ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার ক্ষয়ক্ষতি ৩ গুণ বেড়েছে
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন
ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের চিত্র দিন দিন আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। গত এক সপ্তাহে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ও আন্তর্জাতিক থিঙ্ক ট্যাঙ্কগুলোর প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, রণক্ষেত্রে রুশ বাহিনী অগ্রযাত্রা যেমন থমকে গেছে, তেমনি নজিরবিহীন হারে বাড়ছে তাদের সেনা ও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি। খবর আল-জাজিরার।
মার্কিন ডিফেন্স এজেন্সি জানিয়েছে, পূর্বের দখলকৃত বেশ কিছু অঞ্চল ইতিমধ্যেই হাতছাড়া হয়েছে ক্রেমলিনের।
ওয়াশিংটন-ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার’-এর তথ্যমতে, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২৬ মে পর্যন্ত রাশিয়া মাত্র ১০৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পেরেছে। অথচ গত বছরের ঠিক একই সময়ে তারা দখল করেছিল ১ হাজার ৬১৯ বর্গকিলোমিটার।
সংস্থাটি আরো জানায়, রুশ বাহিনী আরো ৬২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকায় অনুপ্রবেশ করে লড়াই চালালেও সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দাবি করেছেন, চলতি বছরেই এ পর্যন্ত রাশিয়ার প্রায় ১ লাখ ৪৫ হাজার সেনা হতাহত হয়েছে। এর মধ্যে ৮৬ হাজার নিহত এবং ৫৯ হাজার গুরুতর আহত।
ইউক্রেন দাবি করেছে, প্রতিটি নিশ্চিত মৃত্যুর ড্রোন ভিডিও ফুটেজ তাদের কাছে রয়েছে।
আল-জাজিরা স্বাধীনভাবে কোনো পক্ষেরই হতাহতের এই দাবির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।
ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভ বলেন, “বর্তমানে প্রতি বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করতে গিয়ে রাশিয়ার ১৭৯ জন সেনা প্রাণ হারাচ্ছেন বা আহত হচ্ছেন, যা গত বছর ছিল মাত্র ৬৭ জন। তিন গুণ বেশি হারে এই বিপুল ক্ষয়ক্ষতি পূরণ করার মতো নতুন সেনা নিয়োগের সক্ষমতা রাশিয়ার নেই।”
পাশাপাশি রাশিয়ার পক্ষে এই যুদ্ধের খরচ চালানো দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। চলতি বছরের এপ্রিলের মধ্যেই ২০২৬ সালের পুরো বছরের জন্য নির্ধারিত বাজেট ঘাটতির সীমা পার করে ফেলেছে মস্কো। সংকুচিত হয়ে পড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও।
পরিস্থিতি সামাল দিতে নজিরবিহীন গতিতে নিজেদের স্বর্ণের মজুদ বিক্রি করছে ক্রেমলিন। রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরই তারা ৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ২৭.৯ টন স্বর্ণ বিক্রি করেছে। এর ফলে ২০২২ সালে যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার স্বর্ণের মজুদ এখন সর্বনিম্ন স্তরে এসে ঠেকেছে।
মার্কিন ডিফেন্স এজেন্সির মতে, ইউক্রেন যে ৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা পুনরুদ্ধার করতে পেরেছে, তার মূল কারণ হলো রাশিয়া লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ এবং পাল্টা আর্টিলারি হামলা জন্য ব্যবহৃত স্টারলিংক স্যাটেলাইট পরিষেবার অ্যাক্সেস হারিয়েছে।
এছাড়া ইউক্রেনের ‘লজিস্টিক্যাল লকডাউন’ নামক নতুন রণকৌশল এই পটপরিবর্তনে বড় ভূমিকা রাখছে। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ফেদোরভ জানান, ইউক্রেনীয় বাহিনী মধ্যম পাল্লার ড্রোন ও নিখুঁত আর্টিলারি হামলার মাধ্যমে রুশ রসদ সরবরাহের পথগুলো ধ্বংস করে দিচ্ছে। ফলে সম্মুখ সমরে নতুন সেনা ও অস্ত্র পৌঁছাতে পারছে না রাশিয়া।
