ঢাকা     মঙ্গলবার   ২৮ মে ২০২৪ ||  জ্যৈষ্ঠ ১৪ ১৪৩১

আব্বুকে হারানো ঈদ

সুমাইয়া বিনতে নুর || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:৪৫, ৭ এপ্রিল ২০২৪   আপডেট: ১৭:৪২, ৮ এপ্রিল ২০২৪
আব্বুকে হারানো ঈদ

সেদিন ভোরে দেবদারু গাছটার ডালের ফাঁকে আকাশের শুকতারাটা মিটিমিটি জ্বলছিল। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই পাখির কিচিরমিচির শব্দের সাথে পাড়ার সহপাঠীসহ আরও ছেলে মেয়ের হৈ-হুল্লোড় শুরু হলো। তাদের আনন্দই জানান দিচ্ছে, আজ ঈদ।

সময়টা ২০০৯ সালের দিকে। হঠাৎ ভোরে ঘুম ভেঙে গেলো। উঠে দেখলাম আব্বু-চাচ্চুরা নামাজে গেছেন, আম্মু-চাচিরাও নামাজ পড়ে রান্নার উৎসবে মেতেছেন। আমি সিঁড়ি বেয়ে ছাদের দিকে পা বাড়ালাম।

আমিও তড়িঘড়ি করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে তাদের সাথে আনন্দে মেতে উঠলাম। সকাল ৭টার পর বাসায় এসে গোসল করে ঈদ উপলক্ষে আব্বুর দেওয়া নতুন জামাটা পরে নিলাম। আব্বু-চাচ্চুরাও নতুন পাঞ্জাবি পড়ে সেমাই খাচ্ছে আর ঘুরাঘুরিসহ বিভিন্ন গল্প করছে। দেরি হওয়ায় আব্বু আমাকে কোলে নিয়ে খাইয়ে দিলেন আর বললেন বিকালে নানা বাড়িতে যাবে। আমি তো খুশিতে আত্মহারা। ঈদে খালা, খালাতো ভাইয়েরাও নানা বাড়ি যাবে। সবাই মিলে খেলবো অনেক মজা করবো। সবাই সালামি দিলো। সেবার অনেকগুলো টাকা সালামি পেয়েছিলাম। তারপর সবাই মিলে ময়দানের দিকে হাঁটা শুরু করলাম।

সব ছেলে-মেয়েরাই নতুন জামা পড়েছে। এটা সেটা নিচ্ছে খাচ্ছে। আব্বু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ময়দানের দোকানগুলো দেখালেন সাথে অনেক খেলনাও কিনে দিলেন। আব্বু আমাকে এক কোণে বসিয়ে রেখে নামাজে গেলেন। নামাজ শেষে অনেক খাবার কিনে দিলেন। বাসায় ফিরে আমি পাড়ার সহপাঠীদের সাথে খেলতে শুরু করলাম, ঈদের আনন্দে এলাকা যেন আজ ভরপুর।

হঠাৎ বাসা থেকে কারো কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলাম। দৌড়ে গিয়ে দেখি আম্মু কান্না করছেন। একটা অ্যাম্বুলেন্স আসলো। আব্বুকে ধরে চাচ্চুরা গাড়িতে উঠালেন। আব্বু স্ট্রক করেছেন। বাড়ির আনন্দময় পরিবেশ হঠাৎই থমথমে হয়ে গেল। আব্বুকে হাসপাতাল ভর্তি করা হলো, চাচ্চু ও ফুপিরা সাথে গেছেন। আমার ভাই ছোট হওয়ায় আমার আম্মু যেতে পারেননি। আম্মু কান্না করছেন বাসায় সবাই আম্মুকে বৃথা সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো, আব্বুর অবস্থা ক্রমেই খারাপ হতে লাগলো। আছরের সময় খবর এলো, আব্বু আর বেঁচে নেই। আমাদের সবাইকে ছেড়ে ইহলোকের মায়া ত্যাগ করে পরকালে চলে গেছেন।

আম্মু কান্না করছেন, থেকে থেকে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছেন। বাড়িতে সবাই কাঁদছেন,আমিও কাঁদছিলাম। মৃত্যু মানে তখনও ঠিক বুঝতাম না। তবে এটুকু বুঝতাম, মারা গেলে আর কেউ ফিরে না। যুগ যুগ চলে যাবে, তাকে আর দেখতে পাবো না।
ঘণ্টাখানেক পর আব্বুর লাশ নিয়ে আসা হলো। এশার নামাজের পর দাফন করা হবে। সব আত্মীয়দের খবর দেওয়া হলো। এশার নামাজের পর শেষবারের মতো আব্বুর মুখখানি দেখানো হলো, চারজন আব্বুকে কাঠের মসলিতে (খাটিয়া) করে কাঁধে করে নিয়ে চলে যাচ্ছেন।
হ্যাঁ, আব্বু চলে যাচ্ছেন, আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। আর কখনো দেখা হবে না, কোলে উঠতে পারবো না। বাসার সবাই কাঁদছেন। 

আমি দরজায় বসে আব্বুর চলে যাওয়া দেখলাম। সবাই আব্বুকে নিয়ে চলে গেলেন গোরস্থানে। ঘণ্টাখানেক পর সবাই ফিরতে শুরু করলেন, দাফন হয়ে গেছে। কষ্ট আর হাহাকার নিয়ে আমি চলছি। 

আজ ২০২৪ সাল। আমি বড় হয়েছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি। আমার ভাইও বড় হয়েছে। আব্বুকে ছাড়া এবার দিয়ে ১৬টা ঈদ হবে। প্রতিবারের মতো এখনো আমি ভোরে ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়ে ছাদে যাই। দেবদারুর গাছটার ফাঁক দিয়ে আজও শুকতারা জ্বল জ্বল করে, ঈদের খুশিতে ছেলে মেয়েরা মেতে উঠে, আতশবাজির মতো সব উচ্ছ্বাসেরই যেন বিচ্ছুরণ ঘটে। কিন্তু আমার সেই ঈদের মতো আনন্দ হয় না। ঈদের দিনে আম্মু কান্না করে, বাসার পরিবেশ থমথমে হয়ে যায়।

সময় যায়, ঈদের পর ঈদ আসে। কিন্তু এ ঈদ আমার জন্য বেদনার। ঈদ আসলেই পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ে, কান্না পায়, কষ্ট হয়। এমন স্মরণীয় ঈদ যেন কারও জীবনে কখনো না আসে।

-শিক্ষার্থী, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন-

মধ্যবিত্ত হাসি

পুরোনো সেই ঈদের স্মৃতি

ভাইবোনের কাণ্ড

জলরঙের ঢেউ

দীর্ঘ অপেক্ষার ঈদ

আনন্দ-বিষাদের ঈদ

শৈশবের ঈদ

২০ টাকা সালামি

ঈদের সেরা মুহূর্তনামা

/মেহেদী/এসবি/

সম্পর্কিত বিষয়:

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়