RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ২৯ অক্টোবর ২০২০ ||  কার্তিক ১৪ ১৪২৭ ||  ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

‘বিশ্ববিদ্যালয় হোক বিশ্বের বিদ্যালয়’

তানভির আহমেদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:৫২, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৫:৩৬, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০
‘বিশ্ববিদ্যালয় হোক বিশ্বের বিদ্যালয়’

নীরবেই জন্মদিন পার করলো উত্তরবঙ্গের একমাত্র কৃষি সম্পর্কিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মাদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (হাবিপ্রবি)। গত ১১ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়টি ২১ বছরে পা দিয়েছে।

প্রথমে ১৯৭৬ সালে ‘এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন ট্রেনিং ইনস্টিটিউট’ নামে প্রতিষ্ঠিত হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি। এরপর কৃষি কলেজে উন্নীত হয়ে ১৯৯৯ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ঘোষিত হয় পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় রূপে। 

বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে প্রাক্তন ও বর্তমান কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য ও অগ্রগতি এবং তাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. তানভির আহমেদ।

শত সহস্র বছর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাক প্রিয় ক্যাম্পাস

মুহিউদ্দিন নুর, মাৎস বিজ্ঞান অনুষদের ১২ ব্যাচের শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (হাবিপ্রবি) আমার কাছে একটি অনুভূতির নাম। সেই ২০১১ সালের শেষের দিকে ভর্তি পরীক্ষা দিতে এসেই পুষ্পশোভিত এই ক্যাম্পাসের প্রেমে পড়ে যাই। চারদিকে সবুজের হাতছানিতে ঘেরা সাজানো গুছানো একটি ক্যাম্পাস। লাল ইটের সারি সারি ভবন, দৃষ্টিনন্দন গেট, টিএসসি, ফোয়ারা, উটপাখিসহ বিভিন্ন প্রাণীর গবেষণা ফার্ম, হোয়াইট হাউজ খ্যাত উপাচার্য মহোদয়ের বাসভবন, শত শত প্রজাতির ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ যে কারো নজর কাড়তে বাধ্য।  

ছাত্রজীবনে পড়াশুনার পাশাপাশি সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত থাকায় ক্যাম্পাসের প্রতি ইঞ্চি জায়গা নিয়মিত চষে বেড়াতাম, তাই এর প্রতি ভালোবাসাও ছিল অগাধ। ভালো লাগার, ভালোবাসার প্রিয় হাবিপ্রবির ক্যাম্পাস শত সহস্র বছর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাক, ২১তম জন্মদিনে এটাই কামনা।

ছাত্রসংসদ ও অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন অতিদ্রুত প্রয়োজন

রিয়াদ খান, এম এস ইন কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, উত্তরবঙ্গের কৃতি সন্তান, তেভাগা আন্দোলনের নেতা মরহুম হাজী মোহাম্মদ দানেশ-এর নামে ১৯৯৯ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ততকালীন ও বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। সেই সময় থেকে অনেক ক্ষেত্রেই এই বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে গেছে, তবে বলতে কষ্ট নেই গবেষণা ক্ষেত্রে কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে। শিক্ষক সংকটসহ বিভিন্ন প্রতিকূলতায় একাডেমিক দিকেও অনেক সময় কিছুটা বাঁধাগ্রস্ত হয়েছে। তবে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে গুণী শিক্ষক ও মেধাবী শিক্ষার্থীও রয়েছেন, এজন্যই বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে, একাডেমিক উন্নয়ন হয়েছে এবং আমি বিশ্বাস করি অতি দ্রুত এই বিশ্ববিদ্যালয় একটি একাডেমি ও গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হবে। 

শিক্ষায়, গবেষণায়, জনকল্যাণে সেরা হোক প্রাণের হাবিপ্রবি

পল্লব হোসেন রাঙ্গা, এম বি এ ইন ফিনান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনা ছোট হলেও বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিদেশি শিক্ষার্থী নিয়ে সগৌরবে এগিয়ে যাচ্ছে উত্তরবঙ্গের সর্বোচ্চ এ বিদ্যাপীঠ। 

প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর নানাবিধ সমস্যায় (ক্লাস রুম সংকট, আবাসন সমস্যা,  ল্যাব সমস্যা) জর্জরিত এ বিদ্যাপীঠ, ধীরে ধীরে অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে।  তারপরও কিছু সমস্যা এখনও বিদ্যমান।  আশাকরি অতিদ্রুত এসব সমস্যা লাঘব হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা, গবেষণা এগিয়ে রাখার পাশাপাশি বর্তমানে মাননীয় ভাইস চ্যান্সেলর স্যার প্রফেসর ড. মুহম্মদ আবুল কাসেম স্যারের একান্ত আন্তরিক প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম ক্যারিয়ার কাউন্সিলিং অ্যান্ড এন্টারপ্রেনারশিপ ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, যা শিক্ষার্থীদের বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলারশিপ ও ক্যারিযার বিষয়ক বিভিন্ন তথ্য প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। 

