রম্যগল্প: ডাক্তারবাবু
মোস্তফা কামাল || রাইজিংবিডি.কম
অলঙ্করণ: মামুন হোসাইন
মির্জা গালিব আল হাসান বিখ্যাত ডাক্তার। রাজধানী শহর ঢাকায় তার বিরাট নামডাক। কে না চেনে তাকে! মেডিসিনের ডাক্তার মানেই মির্জা গালিব। শুধু বড় বড় পাস দিলেই ডাক্তার বড় হয় না। রোগী ভালো হওয়ার জন্য হাতের যশও লাগে। মির্জা গালিবের হাত যশ ভালো। তার হাতে আধমরা রোগীও সুস্থ হয়ে ওঠে। গ্রাম থেকে শহর সবখান থেকেই রোগী ছুটে আসে তার কাছে। এ এক আশ্চর্য ব্যাপার!
পত্রিকার পাতায় ডাক্তারের ছবিসহ বিজ্ঞাপন দেখে চমকে উঠে ফারুক কাজী। সে ভালো করে ছবির দিকে তাকায়। এদিক-ওদিক ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে। তারপর মনে মনে বলে, এটা ইনুচ মিয়া না! এই সেই দিনও কম্পাউন্ডারগিরি করেছে। ও ডাক্তার হইল কবে? ও আল্লাহ! এ আমি এইসব কী দেখতেছি? ফারুক কাজী পত্রিকা হাতে নিয়ে সহপাঠী আরো কয়েকজনকে দেখায়। ছবি দেখে তারাও নিশ্চিত— ইনুচ মিয়াই। এতো বড় বাটপারি ও শিখল কোথায়? বড়ই দুশ্চিন্তার বিষয়!
ফারুক কাজী মনে মনে ইনুচ মিয়ার কথা ভাবে। তারা দুজন একসঙ্গে বড় হয়েছে। একই স্কুলে পড়েছে। ফারুক কাজী এইচএসসি পাস করে প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতার পেশায় ঢুকেছে। আর ইনুচ মিয়া কয়েকবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে চতুর্থবার টানেমানে পাস করে। এইচএসসিতে আর ভর্তি হতে সাহস পায়নি সে। থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাক্তার আবদুর রহিমের হাতেপায়ে ধরে তার সহকারী হিসেবে কাজ নেয়। তিনি যখন গ্রামে কলে যেতেন তার ব্যাগ নিয়ে পেছনে পেছনে ছুটতো ইনুচ মিয়া। কাজটি সে বেশ কিছুদিন ধরে করে। হঠাৎ একদিন উধাও হয়ে যায়। সেই যে গ্রাম ছেড়েছে আর ফিরে আসেনি। এরমধ্যে সাত-আট বছর কেটে গেছে।
ইনুচ মিয়াকে নিয়ে বড়ই দুশ্চিন্তায় আছে ফারুক কাজী। সে কীভাবে কী করল তা নিয়ে ভাবে। মনে মনে বলে, এতো দেখছি আচানক কাণ্ড! কম্পাউন্ডার থেকে মেডিসিনের সবচেয়ে বড় ডাক্তার! ওর তো এসএসসি পাস করতেই চার বছর লেগেছে। তাও আবার গ্রেস নাম্বার দিয়ে গড়ে তেত্রিশ নম্বর পেয়ে! আর সে লেখাপড়া করেনি— এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। তাহলে ডাক্তার হলো কী করে! আবার দেখছি, নামটাও বদলে ফেলেছে! ইনুচ মিয়া থেকে হয়ে গেছে মির্জা গালিব আল হাসান। তার মানে সে পুরাই বাটপার হয়ে গেছে। ওর সব সার্টিফিকেট জাল! নাকি মির্জা গালিব নামে ডাক্তারের সার্টিফিকেট চুরি করে নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছে! মাই গড! এ তো দেখছি ভয়াবহ জোচ্চুরি!
