ঢাকা     শুক্রবার   ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ ||  পৌষ ২৫ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নে ওশান গভর্ন্যান্স: সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

মো. শফিউল্লাহ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:৩১, ৮ জানুয়ারি ২০২৬   আপডেট: ১৮:৩১, ৮ জানুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নে ওশান গভর্ন্যান্স: সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

মো. শফিউল্লাহ

বাংলাদেশ ব্লু ইকোনমিতে সম্ভাবনাময় একটি দেশ। দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ গভীরভাবে জড়িয়ে আছে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে। ২০১২ ও ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশ পেয়েছে প্রায় ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা, যা দেশের স্থলভাগের প্রায় সমান। এই বিশাল সমুদ্রসীমা মৎস্য, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ, নবায়নযোগ্য শক্তি, সমুদ্রবাণিজ্য এবং পর্যটনের মাধ্যমে দেশের টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে এবং সমুদ্রকে টেকসইভাবে ব্যবহার করতে ওশান গভর্ন্যান্স বা সমুদ্রসম্পদ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্রের সম্পদ নষ্ট না করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ নিশ্চিত করে আমরা কীভাবে সমুদ্র ব্যবহার করবো, রক্ষা করবো এবং সবার জন্য ন্যায্য ও নিরাপদ রাখবো—এতে সরকারের কার্যকর পরিকল্পনা, আইন ও ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অর্জনে এর বিকল্প নেই।

আরো পড়ুন:

তবে, সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। সমন্বিত নীতির অভাব, প্রযুক্তিগত দুর্বলতা, অবৈধ ও অঘোষিত মৎস্য আহরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি কার্যকর ওশান গভর্ন্যান্স প্রতিষ্ঠায় বাধা সৃষ্টি করছে।

বর্তমানে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জসমূহ

নীতিগত ঘাটতি; সমুদ্রসম্পদ ব্যবস্থাপনা একাধিক মন্ত্রণালয়ে বিভক্ত, ফলে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। প্রযুক্তিগত দুর্বলতা; স্যাটেলাইট মনিটরিং, অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম (AIS), ড্রোন, আধুনিক ট্রলার ও ইকো-সাউন্ডারের ব্যবহার সীমিত। আইন প্রয়োগ ও নিরাপত্তা; অবৈধ ও অপ্রতিবেদিত মাছধরা (IUU Fishing) এবং জেলেদের অপহরণ উপকূলীয় নিরাপত্তা ও খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। গবেষণা ও অর্থায়ন ঘাটতি; মেরিন গবেষণায় জাতীয় বাজেটের মাত্র ১–১.৫% বরাদ্দ। জ্বালানি নিরাপত্তা; গভীর সমুদ্র তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগের অভাব।

পরিবেশ ও জলবায়ু ঝুঁকি; সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা, দূষণ এবং উপকূলীয় ক্ষয় সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি। বর্তমানে অধিকাংশ জেলে আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়াই ৪০ মিটারের কম গভীরতায় মাছ আহরণ করছে। ফলে আমাদের ৩৭৩ প্রজাতির মাছের মধ্যে মাত্র ৩০ প্রজাতি নিয়মিত আহরণযোগ্য। অন্যদিকে পার্শ্ববর্তী ভারতের জেলেরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ১০০ মিটার বা তার বেশি গভীরতায় মাছ শিকার করছে।

নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি। ২০২৫ সালের শুরু থেকে প্রায় চার শতাধিক বাংলাদেশি মৎস্যজীবী অপহরণের শিকার হয়েছেন। যদিও অনেকে ফিরে এসেছেন, অনেক জেলে এখনও বন্দি। এটি উপকূলীয় অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং জেলেদের জীবনকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলছে।

