আব্বাকে ছাড়া প্রথম কোরবানির ঈদ: পিয়া জান্নাতুল
আমিনুল ইসলাম শান্ত || রাইজিংবিডি.কম
মডেল, অভিনেত্রী, আইনজীবী—একাধিক পরিচয়ে পরিচিত পিয়া জান্নাতুল। পশুপাখির প্রতি তার আলাদা মমতা রয়েছে। পেশাগত কাজ, স্বামী-সন্তান নিয়ে বছরজুড়ে ব্যস্ত সময় কাটান। পেশাগত ব্যস্ততা, ঈদ স্মৃতিসহ নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন এই অভিনেত্রী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাইজিংবিডির সহকারী বার্তা সম্পাদক আমিনুল ইসলাম শান্ত।
রাইজিংবিডি: নাটক বা চলচ্চিত্র—কোনো মাধ্যমেই আপনার উপস্থিতি নেই কেন?
পিয়া জান্নাতুল: আমি কখনোই খুব বেশি নাটক করিনি। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে বা মাঝে নাটক-সিনেমা করেছি। নাটকে প্রচুর সময় দিতে হয়। নাটকে যারা কাজ করতেন চান, তারা খুব সহজেই ব্যস্ত থাকতে পারেন। কিন্তু আমি এভাবে ব্যস্ত থাকতে পারিনি বা চাইনি। কারণ আমার ব্যবসা বা অন্য কাজ নিয়ে ব্যস্ততা ছিল। একটা সময় পরে মনে হয়েছে, সিনেমার জন্য যে ডেডিকেশন প্রয়োজন, যে সময় প্রয়োজন তার একটাও আমার কাছে নেই। সুতরাং আরেকটা মেয়ের জায়গা নষ্ট না করার চেয়ে দূরে থাকা ভালো!
তাই বলে কখনো সিনেমা করব না, তা কিন্তু নয়। সব কিছু মিলিয়ে কখনো ভালো কিছু পেলে সিনেমায় কাজ করব। তবে ওই যে, ধরে রাখার একটা ব্যাপার, ঈদে একটা কাজ করতেই হবে, না করলে লাইমলাইটে থাকা যায় না, এসব নিয়ে অনেক শিল্পী হীনম্মন্যতা বা পেশাগত নিরাপত্তাহীনতায় থাকেন। অনেক শিল্পী ভাবেন—‘আমার হাতে কোনো কাজ নেই!’ আমার মনে হয়, এটা একটা বাড়তি প্রেসার। তবে এটি নিয়ে আমার কখনো নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়নি। কারণ আমি অন্যান্য বিষয় নিয়ে সবসময়ই ব্যস্ত ছিলাম, এখনো আছি।
রাইজিংবিডি: আপনার ঈদের আনন্দ জীবনের সঙ্গে কতটা, কীভাবে বদলেছে?
পিয়া জান্নাতুল: আমি কোর্ট থেকে বাসায় ফিরেছিলাম, বাসা থেকে চেম্বারে যাচ্ছি, গাড়িতে বসে আপনার সঙ্গে কথা বলছি। আমার বয়স এখন ত্রিশোর্ধ্ব, এ বয়সেও ঈদ উদযাপন করি। ঈদ উদযাপন করি না— বলব না। ঈদের সময় এখনো আমার ভালো লাগে, পরিবারের সঙ্গে কাটাই। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ব বাড়ছে। এই দায়িত্ব পালন করাটাও উপভোগ করি। আমার জীবন শুধু নিজের জন্য নয়, এই জীবন অন্যের জন্য, পশু-প্রাণীর জন্যও। চেষ্টা করি দায়িত্বটা নেওয়ার; যাতে করে আরো কাজ করার জন্য সক্ষম হতে পারি।
রাইজিংবিডি: কোরবানির ঈদে আপনার বিশেষ কোনো দায়িত্ব থাকে কিনা?
পিয়া জান্নাতুল: শুধু কোরবানির ঈদ না, সব ঈদ বা ফাংশনে দায়িত্ব থাকে। অনেকে বলেন, ‘কোরবানির পশু কেনার জন্য ছেলেরা হাটে যায়। কিন্তু আমাদের বাসায় তো ছেলে নাই!’ তাই বলে এই না যে, আমি নিজেই গরু কিনতে হাটে যাই। সবসময়ই আমি আমার বাবা-মায়ের বাড়ি ও শ্বশুরবাড়িতে একটি ফিগার হতে চেয়েছি। সুতরাং সবসময়ই বাড়তি দায়িত্ব আমার উপরে থাকে। সেটা অর্থনৈতিক হোক, শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকা হোক। আমি উপস্থিত না থাকলে আনন্দ একটু কমে যাবে! সুতরাং পরিবারের ফাংশনে আমি উপস্থিত থাকি।
রাইজিংবিডি: কোরবানির পশু কিনতে কখনো হাটে গিয়েছেন?