রুশ গ্লাইড বোমার আক্রমণ ঠেকাতেও ইউক্রেনের প্রচেষ্টা বড় ধরনের গতি পেয়েছে। এই গ্লাইড বোমাগুলো ইউক্রেনের সম্মুখ সমরের অবস্থানগুলোকে ধ্বংস করে দিচ্ছিল। রাশিয়া সপ্তাহে প্রায় এ ধরনের তিন হাজার বোমা ফেলছে। তারা এই বোমাগুলোতে দিকনির্দেশনা সিস্টেম ও পাখা যুক্ত করেছে, যার ফলে এগুলো ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত যেতে পারে। এর সুবিধা নিয়ে রুশ যুদ্ধবিমানগুলো ইউক্রেনের বিমান বিধ্বংসী কামানের সীমার বাইরে থেকেই নিরাপদ দূরত্বে বোমাগুলো ছেড়ে দিতে পারছে।
তবে গত ২৮ মে রাশিয়ার ধ্বংসাত্মক ‘গ্লাইড বোমা’র আতঙ্ক রুখতে ইউক্রেনকে ১৬টি অত্যাধুনিক ‘গ্রিপেন’ যুদ্ধবিমান অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সুইডেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় ইউক্রেন আরো ২০টি গ্রিপেন বিমান কিনছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বলেন, “এই ধরনের বোমা ভূপাতিত করার মতো পর্যাপ্ত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আমাদের কখনোই ছিল না। তাই উপযুক্ত অস্ত্র, বিশেষ করে ২০০ কিলোমিটারের বেশি দূরের লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে সক্ষম ‘মিটিওর’ ক্ষেপণাস্ত্র সহ গ্রিপেন যুদ্ধবিমান আমাদের রুশ বিমানগুলোকে দূরে হটিয়ে দিতে সাহায্য করবে।”
একই সঙ্গে রাশিয়ার যুদ্ধ খরচের উৎস জ্বালানি অর্থনীতি ভেঙে দিতে কৃষ্ণ সাগরের রুশ তেল টার্মিনাল ও রাশিয়ার ভেতরের রাসায়নিক প্ল্যান্টগুলোতে দূরপাল্লার ড্রোন হামলা অব্যাহত রেখেছে ইউক্রেন।
গত ২৩ মে ইউক্রেন কৃষ্ণ সাগরের নভোরোসিস্কের একটি তেল ডিপো ও খালাস টার্মিনালে হামলা চালায়, এতে স্থাপনাটিতে আগুন ধরে যায় ও একটি রুশ ট্যাঙ্কার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর পরের দিন ইউক্রেন কৃষ্ণ সাগরের তামাননেফতেগাজ তেল টার্মিনালেও হামলা চালায়।
তাছাড়া বেশ কিছু সামরিক ও শিল্প কারখানাতেও হামলা চালানো হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে রাশিয়া থেকে ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটার ভেতরে পার্ম অঞ্চলের ‘মেটাফ্র্যাক্স কেমিক্যালস’ প্ল্যান্ট এবং রোস্তভের ‘তাগানরোগ বিমান ঘাঁটি’। ইউক্রেনীয় হামলায় সেখানে একটি বিমান মেরামত কারখানায় আগুন ধরে যায়।
অন্যদিকে রাশিয়া ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্রের যৌথ ও ব্যাপক আক্রমণের মাধ্যমে কিয়েভে হামলা চালানোর নিজস্ব বিমান কৌশল বজায় রেখেছে, যা ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখে।
অধিকৃত লুহানস্কের একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ইউক্রেনীয় হামলার প্রতিশোধ নিতে গত ২৪ মে কিয়েভের ওপর স্মরণকালের অন্যতম বড় বিমান হামলা চালায় রাশিয়া। ওই দিন ৬০০টি ড্রোন এবং ৯০টি ক্ষেপণাস্ত্র (যার মধ্যে ৩৬টি ব্যালিস্টিক) দিয়ে কিয়েভকে ঝাঁঝরা করার চেষ্টা করা হয়।
ইউক্রেন অধিকাংশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করলেও বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ ভবন এবং জাদুঘরে আঘাত হানে। এতে অন্তত ৮৭ জন আহত ও ২ জন নিহত হন।
এই হামলার পর রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে সতর্ক করে জানিয়েছেন, কিয়েভের সামরিক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কেন্দ্রগুলোতে রাশিয়ার এই ‘পদ্ধতিগত হামলা’ অব্যাহত থাকবে।
এছাড়া ইউক্রেনকে সহায়তাকারী ন্যাটো দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে মস্কো। একই সঙ্গে কিয়েভে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিক ও কূটনীতিকদের অবিলম্বে শহর ছাড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই হামলায় রাশিয়া তাদের সর্বাধুনিক মধ্যম পাল্লার ‘ওরশনিক’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে, যা ইতিমধ্যেই বেলারুশেও মোতায়েন করা হয়েছে।
ঢাকা/ফিরোজ
হামে আক্রান্ত-উপসর্গে আরো ৮ শিশুর মৃত্যু