ফারুক কাজী বিজ্ঞাপনটি ভালো করে পড়ে। বিজ্ঞাপনে লেখা আছে, মির্জা গালিবের গুলশান, উত্তরা ও ধানমন্ডিতে তিন তিনটি চেম্বার। তিনটি চেম্বারেই রোগীর অস্বাভাবিক ভিড়। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত রোগী সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয় তাকে। তিন চেম্বারে তিনজন করে এমবিবিএস ডাক্তার, তিনজন করে সহকারী। একজন সহকারী সিরিয়াল লেখায় ব্যস্ত। আরেকজন চেম্বারে ভেতরে ডিউটিতে থাকে। আরেকজন থাকে তদারকিতে। ভিড় সামাল দিতে কয়েকজন সিকিউরিটি গার্ডের ঘর্মাক্ত অবস্থা। রোগীর সিরিয়াল ঠিক রাখতেও তাদের ত্রাহি অবস্থা।
ফারুক কাজী মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল ইনুচ মিয়ার সঙ্গে দেখা করবে। আসলেই সে ইনুচ মিয়া নাকি মির্জা গালিব তা নিজের চোখে দেখতে হবে। অনেক সময় একই চেহারার একাধিক মানুষ থাকতে পারে। কাজেই নিজের চোখে দেখে নিশ্চিত হওয়া ভালো। ফারুক কাজী আর দেরি করল না। সে পরদিনই ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হলো। পত্রিকায় দেওয়া তিনটি ঠিকানায় গেল সে। তিনটিতেই বিপুল মানুষের ভিড় দেখে তার টাসকি লাগার দশা। এতো ভিড়ের মধ্যে দেখা করার উপায় কী? মনে মনে ভাবে ফারুক কাজী। তারপর উত্তরা এলাকায় মির্জা গালিবের একটি চেম্বারে গিয়ে একজন সিকিউরিটি গার্ডের সঙ্গে আলাপ জমায়। তাকে চা নাশতা খাওয়ায়। এভাবে কয়েকদিন গিয়ে লোকটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে। তারপর তার হাতে কিছু টাকা গুজে দিয়ে বলে, ভাই আমাকে একটা উপকার করতে হবে।
সিকিউরিটি গার্ড লোকটা ফারুক কাজীকে ভালো করে দেখে। তারপর বলে, কী উপকার কন তো!
আমাকে একটু ডাক্তার সাহেবের সঙ্গে দেখা করিয়ে দিতে হবে। খুবই জরুরি। আজকে পারলে আজকে।
সিকিউরিটি গার্ড বিস্ময়ের সঙ্গে বলে, আজকে কী করে সম্ভব! যে-ই লম্বা সিরিয়াল! সিরিয়াল ব্রেক করে ঢুকাতে গেলেই তো তুলকালাম কাণ্ড ঘইট্টা যাইব।
ফারুক কাজী ভিন্ন কৌশল নেওয়ার জন্য সিরিউরিটি গার্ডকে উদ্দেশ করে বলে, ওহ! আপনার বাড়ি বরিশাল? তা আগে কইবেন না!
সিকিউরিটি গার্ড হেসে দিয়ে বলল, হয় হয়! বরিশালই। আপনের বাড়ি বরিশাল না?
হেরলাইগ্যাই তো জিজ্ঞাসা করলাম। আম্মেগো বাড়ি কোন জায়গায়?
হিজলা থানার কাছে তালুকদার বাড়ি।
ওহ! হ্যা দিহি আমাগো বাড়ির কাছেই। আমাগো লতা। জমাদ্দার বাড়ি। দবিরউদ্দিন জমাদ্দার।
হ চিনছি চিনছি। হ্যা আগে কইবেন না? খাড়ান ব্যবস্থা হইবে আনে। আচ্ছা হোনেন, ওই ছেলেডারে কিছু বকশিশ দেন। শত পাঁচেক দেলেই হইবে। সিরিয়ালের মইধ্যে ঢুকাইয়া দেবে আনে।
এই সুযোগ আর কে ছাড়ে? ফারুক কাজী পকেট থেকে কড়কড়া একটা পাঁচশো টাকার নোট বের করে সিকিউরিটি গার্ডের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে, দ্রুত ব্যবস্থা করেন। আর আপনের নামডাই তো জানা হইল না!