তেল ও গ্যাস ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। ভারতের গভীর সমুদ্রে প্রায় ৪০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুদ নিশ্চিত হয়েছে, যেখানে প্রতিবছর ১০০ বিলিয়ন ডলারের বাজার গড়ে উঠেছে। মিয়ানমারও প্রতিবছর ৩-৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সমুদ্রগ্যাস রপ্তানি করছে। অথচ বাংলাদেশ, সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির ১৪ বছর পরও কোনো গভীর সমুদ্র কূপ খনন করতে পারেনি।

প্রতিরোধে যা করণীয়

শক্তিশালী ওশান গভর্ন্যান্স; সমন্বিত জাতীয় নীতি প্রণয়ন

মেরিন স্প্যাশিয়াল প্ল্যানিং (MSP) এর মাধ্যমে মৎস্য আহরণ, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, পর্যটন ও পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা নির্ধারণ করা সম্ভব। গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতাত্ত্বিক এলাকা ও প্রজাতি সংরক্ষণের জন্য অন্তত ১০% সমুদ্র এলাকা মেরিন প্রোটেকটেড এরিয়া (MPA) ঘোষণা করা উচিত। অবৈধ মাছধরা কমাতে কঠোর আইন প্রয়োগ অপরিহার্য।
গবেষণা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ

মেরিন সায়েন্সের বাজেট কমপক্ষে ৫% পর্যন্ত বৃদ্ধি করা জরুরি। স্যাটেলাইট, ড্রোন, জিপিএস, সোনার ও ইকো-সাউন্ডার প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাছ ধরা, জাহাজ চলাচল ও দূষণ নজরদারি করা সম্ভব। আধুনিক ট্রলার সরবরাহের মাধ্যমে জেলেদের কার্যকারিতা ও টেকসই মাছ আহরণ নিশ্চিত হবে।

নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগ

কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ টহল ও কূটনৈতিক সমন্বয়ের মাধ্যমে অবৈধ মাছ আহরণ ও জেলেদের অপহরণ রোধ করা সম্ভব।
তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও অর্থনৈতিক ব্যবহার

দ্রুত কূপ খনন শুরু করতে হবে। বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে কার্যকর Production Sharing Contract (PSC) চুক্তি সম্পাদন এবং প্রযুক্তি স্থানান্তর ও বিনিয়োগ আকর্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে।

পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ

ম্যানগ্রোভ বন ও সি-গ্রাস পুনরুদ্ধার প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। সমুদ্র দূষণ নিয়ন্ত্রণে প্লাস্টিক, তেল ও শিল্পবর্জ্য কমানো অপরিহার্য।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগ

বাংলাদেশে প্রযুক্তি, অর্থায়ন এবং সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব। এই ক্ষেত্রে UNDP-এর Ocean Promise উদ্যোগ এবং ব্লু বন্ডস ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও প্রযুক্তি স্থানান্তর করা যেতে পারে। এছাড়া IORA ও অন্যান্য আঞ্চলিক ফোরামে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করলে সমুদ্র নিরাপত্তা, জ্ঞান বিনিময় এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়তা পাওয়া সম্ভব।

বাংলাদেশের বিশাল মৎস্যসম্পদ, তেল-গ্যাস মজুদ, নবায়নযোগ্য শক্তি, পর্যটন ও মেরিন বায়োটেকনোলজি দেশের টেকসই উন্নয়নের বড় সম্ভাবনা। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে এখনই প্রয়োজন কার্যকর ওশান গভর্ন্যান্স। সমন্বিত নীতি, আধুনিক প্রযুক্তি, সমুদ্র নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করলে বাংলাদেশ টেকসই মৎস্য আহরণ, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং জলবায়ু সহনশীলতা নিশ্চিত করতে পারবে।
বাংলাদেশ যদি এখনই ব্লু ইকোনমি ও ওশান গভর্ন্যান্সকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার না দেয়, তবে সমুদ্রসম্পদের সম্ভাবনা কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে। সঠিক নীতি ও কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে সমুদ্রকে দেশের টেকসই উন্নয়নের বাস্তব শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব।

ঢাকা/জান্নাত

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়