারের যাবতীয় তথ্য জমা দিতে হয়৷ জমা নেওয়ার আসল কারণ পর্যটকদের নিরাপত্তা৷ একটি নির্ধারিত সময় পর কোনো গাড়ি ফিরে না আসলে আর্মিরা ধরে নেয় হয়তো কোনো বিপদ ঘটেছে, তাই তারা উদ্ধার অভিযানে নেমে পড়েন৷ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কীভাবে জনসেবায় নিয়োজিত তা এখান থেকে কিছুটা অনুমান করা যায়৷

পথে আমরা দুই কাধি কলা কিনে নিয়েছিলাম৷ নীলগিরি পৌঁছাবার পর কলা বণ্টনের দায়িত্ব আমাকেই দেওয়া হয়েছিল৷ পাহাড়ে ভ্রমণ করতে গেলে ক্লান্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক৷ আর সেই ক্লান্তি দূর করতে চাইলে কলা খাওয়ার কোনো বিকল্প নাই৷ 
সবাই পৌঁছানোর টিকিট কাটা হলো, এখানকার যাবতীয় কর্মকাণ্ড সেনাবাহিনীর নিজস্ব তত্ত্বাবধায়নে করা হয়ে থাকে৷ নীলগিরিতে রয়েছে হোটেল, রেস্ট হাউজ, হেডিপ্যাড আর চারিদিকে মেঘের খেলা৷ আমরা বিস্তীর্ণ এলাকা ঘুরলাম আর স্যারদের সাথে ছবি তুললাম৷ এখানে রাত্রিযাপনের কোনো সুযোগ নাই, তাই চান্দের গাড়ির সময় দেওয়া থাকে৷ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফিরতে হয়, অন্যথায় জরিমানা গুণতে হয়৷ 

রাতের দার্জিলিং খ্যাত নীলাচলে এক সন্ধ্যা
শহরের কাছে সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ের নাম নীলাচল৷ শহর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে টাইগার পাড়ায় এ পাহাড়টির উচ্চতা প্রায় এক হাজার ফুট৷ এখানে দাঁড়িয়ে বান্দরবান শহরসহ দূর-দূরান্তের অনেক জায়গার সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়৷

আমরা বিকেলে স্বর্ণ মন্দির থেকে ফিরে চান্দের গাড়িতে করে রওয়ানা দিলাম নীলাচলের উদ্দ্যেশ্যে৷ আসার পথে শহর হয়েই আবার বান্দরবান-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দিকে ফিরতে মেঘলা পর্যটন কেন্দ্রের সন্নিকটে একটি রাস্তা পূর্ব দিকে পাহাড়ের উপরে চলে গেছে৷ এই পথেই দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে ভেতরের দিকে প্রায় চার কিলোমিটার যেতে হয়৷ আমরা পৌঁছালাম প্রায় সাঝের বেলায়৷ সূর্য পশ্চিম আকাশে তখন লাল আভা দিয়ে দিগন্তে স্তমিত হতে চলেছে৷  

নীলাচলের স্থানটি মনে হবে প্রাকৃতিক একটা শহর৷ এখান থেকে চারদিকে অবলোকন করলে দেখা মিলবে উঁচুনিচু অগণিত পাহাড়ের চূড়া, নীলগিরি যাওয়ার আঁকাবাঁকা পথটিও চোখে ধরা দিবে যদি ভালো করে পরখ করা হয়৷ আমরা সাঝের সময় পূর্বদিকের একটু নিচু প্রাঙ্গণটিতে অবস্থান করলাম, মূল স্পট থেকে নিচে নেমে যেতেও বেশ খানিক সময় লেগে যায়৷ সেখানে একটা ঘরের মতো আছে, আমরা সবাই বিশ্রাম নিচ্ছিলাম আর চারদিকের পরিবেশ দেখে বিস্মিৎ হতে লাগলাম৷ আমাদের সাথে প্রফেসর ড. শামসুল আলম স্যার, ড. অশোক কুমার চক্রবর্তী স্যার এবং ড. মামুন আল রশীদ স্যার ছিলেন৷ বেশ কিছু ছবি উঠালাম, একক এবং গ্রুপ ছবি৷ সাথে কিছু কিছু দৃশ্য ভিডিও ধারণ করছিলাম৷ একটু আঁধার ঘনিয়ে আসলে আমরা উত্তর দিকে দেখলাম যেন বহুদূরে নিচে জোনাকির মেলা৷ আসলে ঐ দূরে বান্দরবান শহর, যেটা এই পাহাড় থেকে প্রায় হাজার ফুট নিচে৷ 

রাত প্রায় ৮টার দিকে আমরা ফেরার জন্য আলোচনা করছিলাম, ঐ নিচু টিলা থেকে নীলাচল পয়েন্টে উঠতে বেশ হাফিয়ে উঠছিলাম সবাই৷ এরপর চান্দের গাড়িতে ওঠে গাড়ি ছাড়ার সময় আমাদের চাপাইয়ের (চাপাইনবাবগন্ঞ্জ) এক বন্ধু আহাদ আলী আরেক চাপাই শাহরিয়ারকে খুঁজতে বললো, এই চাপাই এসেছে? আমি বললাম তোমার ডান পাশে দ্বিতীয়জনকে? দু’জন এক গাড়িতেই উঠেছে, কিন্তু একই সারিতে হওয়ায় খেয়াল করেনি...৷

প্রায় আধঘণ্টা পর চান্দের গাড়ি আমাদের বান্দরবান শহরে এনে পৌঁছে দিলো৷ আমরা ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবার খেয়ে একটি সাংস্কৃতিক ও কুইজ প্রতিযোগিতায় অংশ নিলাম শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের সমন্বয়ে৷ পরের দিন সকালের নাস্তা শেষ করে হোটেলের সমস্ত বিল পরিশোধ করে আমরা রওয়ানা দিলাম কক্সবাজারের উদ্দ্যেশ্যে৷


লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়৷

ইবি/মাহি 

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়