আমার নাম মুক্তার। আসতে আছি। দেহি ছেলেডারে কইয়া। বাকিটা আপনের ভাগ্য বোঝলেন!
সিকিউরিটি গার্ড এগিয়ে যায় ডাক্তারের চেম্বারের দিকে। ডাক্তার সাহেবের রুমে একজন বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরেকজন ঢুকছেন। পাশে রোগীদের অপেক্ষমাণ রুম। সেখানে জনা পঞ্চাশেক রোগী অপেক্ষা করছেন। এই রোগীদের দেখতে রাত কয়টা বাজবে কে জানে! রোগী কিংবা তাদের সঙ্গে আসা লোকেরা সিরিয়ালের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন; যাতে কেউ সিরিয়াল ভাঙতে না পারে। যে ছেলেটি এই দায়িত্ব পালন করছে তার নাম মনির। তার সঙ্গে কেউ কানে কানে কথা বলতে গেলেও পাশ থেকে চিৎকার দিয়ে ওঠেন। কেউ কেউ দূর থেকে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। এমন একটা পরিস্থিতির মধ্যে সিরিয়াল ভাঙার কথা ভাবতেও পারে না সে।
সিকিউরিটি গার্ড মনিরকে ডেকে নিয়ে যায় পাশের একটি রুমে। তাকে পাঁচশো টাকার একটি নোট ধরিয়ে দিয়ে বলে, আমার একটা লোককে একটু ভিতরে ঢুকাইতে হইব। কীভাবে ঢুকাইবা সেইটা তুমি দেখ।
মনির বিস্ময়ের দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে সিকিউরিটি গার্ডের দিকে। সে মনিরের পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, আমি কোনো দিন তোমারে কইছি। কই নাই। একটা কথা তুমি রাহো। তুমি বলবা, স্যারের বন্ধু। স্যারের সঙ্গে দেখা করতে আইছে।
চেম্বারে স্যারের বন্ধু! কেউ বিশ্বাস করবো?
করবো না কেন? বিপদাপদ থাকতে পারে না? তুমি যাও তো!
এতোগুলা লোক বাইরে অপেক্ষা করতেছে! সিরিয়াল ভাঙতে গেলে বিরাট বিপদ হইব। মাইর খাইতে হইব?
আরে তোমারে মারা সাহস কার? আমি দেখমু। তুমি যাও।
সিকিউরিটি গার্ড ফারুক কাজীকে ইশারায় ডাকল। সে মনিরের সামনে এসে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে খেকশিয়ালের মতো চিৎকার দিয়ে উঠল অপেক্ষমাণ কয়েকজন রোগী। একজন তেড়ে এসে বলল, সিরিয়াল ব্রেক করলে ভালো হবে না।
এ সময় পেছন থেকে ওই ওই করে ডাকল আরো কয়েকজন। মনির বয়সে ছোট হলেও উপস্থিত বুদ্ধিতে ভালো। সে তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে জানে। সে দাঁড়িয়ে সবার উদ্দেশে বিনয়ের সঙ্গে বলল, ওনার প্রয়োজনে নয়; স্যার তার নিজের কাজের জন্য ওনাকে ডাকছেন। এখন আপনারা যদি অনুমতি দেন তাইলে ওনাকে নিয়ে স্যারের রুমে যামু। অনুমতি না দিলে যামু না।
দূর থেকেই কয়েকজন বলল, আচ্ছা যান যান। অন্যরাও আর কেউ কিছু বলল না। মনির ফারুক কাজীকে নিয়ে ভেতরে গেল। স্যার উনি নাকি আপনার গ্রামের লোক। আপনি ভালো করে ওনাকে চেনেন?
মির্জা গালিব শুনেও না শোনার ভান করলেন। তিনি রোগী দেখায় ব্যস্ত। ডাক্তারের সামনের চেয়ারে বসে ফারুক কাজী। ডাক্তার রোগী দেখা শেষ করে ফারুক কাজীর দিকে তাকাতেই চমকে উঠলেন তিনি। মনে মনে বললেন, ফারুক্যা এই জায়গায় কি করে এলো? কীভাবে আমার ঠিকানা পাইল? ও তো একটা ভ্যাজাল্লা লোক। মির্জা গালিব নিজেকে মুহূর্তেই সামলে নিলেন। তারপর বললেন, আপনার কী সমস্যা?