এছাড়াও কৃষক সেবাকেন্দ্র ও ভ্রাম্যমাণ ভেটেরিনারি ক্লিনিক দিনাজপুরসহ আশেপাশের এলাকার কৃষকদের বিভিন্ন সেবা দিয়ে একটি জনকল্যাণমুখী বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে। হাবিপ্রবির ২১তম জন্মবার্ষিকীতে সবার প্রত্যাশা আমাদের, এ প্রাণের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষায়, গবেষণায়, মননে, সংস্কৃতিতে, জনকল্যাণে বাংলাদেশের একটি অন্যতম সেরা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হবে।

সাংস্কৃতিক চর্চা বৃদ্ধিতে মনোযোগী হওয়া দরকার 

সোয়াদুজ্জামান সোয়াদ, অ্যাগ্রিকালচারাল ইঞ্জিনিয়ারং বিভাগের শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় শিল্প সাহিত্য চর্চার তীর্থ ভূমি হলেও আমার মতে সাংস্কৃতিক চর্চায় হাবিপ্রবি একটু পিছিয়ে। প্রথমত, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় নাট্যকলা, সঙ্গীত, বাংলা বিভাগ ও লোকসাহিত্য সম্পৃক্ত তেমন কোনো বিষয় (ইংরেজী ও সমাজ বিজ্ঞান ব্যতীত) না থাকায় এর পেছনে অন্যতম কারণ। দ্বিতীয়ত, সাংস্কৃতিক চর্চার উপকরণ (মুক্তমঞ্চ, নির্ধারিত ভবন/কক্ষ) নেই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাংস্কৃতিক চর্চা বৃদ্ধিতে মনোযোগী হওয়া দরকার।

শিক্ষার্থীদের মাদক ও সন্ত্রাস থেকে দূরে রাখতে সুস্থ সামাজিক বিনোদনের ব্যবস্থা আমাদেরই করতে হবে। অদূর ভবিষ্যতে ১৩০ একরের ভালোবাসার প্রিয় ক্যাম্পাস সুপরিকল্পিতভাবে আরও নান্দনিক ও পরিচ্ছন্ন ক্যাম্পাসে পরিণত হবে, এটাই প্রত্যাশা।

স্নাতক-স্নাতকোত্তর শেষে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা 

নায়লা আফরিন, মাৎস বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থী।  তিনি বলেন, আয়তনে খুব একটা বড় না হলেও শিক্ষার্থীদের স্বপ্নগুলো ঠিকই আকাশ ছোঁয়া। খেলার মাঠ থেকে গবেষণার ল্যাব, দেশ ছাপিয়ে বিশ্বের মাটিতে প্রতিনিয়ত সফলতার স্বাক্ষর রাখছেন এ ক্যাম্পাসের সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীরা। বর্তমানে গবেষণার দিক দিয়ে অনেক এগিয়েছে হাবিপ্রবি, বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো তারই সাক্ষ্য দেয়।

প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন নামকরা প্রতিষ্ঠানে কর্মের জন্য ছড়িয়ে পরছেন এবং সুনাম বয়ে আনছেন। তবে, প্রতিবছর যে হারে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে, সেই অনুপাতে আধুনিক প্রযুক্তি সম্বলিত গবেষণাগার, গ্রন্থাগার, ক্লাস রুম ও আবাসন সুযোগ-সুবিধা বাড়ছে না। এটি পরবর্তী সময়ে মানসম্মত গ্র্যাজুয়েট তৈরিতে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। সব সংকট কাটিয়ে শীক্ষার্থী বান্ধব প্রতিষ্ঠানটি এগিয়ে চলুক, এটাই প্রত্যাশা।  

বিশ্ববিদ্যালয় পরিপূর্ণরূপে বিশ্বের বিদ্যালয় হয়ে উঠুক  

হোসনে আরা দোলন, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে কখন আমরা বিশ্ববিদ্যালয় বলি? যখন এটি চিন্তা-চেতনা-মমনে ও বাস্তবে বিশ্ব মাপের হয়। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিৎ সর্বদা বৈশ্বিক। আধুনিক বিশ্বে কী চলছে? কিসের চাহিদা রয়েছে, তা আমাদের বুঝতে হবে।  সেই অনুপাতে কাজ করতে হবে। সেইসাথে বিশ্ববিদ্যালয় হলো মুক্তজ্ঞান চর্চার উর্বর ভূমি। একজন শিক্ষার্থীর মনোজগত, দক্ষতা, সম্ভবনাগুলোকে প্রস্ফুটিত করার সুযোগ, একটি মনোরম ও উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি কর্তৃপক্ষকেই করতে হবে। 

বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে এসে একটা কথাই শুধু বলতে চাই, প্রিয় হাবিপ্রবি অবস্থানগত ও নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও অনেক এগিয়ে গেছে এবং যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এ স্বপ্নভূমি বিশ্ববিদ্যালয় দিন দিন হয়ে উঠুক পরিপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়রূপে, এটাই প্রত্যাশা সবার।

হাবিপ্রবি/মাহি

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়