পিয়া জান্নাতুল: আমি বেশ কয়েকবার কোরবানির গরু কেনার জন্য হাটে গিয়েছি। কিন্তু হাটে গিয়ে গরু কেনার ব্যাপারটি আমার পছন্দ না। কারণ যেভাবে পশুগুলো বাঁধা হয়; পশুগুলোর কষ্ট, যে লোকটি গ্রাম থেকে পশুটি নিয়ে এসেছে তার কষ্ট, বিক্রির পর সেই চেনা মানুষটির মায়া ছেড়ে চলে আসার কষ্ট— এগুলো অনুভব করি। অনেক দিন গরুটি লালন-পালনের কারণে যে বন্ধন, মায়া তৈরি হয়েছিল সেটা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এটা খারাপ লাগে। ফলে আমি এসব এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। কোরবানির দিন বাসার নিচে না নামার চেষ্টা করি। কিন্তু কোরবানি আমাদের ধর্মীয় ঐতিহ্য। সুতরাং নিয়ম মেনে পালন করতে হয়।
রাইজিংবিডি: ছোটবেলার ঈদের স্মৃতি নিশ্চয়ই মনে আছে—
পিয়া জান্নাতুল: তখন দেখেছি, আব্বা গরু কিনে নিয়ে আসতেন, গরু সাজাতেন, মালা পরাতেন। তবে অনুধাবনের ব্যাপারটি পরে হয়েছে। ফলে কে কত বড়, দামি গরু কিনলেন, এই শো অফের অভ্যাস আমার ভালো লাগে না। আমাদের ধর্মে বলা আছে, কোরবানির পর মাংস ভাগ করে দেওয়া। কিন্তু আপনি পশু কাটছেন, খাচ্ছেন কিন্তু ধর্মীয় নিয়মগুলো সঠিকভাবে পালন করা হয় না। এমন দৃশ্য কেবল বাইরে দেখি না, নিজের পরিবারেও দেখি।
রাইজিংবিডি: বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের জীবন এতটাই জড়িয়ে থাকে যা মৃত্যু ছাড়া আলাদা করা যায় না। বাবা-মায়ের সঙ্গে ঈদের স্মৃতিকথা শুনতে চাই।
পিয়া জান্নাতুল: আব্বাকে ছাড়া এটাই আমার প্রথম কোরবানির ঈদ। গত বছর ঈদের চার-পাঁচ দিন পর আব্বা মারা যান। কোরবানির গরু কেনা, কোরবানি দেওয়া, সবাইকে নিয়ে ঈদ উদযাপন করতে আব্বা খুব উপভোগ করতেন। আব্বাকে ছাড়া প্রথম ঈদ, এটা জীবনেরই অংশ। অনেক স্মৃতি রয়েছে। আব্বা-আম্মার সঙ্গেই সব স্মৃতি। বিয়ের পর থেকে শ্বশুরবাড়িতে ঈদ করি। আব্বা গত বছর মারা গেছেন, তার আগের বছর শ্বশুর মারা গেছেন। আমার বিয়ের বয়স ১২ বছর। শ্বশুরের সঙ্গে আমার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। আব্বার সঙ্গে তো ক্লোজ ছিলামই, যতটুকু থাকা দরকার। ক্লোজও ছিলাম আবার আব্বার সঙ্গে আমার মান-অভিমানের একটা বড় ব্যাপারও ছিল। তবে হ্যাঁ, যত ভালো স্মৃতি বলেন, সব আব্বা-আম্মার সঙ্গেই। আলাদা করে বলার কিছু নেই। প্রত্যেকটা স্মৃতিই ভালো স্মৃতি। এখন চিন্তা করি, বয়স যত বাড়ছে, জীবন থেকে সময় তত কমে যাচ্ছে। সুতরাং প্রত্যেকটি মুহূর্ত খুবই মূল্যবান।
রাইজিংবিডি: এমন কোনো খাবার আছে, যা ছাড়া আপনার ঈদ পূর্ণ হয় না?
পিয়া জান্নাতুল: ভাত না খেলে মনে হয় দিনই পূর্ণ হয়নি; সেটা ঈদ হোক বা অন্য কোনো দিন। ভাত না খেলে মনে হয়, ‘ইস! সামথিং ইজ মিসিং!’ ঈদের সময়ে পোলাও-বিরিয়ানি থাকে, কিন্তু আমার ভাতই লাগবে। ফলে আমার জন্য ভাত আলাদা করে থাকেই। আমি হেভি খাবার খুব কম খাই। ওয়ার্কআউট নিয়ে কতজন কতকিছু পরামর্শ দেয়। কিন্তু আমি বলি, ‘ভাই, সারা দিন কাজ করি, আমার একটু না খেতে পারলে হবে না।’ শুনেছি, কোন কোন নায়িকা যেন এক চামচ, দুই চামচ ভাত খান। আমি পর্যাপ্ত ভাতই খাই, একেবারে কম খাই না।
রাইজিংবিডি: আপনি নিয়মিত ভাত খেয়েও ফিট আছেন—
পিয়া জান্নাতুল: আমি বুঝি মানুষ কেন এমন বলেন। কার্ব (কার্বোহাইড্রেট) তো দরকার, প্রোটিন দরকার, ফ্যাট দরকার। আমার তো ব্রেনের কাজ করা লাগে। একটা সময় শুটিং করেছি, শুটিংয়ের পাশাপাশি পড়াশোনাও করতাম। পেটে ক্ষুধা নিয়ে একটা মামলা লিখবেন, লিখতেই পারবেন না। আমি অন্তত পারি না। আমার মাথা কাজ করে না।
ঢাকা/তারা//
হামে আক্রান্ত-উপসর্গে আরো ৮ শিশুর মৃত্যু