ফারুক কাজী মুচকি মুচকি হাসে। রোগের কথা কিছু বলে না। মির্জা গালিব তাড়া করে। দ্রুত বলেন, অনেক রোগী অপেক্ষায় আছে। আজ রোগী দেখতে দেখতে কয়টা বাজে আল্লাহ মালুম।
ফারুক কাজী চারদিকে তাকায়। ডাক্তার গালিব তার কর্মীদের বাইরে যেতে বলেন। সবাই বাইরে চলে যাওয়ার পর ফারুক কাজীকে উদ্দেশ্য করে মির্জা গালিব বললেন, আপনাকে কি আমি চিনি?
ফারুক কাজী হাসে।
মির্জা গালিব বিরক্তির সঙ্গে বললেন, আরে! তাড়াতাড়ি বলেন। আমার অনেক রোগী অপেক্ষমাণ। ন্যাকামো করার সময় নেই।
ফারুক কাজী এবার মুখ খুললেন। আমাকে তুমি চেন না?
কে আপনি?
আমি ফারুক কাজী; তোমার গ্রামের সহপাঠী।
আমার গ্রামের মানে! আপনার বাড়ি কই?
বরিশাল।
আমার বাড়ি বরিশালে এ কথা আপনাকে কে বলল?
কে আর বলবে? আমি জেনেশুনেই আসছি। কিন্তু তুমি ডাক্তার হইলা কি কইরা! এ তো দেখছি পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য!
আপনার বোধহয় কোথাও ভুল হচ্ছে। আপনি ভুল মানুষের কাছে আসছেন।
না! আমার ভুল হয়নি। আমি সঠিক মানুষের কাছেই আসছি। তুমি নিজের নামটাও পাল্টাইয়া ফেললা? তুমি মির্জা গালিবের সার্টিফিকেট চুরি করেছ? নাকি এই নামে সার্টিফিকেট বানিয়েছ? কোনটা?
এই! আপনি বের হন তো! আমার সময় নষ্ট করছেন! বের হন এখান থেকে!
আমি কিন্তু হাটে হাড়ি ভেঙে দেব!
মির্জা গালিব চিৎকার দিয়ে বললেন, এই তুই বের হবি; নাকি ঘাড় ধরে বের করব?
মির্জা গালিবের চিৎকার শুনে দুজন জুনিয়র ডাক্তার ও কয়েকজন সহকারী দৌড়ে রুমে ঢুকল। তাদের দেখে মির্জা গালিব বললেন, এতো পাগলের রোগী! আমি কি পাগলের চিকিৎসা করি? যাকে পাও তাকে ঢুকিয়ে দাও। এখানে কে এনেছে একে?
সঙ্গে সঙ্গে দুই পাশ থেকে দুজন ফারুক কাজীকে জাপটে ধরল। ফারুক কাজী বলল, বেশি ভালো হবে না। আমি কিন্তু সব ফাঁক করে দেব। তোর বাটপারির কথা আমি ফাঁস কইরা দিব।
মির্জা গালিব তার সহকারীদের উদ্দেশে বললেন, তোমরা এখনো বসে আছে এখানে? ও একটা পাগল। শেষে কী কা- ঘটিয়ে বসবে! একে যেভাবে পারো মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতালে নিয়ে যাও। যা টাকা লাগে আমি দেব।
মির্জা গালিবের নির্দেশ। অমান্য করার সাধ্য কার? ফারুক কাজীকে কয়েকজন ধরে জোরপূর্বক রুম থেকে বের করে আনল। তারপর তাকে গাড়িতে তুলল।
ফারুক কাজী চিৎকার চেঁচামেচি করলেও কাজ হলো না। কেউ কেউ অবশ্য চিৎকারের কারণ জানতে চাইল। তারা বলল, লোকটার মাথায় গ-গোল আছে।
ফারুক কাজী বলল, না ভাই; আমার মাথা ঠিক আছে। আমার কোনো সমস্যা নেই। আমাকে এরা পাগল বানাচ্ছে!
