ঢাকা     শনিবার   ৩০ মে ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ১৬ ১৪৩৩ || ১৩ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

রোমানিয়ায় রুশ ড্রোনের হানা, ক্ষোভে ফুঁসছে ন্যাটো মিত্ররা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:৩৪, ২৯ মে ২০২৬   আপডেট: ১৭:১২, ২৯ মে ২০২৬
রোমানিয়ায় রুশ ড্রোনের হানা, ক্ষোভে ফুঁসছে ন্যাটো মিত্ররা

পূর্ব রোমানিয়ার একটি আবাসিক ভবনে রাশিয়ার একটি ড্রোন আছড়ে পড়ে দুজন আহত হওয়ার ঘটনায় রোমানিয়া ও তার ন্যাটো মিত্ররা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। খবর আল-জাজিরার।

গত রাতে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়া ব্যাপক হামলা চালানোর সময় রুশ ড্রোনের অনুপ্রবেশের এই ঘটনাকে শুক্রবার (২৯ মে) রোমানিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক আইনের মারাত্মক লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে। একই সঙ্গে তারা ন্যাটোকে অ্যান্টি-ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হস্তান্তরের গতি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে।

আরো পড়ুন:

রোমানিয়া জানিয়েছে, গত রাতে রুশ ড্রোনটি গালাতি শহরের একটি আবাসিক ভবনের ছাদে বিধ্বস্ত হওয়ার আগে তাদের আকাশসীমায় রাডারের মাধ্যমে ট্র্যাক করা হয়েছিল। পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাৎক্ষণিকভাবে বিমান বাহিনীর দুটি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান এবং একটি সামরিক হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়। একই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য জরুরি সতর্কতা বার্তা পাঠানো হয়।

ড্রোনটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর আবাসিক ভবনটিতে আগুন ধরে যায়, যার ফলে দুজন ব্যক্তি সামান্য আহত হন এবং বেশ কয়েকজন বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।

এর প্রতিক্রিয়ায় শুক্রবার সকালে বুখারেস্টে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে রোমানিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

ইউক্রেন যুদ্ধ প্রতিবেশী ন্যাটো দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, এই ঘটনাটি তারই সর্বশেষ উদাহরণ।

এস্তোনিয়া, লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়ার পাশাপাশি ফিনল্যান্ডও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তাদের আকাশসীমায় বারবার এই ধরনের অনুপ্রবেশের কথা জানিয়েছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে ড্রোনের অনুপ্রবেশের জেরে লাটভিয়ায় সরকারের পতন ঘটে।

ড্রোন অনুপ্রবেশের ঘটনার পরপরই বুখারেস্ট ন্যাটোর কাছে অ্যান্টি-ড্রোন সক্ষমতা দ্রুত হস্তান্তরের দাবি জানায়। বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ইলি বোলোগান এক ঘোষণায় জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘সেফ’ প্রোগ্রামের আওতায় আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দেশটিতে অত্যাধুনিক অ্যান্টি-ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয়ের চুক্তি সই হতে যাচ্ছে।

রোমানিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ানা তোইউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বিবৃতিতে বলেন, “রাশিয়ান ফেডারেশনের এই চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কারণে আমাদের দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্কে কী ধরনের গম্ভীর পরিণতি আসবে, তা আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেব। এছাড়া ইউরোপীয় পর্যায়ে রাশিয়ার ওপর পরবর্তী নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজ নিয়ে আমরা কাজ শুরু করেছি।”

এদিকে রোমানিয়ার প্রেসিডেন্ট নিকুসোর ডান কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার চালানো এই অবৈধ যুদ্ধ কোনোভাবেই রোমানিয়ার নাগরিকদের ওপর স্থানান্তরিত হওয়া আমরা বরদাশত করব না।” তিনি রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর ও আনুপাতিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন।

ন্যাটোর মিত্র ও অন্যান্য দেশগুলোও এই ক্ষোভে শামিল হয়েছে।

ইউরোপীয় বিষয়ক ফরাসি মন্ত্রী বেঞ্জামিন হাদ্দাদ এক বিবৃতিতে বলেন, “এই ঘটনাটি ইউরোপীয় নিরাপত্তার প্রতি রাশিয়ার হুমকিকে স্পষ্ট করে তোলে।” তিনি উল্লেখ করেন, রোমানিয়ায় ফরাসি সৈন্য মোতায়েন রয়েছে।

পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাডোস্লাভ সিকোরস্কি আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, “এটি ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়েছে নাকি অদক্ষতার ফল, তা বড় কথা নয়; রাশিয়া এখনও বিপজ্জনক এবং আমাদের অবশ্যই এর বিরুদ্ধে নিজেদের রক্ষা করতে হবে।”

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেইন বলেন, “এই ঘটনা প্রমাণ করে যে ‘রাশিয়ার আগ্রাসী যুদ্ধ আরো একটি সীমা অতিক্রম করেছে।”

ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেই সিবিকা রাশিয়াকে কৃষ্ণ সাগর অঞ্চল ও পুরো ইউরোপীয় মহাদেশের জন্য একটি হুমকি হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, “ইউক্রেন দৃঢ়ভাবে রোমানিয়ার পাশে রয়েছে।”

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে তিনি আরো বলেন, “এই ধরনের হুমকি থেকে সুরক্ষায় রোমানিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে প্রস্তুত ইউক্রেন।” তিনি আরো যোগ করেন, ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার চলমান প্রচেষ্টা কেবল ইউক্রেনকে রক্ষা করার জন্যই নয়, বরং প্রতিবেশী দেশগুলোর ঝুঁকি কমানোর জন্যও কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

এদিকে, এ ঘটনায় জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেন, এই যুদ্ধ ‘নিয়ন্ত্রণের বাইরে’ চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যার পরিণতি হতে পারে ‘ভয়াবহ’। তিনি অবিলম্বে নিঃশর্ত যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানান।

ইউক্রেনীয় বাহিনী জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার রাতভর তারা ২১৭টি রুশ ড্রোন ভূপাতিত করেছে। রাশিয়া ২৩২টি ড্রোন ও একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়েছে। ইউক্রেনীয় বিমান বাহিনীর তথ্যমতে, ১৪টি এলাকায় এই হামলার আঘাত অনুভূত হয়েছে।

অন্যদিকে মস্কো জানিয়েছে, তারা কিয়েভে ‘পরিকল্পিত হামলা’ চালানোর পরিকল্পনা করছে। একইসঙ্গে ইউক্রেনের ইউরোপীয় মিত্রদের প্রতি নতুন হুমকিও জারি করেছে। রাশিয়া ইউরোপের এমন কিছু স্থাপনার তালিকা তৈরি করেছে, যা তাদের মতে ইউক্রেনের জন্য ড্রোন ও এর যন্ত্রাংশ তৈরিতে জড়িত।

মস্কোর ফরেন ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস সম্প্রতি বাল্টিক দেশগুলোকে হুমকি দিয়ে বলেছে, তারা যদি ইউক্রেনকে তাদের ভূখণ্ড থেকে হামলা চালানোর অনুমতি দেয়, তাহলে ন্যাটোর সদস্যপদও তাদের প্রতিশোধ থেকে রক্ষা করতে পারবে না।

বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া এবং ন্যাটো রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে।

শুক্রবার ন্যাটো প্রধান মার্ক রুটে জোর দিয়ে বলেন, “ন্যাটো তার সব ভূখণ্ড রক্ষা করবে।”

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেওয়া এক বিবৃতিতি রুটে বলেন, “রাশিয়ার বেপরোয়া আচরণ আমাদের সবার জন্য বিপদ।” তিনি আরো যোগ করেন, “গত রাত আবারো দেখিয়ে দিয়েছে যে তাদের অবৈধ আগ্রাসী যুদ্ধের প্রভাব সীমান্তের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে না।”

ন্যাটো প্রধান আরো বলেন, “আমরা আমাদের নিজেদের মাটিতে প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা অব্যাহত রাখব এবং রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইউক্রেন যেভাবে আত্মরক্ষা করছে, তাদের প্রতি আমাদের সমর্থন বজায় রাখব।”

ঢাকা/ফিরোজ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়