ঢাকা     রোববার   ২৯ মে ২০২২ ||  জ্যৈষ্ঠ ১৫ ১৪২৯ ||  ২৭ শাওয়াল ১৪৪৩

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ, বাড়ছে হতাশা

হাবিবুর রহমান, রবিবা || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:১০, ২৭ জানুয়ারি ২০২২   আপডেট: ১৪:১২, ২৭ জানুয়ারি ২০২২
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ, বাড়ছে হতাশা

‌‌‘‘যে শিক্ষার্থীর আজ বাবা-মায়ের দায়িত্ব নেওয়ার কথা, অথচ সে বাবা-মায়ের মাথায় বোঝা হয়ে আছে। এই হতাশার কারণে গত ৩ বছরে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। আপনারা দেশের ভবিষ্যত বাঁচানোর জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছেন, অথচ এভাবে প্রতিনিয়ত মারা যাচ্ছেন হাজার হাজার সম্পদ।’’ এমন মন্তব্য করেছেন শাহজাদপুরে অবস্থিত রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশের (রবিবা) শিক্ষার্থীরা।  

করোনা প্রতিরোধে গত ২১ জানুয়ারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে সশরীরে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রাখার যৌক্তিকতা কতটুকু সে প্রসঙ্গে মতামত দিয়েছেন রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্র অধ্যয়ন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আফসানা মিমি আইভি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৯ শতাংশ শিক্ষার্থী ভ্যাকসিন নিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতনতা অন্যদের থেকে তুলনামূলক বেশি। তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন ক্লাস কার্যক্রম বন্ধ? বাণিজ্যমেলায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ একত্রিত হচ্ছেন, অফিস-আদালত খোলা। একই বর্ষে পরপর তিন বছর থাকার পরও বর্ষ পরিবর্তন হচ্ছে না। যা হতাশা বাড়িয়ে দিয়েছে শিক্ষার্থীর মধ্যে। 

যে শিক্ষার্থীর আজ বাবা-মায়ের দায়িত্ব নেওয়ার কথা, অথচ সে বাবা-মায়ের মাথায় বোঝা হয়ে আছে। এই হতাশার কারণে গত তিন বছরে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। আপনারা দেশের ভবিষ্যত বাঁচানোর জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছেন, অথচ এভাবে প্রতিনিয়ত মারা যাচ্ছেন হাজার হাজার সম্পদ। তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম খোলা রাখুন। শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ তৈরি করুন। চলমান হতাশা থেকে শিক্ষার্থীদের বের করে নিয়ে আসুন।

অর্থনীতি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শ্রাবণী সরকার বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করা আমার কাছে যুক্তিসম্মত মনে হয় না। যেখানে সব কিছু খোলা, বিভিন্ন মেলা পর্যন্ত হচ্ছে। শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রেখে আমাদের ক্ষতিটাই বেশি হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের উপর একটা নেগেটিভ প্রভাব পড়ছে। আমরা পড়াশোনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছি। তাছাড়া ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশাও কাজ করছে। আমার মনে হয় অন্তত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খোলা রাখা উচিৎ।

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বাংলাদেশ অধ্যয়ন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো. শামীম হোসেন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় আমরা অনেটাই দুঃচিন্তায় আছি। এটা আমাদের ভবিষ্যতের উপর প্রভাব ফেলবে। মাত্র দুইটা পরীক্ষা ছিল। ছুটি যদি দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয়, তবে পরবর্তী শ্রেণিতে উঠতে বেশ সময় লেগে যাবে, যা আমাদের জন্য কষ্টকর।

অর্থনীতি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রাইসা সানজিদা বলেন, করোনা মহামারি প্রায় ২ বছর ধরে চলমান রয়েছে। প্রথম দিকে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখার অনেক যৌক্তিক কারণ থাকলেও বর্তমানে বন্ধ রাখার কোনো কারণ আমি খুঁজে পাই না। তাছাড়া বছরের পর বছর বন্ধ কাটিয়ে যে আমাদের উন্নতি হচ্ছে, তা কিন্তু নয় বরং মানসিকভাবে অধিকাংশ শিক্ষার্থী ভেঙে পড়েছে। আমরা না পারছি পরবর্তী পড়াশোনা চালিয়ে যেতে, না পারছি চলমান পরীক্ষাগুলো শেষ করতে। এই রকম একটা পরিস্থিতি একজন শিক্ষার্থীর জন্য কতটা নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, সেটা বলাই বাহুল্য। 

আমার আশেপাশের কিছু সহপাঠী ইতোমধ্যে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। চলমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে হয়তো আমরা অনেক সহপাঠী হারাবো। যেহেতু প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের শিক্ষার্থীদের টিকা নিশ্চিত করেছে এবং শিক্ষার্থীরা সচেতনতা অবলম্বন করে ক্লাসে ফিরতে চান, তাই বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখাটা অযৌক্তিক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী মনিরুল ইসলাম বলেন, ভর্তির দু'বছর পার হয়েছে অথচ ক্লাস করেছি মাত্র দেড় মাস। একই বর্ষে দুটি বছর কেটেছে। আরেকটা বছর কাটার সম্ভবনা দেখছি। আর কত বছর কাটলে এই সংকট কাটবে? ভবিষ্যত আমাকে প্রতিনিয়ত ভাবায়। পিতা-মাতা চেয়ে আছে আমার মুখের দিকে। এত হতাশা নিয়ে বেঁচে থাকা বড় দায়। অন্তত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুলে আমাদের জীবন বাঁচানোর দাবি জানাচ্ছি।

অর্থনীতি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আম্মায় আছিফুন মিম বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণ বিস্তার রোধে বারবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের মাঝে অনিশ্চিয়তার সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দিলে শিক্ষার্থীরা একটু আলোর দিশা দেখতে পায়। কিন্তু পরক্ষণেই বন্ধের ঘোষণা শিক্ষার্থীদের আবারও হতাশার মধ্যে ফেলেছে। চলমান পরীক্ষা শেষ না হওয়াতে নানা হতাশা এবং চাপের মধ্যে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা। 

একই ক্লাসে পরপর দু-তিন বছর কাটানোয় বিভিন্ন মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। এছাড়া ক্লাস, পরীক্ষা বারবার বন্ধ হওয়ায় আমরা শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং যেখানে সব শিক্ষার্থী টীকার আওতায় আনা হয়েছে, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের মতো সিদ্ধান্তকে নেতিবাচকই দেখছি। আমরা শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা শেষ করে আমাদের ক্লাসরুমে ফিরে নতুন একটা শিক্ষাবর্ষ শুরু করতে চাই।

/মাহি/

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়