এর মধ্যেই ড্রাইভার গাড়ি টান মারল। এক টানে গাড়ি চলে গেল মিরপুরে। সেখানে মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। দায়িত্বরত ডাক্তারকে বলা হলো, রোগী কিন্তু বলবে, সে ভালো। আসলে তার মাথায় গণ্ডগোল!
২
মানসিক হাসপাতালের কেয়ারটেকার ফারুক কাজীকে খাবার দিতে এসে ভয়ংকর বিপদে পড়েছে। খাবারের প্লেট তার হাতে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে খপ করে হাত ধরে ফেলেছে। কেয়ারটেকার রমিজ ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। সে মনে মনে ভাবে, পাগল লোকদের বিশ্বাস নেই। ভালো ভালো কথা বলবে; হঠাৎ এমন কাণ্ড ঘটাবে তা সে কল্পনাও করেনি। সে বেশি ভয় পাচ্ছে, পাগলটা যদি হাতে কামড় দিয়ে বসে! মানুষের কাপড় শিয়াল কুকুরের চেয়েও ভয়ংকর!
কেয়ারটেকারের কাঁপাকাঁপি দেখে ফারুক কাজী বুঝতে পেরেছে। তার ভয় কাটানোর জন্য সে বলে, ভাই আপনি মনে হয় ভয় পাইছেন! ভয় পাইয়েন না। আমি পাগল না। ওই শয়তানগুলো পাগলের মিথ্যা অপবাদ দিয়া আমারে নিয়া আসছে। আমি সত্যিই ভালো মানুষ। আমি গোপন রহস্য ফাঁক করে দেব বলে ওরা পাগলের অপবাদ দিছে।
কেয়ারটেকার ভয়মিশ্রিত কণ্ঠে বলে, আগে আমার হাতটা ছাড়েন ভাই!
তার আগে বলেন, আপনি আমার কথা বিশ্বাস করছেন?
হু ভাই করছি বিশ্বাস। এইবার হাতটা ছাড়েন।
ফারুক কাজী হাত ছাড়ার পর কেয়ারটেকার নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর বলল, সত্যিই আপনি পাগল না?
না ভাই। সত্যি আমি পাগল না।
যারা আপনাকে দিয়ে গেল ওরা কি হয় আপনার?
কেউ না। ওরা আমার ভুয়া ডাক্তার বন্ধুর স্টাফ।
মানে!
আমাদের গ্রামের ইনুচ মিয়া ঢাকায় আইস্যা হঠাৎ হইয়া গেল বড় ডাক্তার। বড়ই আশ্চর্যের বিষয়। ঢাকায় আইস্যা তার নাম বদলাইয়া গেল। এখন তার নাম ‘মির্জা গালিব’। বোঝেন অবস্থা! এই কাহিনি জীবনে কখনো হুনছেন?
আসলেই তো আশ্চর্যের বিষয়! কি নাম বললেন?
মির্জা গালিব। নাম শুনছেন কখনো? মেডিসিনের সবচেয়ে বড় ডাক্তার। ও ছিল গ্রামে ডাক্তারের সহকারী। সাত-আট বছরে সে ডাক্তার হইল কী কইরা? আমার মনে হয়, ও অন্য ডাক্তারের নামে ডাক্তারি চালাইতেছে।
আপনি এসব কী বলেন!
সত্যি কথা। সে আমার গ্রামের ছেলে। আমরা এক লগে পড়ছি। আমি গেছিলাম তার সঙ্গে দেখা করতে। ওমা! সে আমারে চিনলই না! আমি যখন তারে জেরা করতে শুরু করলাম, তখন সে আমারে পাগল হিসেবে আখ্যা দিল। স্টাফদের ডেকে বলল, আমাকে পাগলের হাসপাতালে ভর্তি করাতে।
তাহলে তো আপনাকে এখানে আটকে রাখা ঠিক না!
আমি একটা ভালো মানুষ। আমাকে কেন হাসপাতালে আটকে রাখবেন? আপনি বরং আমাকে একটা হেল্প করেন। আমি ওই ভুয়া ডাক্তারকে ধরিয়ে দিতে চাই। তা না হলে অনেক মানুষের সর্বনাশ হইয়া যাইব।
ঠিক বলেছেন। দাঁড়ান, আমি তালা খুলে দিচ্ছি।
ফারুক কাজী বলল, আমাকে বিশ্বাস হইছে তো?
হ্যাঁ ভাই বিশ্বাস হইছে।
কেয়ারটেকার রমিজ চাবি আনতে নিজের রুম গেল। চাবি এনে ফারুক কাজীর রুমের দরজা খুলে দিল। তারপর তাকে নিয়ে সে তার নিজের রুমে গেল। তাকে সে বলল, আমার র্যাবে এক বন্ধু আছে। তাকে বিষয়টা বলি। আপনি বসুন। খাবারটা খেয়ে নিন।
না ভাই, আমি খাবার খাব না। আমার এখন মাথা গরম।
কেয়ারটেকার রমিজ সতর্ক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকায়। ফারুক কাজী সঙ্গে সঙ্গে বলল, মাথা গরম মানে পাগলামি কিছু করব না। ভয় পাইয়েন না। আপনি দেখেন, আপনার র্যাবের বন্ধুকে বলে কিছু করা যায় কি না?
দেখছি দেখছি। আপনি শান্ত হয়ে বসুন। আপনার মাথা গরমের কথা শুনলে আমার ভয়ে অস্থির লাগে।
ফারুক কাজী চুপচাপ বসে থাকে। কেয়ারটেকার রমিজ তার বন্ধুকে ফোন করে। বেশ কয়েকবার চেষ্টার পর তাকে ফোনে পাওয়া যায়। তাকে সব ঘটনা সে খুলে বলে। টেলিফোনের অপর প্রান্ত থেকে বলা হয়, তাকে নিয়ে র্যাব সদর দপ্তরে যেতে। ফোন রেখে রমিজ তাকে বলল, আচ্ছা আপনার ঘটনা তো উত্তরাতেই ঘটেছে?
হ্যাঁ।
ভুয়া ডাক্তার যাকে বলছেন উনিও তো উত্তরাতে বসে!
হ্যাঁ।
চলুন আমার সঙ্গে। আমার বন্ধু আপনাকে নিয়ে যেতে বলেছে। সে র্যাবের সদর দপ্তরে আছে। খুব ভালো লোক। তার কাছে দুই নম্বরী খাটে না।
তারা আর দেরি করল না। সঙ্গে সঙ্গে মিরপুর থেকে রওয়ানা দিল উত্তরার উদ্দেশে। তারা যাওয়ার পথে কথা বলে নিল, কে কী কথা বলবে, কে আগে শুরু করবে, কীভাবে শুরু করবে— এসব বিষয়। মিরপুর থেকে ফ্লাইওভার দিয়ে স্টাফ রোড হয়ে উত্তরার দিকে এগিয়ে যায় তারা। এই পথে যানজটে পড়তে হয়নি তাদের। অল্প সময়ের মধ্যেই পৌঁছে যায় র্যাব
হেডকোয়ার্টারে। রমিজের বন্ধু ক্যাপ্টেন জাফর। রিসিপশনে গিয়ে তার নাম বলতেই ভেতরে ডাকা হয় তাদেরকে। ক্যাপ্টেন জাফর প্রস্তুত হয়েই ছিল। রমিজরা আসামাত্র চা দেওয়া হলো তাদের সামনে। জাফর বলল, বলুন তো কী ঘটনা?
রমিজই শুরু করল। তারপর সে ফারুক কাজীকে বলার জন্য অনুরোধ করল। ফারুক কাজীও দ্রুত সব বিষয় ক্যাপ্টেনকে অবহিত করল। সে সবগুলো অভিযোগ তার ডায়েরিতে লিখল। তারপর সে সাদা কাগজ ফারুক কাজীর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, আপনি আপনার অভিযোগ লিখিতভাবে আমাদের জানান। আর থানায় একটা ডায়েরি করুন। তাহলে আমাদের জন্য কাজ করতে সুবিধা।
ফারুক কাজী তাই করল। র্যাব হেডকোয়ার্টার থেকে বেশি দূরে নয় উত্তরা থানা। তারা দুজন রিকশা নিয়ে উত্তরা থানায় গেল। সেখানে একটি সাধারণ ডায়েরি করল মির্জা গালিবের জাল-জালিয়াতির বিরুদ্ধে। তারপর আবার তারা ছুটে এলো র্যাব কার্যালয়ে। ডায়েরির কপির একটি ফটোকপি ক্যাপ্টেন জাফরকে দিল। কপি হাতে পেয়ে সে বলল, এবার আপনারা যেতে পারেন। দ্রুতই অ্যাকশন শুরু হবে।
র্যাব অফিস থেকে বের হয়ে প্রধান সড়কের পাশে এসে দাঁড়াল ফারুক কাজী ও রমিজ। ফারুক কাজীকে সহায়তার জন্য রমিজকে সে কৃতজ্ঞতা জানাল। রমিজ বলল, জাফর খুব সৎ অফিসার। দেখবেন, অ্যাকশন সময়মতো শুরু হয়ে যাবে।
সেটা হলেই ভালো। ফারুক কাজী বলল।
৩
পড়ন্ত বিকেল।
র্যাবের একটি গাড়ি এসে থামল মির্জা গালিবের চেম্বারের বিল্ডিংয়ের সামনে। ক্যাপ্টেন জাফর গাড়ি থেকে নামল। অন্যরা বসে রইল গাড়িতে। তরুণ অফিসার দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে মির্জা গালিবের চেম্বারের দিকে। র্যাব কর্মকর্তাকে দেখে গা ঢাকা দিতে শুরু করে ডাক্তার সাহেবের লোকজন। অপেক্ষমাণ রোগীরা উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
ক্যাপ্টেন জাফর মির্জা গালিবের রুমের সামনে গিয়ে এদিক-সেদিক তাকিয়ে দেখল তার স্টাফ কেউ আছে কি না? কাউকে না দেখে রুমের দরজায় টোকা দিল। তারপর সে ঢুকে পড়ল। র্যাবের অফিসারকে দেখে হকচকিয়ে গেল মির্জা গালিব। ডাক্তারের উদ্দেশে বলল, আপনার খুব নামডাক শুনেছি। আপনি কোথায় লেখাপড়া করেছেন?
মির্জা গালিব নিজের একটি ভিজিটিং কার্ড ক্যাপ্টেন জাফরের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, এই নিন আমার কার্ড। এখানে সব লেখা আছে।
র্যাব অফিসার মুড নিয়ে বলল, ওসব অনেক কিছুই লেখা থাকে। আমি আপনার কাছ থেকে শুনতে চাই।
ডিএমসিতে এমবিসিএস করেছি। তারপর লন্ডনে এমডি। জার্মানীতে এফআরসিএস।
বাব্বা! বলেন কী! আপনার বয়স কত এখন?
পঁয়ত্রিশ।
পঁয়ত্রিশ বছরে এতোগুলি ডিগ্রি নিয়ে ফেলেছেন। আপনি তো দেখছি বিস্ময়কর মেধাবি ডাক্তার। আপনার সার্টিফিকেটগুলো একটু দেখাবেন প্লিজ!
এ কথা শোনার পর মির্জা গালিবের মেজাজ চড়ে যায়। সে ঝাঝালো কণ্ঠে বলল, কেন, আপনাকে আমার সার্টিফিকেট দেখাতে হবে কেন?
আপনার ব্যাপারে অনেকগুলো অভিযোগ আমাদের কাছে এসেছে।
কী বলেন! এমন অভিযোগ কে করবে? আপনি বাইরে দেখেছেন, কত রোগী অপেক্ষা করছে?
তা ঠিক আছে। আপনি বড় ডাক্তার, আপনার কাছেই তো রোগীরা আসবে। সমস্যা হচ্ছে আপনার সনদ নিয়ে। আপনার গ্রামের একজন লোক আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়ার পর আমরা বিষয়টা তদন্ত করি। তাতে দেখা যায়, আপনি আরেকজন ডাক্তারের সনদ নিয়ে ডাক্তারি করছেন।
এসব আপনি কি বলেন? আপনাকে কেউ ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করেছে।
না। আমাকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করা অতো সহজ না। আমি নিজে তদন্ত করেছি। মির্জা গালিব আল হাসান আপনার আসল নাম না। আপনার নাম ইনুচ মিয়া।
বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন মির্জা গালিব। তার গলা শুকিয়ে কাঠ। কথা বলতে পারছেন না। জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছেন। তবু কথা বলতে গিয়ে জড়িয়ে যাচ্ছিল। তিনি বললেন, আ আমি এ এ এতো রোগী দে দে দেখছি। আ আ আমার সঙ্গে তি তিন চে চে চেম্বারে বারোজন ডা ডা ডাক্তার।
ওই বারোজন ডাক্তারই আপনাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। আপনি ডাক্তারির ড-ও জানেন না।
আ আ আপনি এইভাবে আ আ আমাকে অপমান ক ক করতে পারেন না।
অপমান! কোথায় আপনাকে অপমান করলাম?
এই যে আমার সা সা সার্টিফিকেট! এইগুলো দে দে দেখুন।
ওসব আমার দেখা শেষ। আপনি বলুন, ইনুচ মিয়া না? সত্যি করে বলেন। আপনি আট বছর আগে বড়জালিয়া গ্রামে ডাক্তারের কম্পাউন্ডারগিরি করছেন। করছেন না? আট বছরে আপনি কী করে ডাক্তার হলেন? এবার মির্জা গালিবের ফিরিস্তি বলব?
ডাক্তার সাহেব দেরি না করে ক্যাপ্টেন জাফরের পা ধরে বসলো। ক্যাপ্টেন সোজা হয়ে বলল, প্লিজ এসব করবেন না। আমি এসব পছন্দ করি না। উঠে দাঁড়ান। ডাক্তার পা না ছেড়ে বলতে শুরু করল, স্যার আমি চির জীবনের জন্য এই কাজ ছাইড়া দিমু। আমাকে শেষবারের জন্য একটা সুযোগ দেন।
সরি, আপনি যে অন্যায় করেছেন তার কোনো ক্ষমা নেই। আদালত যদি ক্ষমা করে তাহলে করতে পারে। আমি আইনের লোক। আমার দায়িত্ব হচ্ছে আপনাকে আইনের মুখোমুখি করানো। চলুন আমার সঙ্গে।
ইনুচ মিয়া কাঁদছে। তার কান্না কিছুতেই থামছে না। এর মধ্যেই অসংখ্য রোগী তার রুমের সামনে জড়ো হয়েছে। তারা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ডাক্তারের সব দুই নম্বরি জেনে গেছে। র্যাবের ক্যাপ্টেন যখন তাকে নিয়ে বাইরে বের হচ্ছিল তখন উপস্থিত রোগীরা চিৎকার চেঁচামেচি করে ডাক্তারকে ছিনিয়ে নিতে চাচ্ছিল। তারা বলছিল, ভুয়া ডাক্তারকে আমাদের হাতে ছেড়ে দেন। তার বিচার আমরাই করব।
ক্যাপ্টেন জাফর দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, আপনারা বিচার করবেন মানে! আপনারা বিচার করার কে? আমি কি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ? তাহলে মব সৃষ্টি করবেন কেন? ওসব চলবে না।
এর মধ্যেই গাড়ি অপেক্ষমাণ র্যাবের সদস্যরা এগিয়ে গেল ডাক্তারের চেম্বারের কাছে। তারা ডাক্তার গালিবরূপী ইনুচ মিয়াকে নিয়ে গাড়িতে তুলল। ইনুচ মিয়া মনে মনে ফারুক কাজীকে গালাগাল দেয়। দাঁত কিড়মিড় করে বলে, ফারুক্যা; বাইচ্যা থাকলে তোরে আমি দেইখ্যা নিমু।
ঢাকা/তারা//
সাগরকন্যা কুয়াকাটায় ঈদ আনন্দ, হতাশ ব্যবসায়ীরা