ঢাকা     রোববার   ০৫ এপ্রিল ২০২৬ ||  চৈত্র ২২ ১৪৩২ || ১৬ শাওয়াল ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

যে সব দেশে হয়েছে যুদ্ধাপরাধের বিচার

দীপংকর গৌতম || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:৫৩, ২৮ অক্টোবর ২০১৫   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
যে সব দেশে হয়েছে যুদ্ধাপরাধের বিচার

অলংকরণ : অপূর্ব খন্দকার

দীপংকর গৌতম : মানব সভ্যতার ইতিহাসের সাথে  সমান্তরালভাবে চলছে যুদ্ধ-সংঘাত লড়াই। একদল আধিপত্য বিস্তার বা কোন অঞ্চল দখল নিয়ে যুদ্ধ করে আসছে। নিরন্তর এ যুদ্ধ। এর থেকে যেন নিস্কৃতি নেই। প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে যুদ্ধ। কখনো রাজায় রাজায়, কখনোবা রাজা সেনাপতি, চলে এ যুদ্ধ।

শুরু থেকেই যে লিখিত ইতিহাস তা মানব সভ্যতার এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে যুদ্ধের ইতিহাস। যুদ্ধ- এ এক বিভৎস খেলা। মানুষ যত আধুনিক হয়েছে সভ্যতা যত সামনে এগিয়েছে যুদ্ধাস্ত্র তত আধুনিক হয়েছে। প্রস্তর যুগ থেকে হাইড্রোজেন বোমার যুদ্ধ সবই সভ্যতার ইতিহাসের অংশ। প্রাচীনকাল থেকেই যুদ্ধের নিয়ম-নীতি ছিলো, সেগুলো অলিখিত হলেও মানা হতো। সবাই আলাপ আলোচনার ভিত্তিতেই এসব নিয়ম উল্লেখ করতো। কিন্তু সম্রাজ্য বিস্তার, ধর্মযুদ্ধ, গোত্রীয় যুদ্ধ, উপনিবেশ স্থাপনের যুদ্ধ- এসব জায়গায় কিছুই মানা হতো না। পরাজিতদের দাস বানিয়ে নেয়া হতো, তাদের স্ত্রী-কন্যাদের উপর চলতো যৌন নির্যাতন, ইচ্ছেমতো চলতো হত্যা খুন বিভৎসতা। এসব যে যুদ্ধাপরাধ তা প্রাথমিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৮৯৯ সালে ফিলিপাইন-আমেরিকান যুদ্ধের সময়ে শান্তিপূর্ণ সমাধানের উদ্দ্যেশ্যে হল্যান্ডে Hague Peace Conference - ১ এর আয়োজন করা হয়। সেখানে প্রথম বারের মত Laws of War crimes চিহ্নিত করে তা আন্তর্জাতিক আইন হিসেবে গ্রহণ করার জন্য প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। এখানে প্রথমবারের মত যুদ্ধাপরাধ ও আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের যে কনসেপ্টের সূচনা হয়েছিল তা দীর্ঘ সময়ের পরিক্রমায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সম্মতি, সম্মেলন, হেগ কনভেনশন ও জেনেভা কনভেনশনসমূহের মধ্য দিয়ে সংযোজন-বিশ্লেষণের মাধ্যমে পরিপক্কতা লাভ করে। ২য় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসী জার্মানী কর্তৃক লাখ লাখ নিরপরাধ মানুষ বিশেষ করে ইহুদী হত্যা ও জাপান কর্তৃক বেসামরিক জনসাধারণ হত্যা ও যুদ্ধবন্দিদের উপর অমানুষিক নির্যাতনের কারণে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়ে। এবং বহু দেশ একত্রিত হয়ে বিভিন্ন কনভেনশনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করে।

জেনেভা কনভেনশন: ১৯৪৯ সালের ১২ আগস্ট জেনেভায় বিশ্বের ৫৮টি দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এটি জেনেভা কনভেনশন নামে পরিচিত। এ কনভেনশন যুদ্ধ আইন, যুদ্ধবন্দি ও যুদ্ধাহত ব্যক্তিদের সাথে আচরণ, প্রভৃতির বিধির উপর ৪টি আন্তর্জাতিক চুক্তি ও ৩টি প্রটোকলের সমন্বয়ে গঠিত চুক্তিসমূহ। অর্থাৎ আগের ৩টি চুক্তির আপডেট করে, এর সাথে ৪ নম্বর চুক্তিটি যোগ করা হয়। তাই এটাকে 4th Geneva Convention বলা হয়। এসব চুক্তির মধ্যে সামরিক সংঘাত ও যুদ্ধকালীন বেসামরিক লোকের মৌলিক অধিকার ও প্রতিরক্ষার বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। সবগুলি বা প্রায় সবগুলি চুক্তি ও প্রটোকলে সম্মত হয়ে মোট ১৯৪টি দেশ জেনেভা কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে।

সময়ের সাথে পরিবর্তিত হচ্ছে রাজনৈতিক মূল্যবোধ, জাতিগত দ্বন্দ্ব, যুদ্ধের কৌশল, বিচ্ছিন্নতাবাদী লড়াই, মানবাধিকার লংঘন এবং যুদ্ধাপরাধের আচরণ। তাই কোন দেশ, জাতি, সামরিক বা বেসমরিক ব্যক্তি কর্তৃক যুদ্ধের প্রথা বা আন্তর্জাতিক নীতিমালা লংঘন করাই হল সংক্ষেপে যুদ্ধাপরাধ। যুদ্ধের নীতিমালা হল যুদ্ধ সংক্রান্ত ঐ সমস্ত আন্তর্জাতিক আইন যা জেনেভা কনভেনশনের মাধ্যমে বিশ্বের জাতিসমূহ গ্রহণ করতে সম্মত হয়েছে।

শুরু থেকেই যুদ্ধাপরাধের একটি স্থায়ী ট্রাইব্যুনাল স্থাপনের প্রস্তাব থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয় নি। ১৯৯০- এর দশকে প্রাক্তন যুগোশ্লাভিয়া ও রুয়ান্ডার গণহত্যা যখন ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে তখন স্থায়ী ট্রাইব্যুনাল স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা প্রকটভাবে দেখা দেয়। অবশেষে ১৯৯৮ সালের ১৭ জুলাই রোম সম্মেলনে একটি স্থায়ী International Criminal Court স্থাপনের সিদ্ধান্ত ও সংবিধি ১২০টি দেশের `হ্যাঁ` ও ৭টি দেশের `না` ভোটের ফলাফলের মধ্য দিয়ে গৃহীত হয়। "না" ভোট প্রদানকারী ৭টি দেশ হল যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইসরায়েল, ইরাক, লিবিয়া, কাতার এবং ইয়েমেন। রোম সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্ত ও বিধিবদ্ধ আইনকে Rome Statute বলা হয়। অবশেষে ২০০২ সালের ১লা জুলাই হেগে স্থায়ী জেনেভা কনভেনশন ও রোম স্ট্যাচ্যুট অনুসারে যুদ্ধাপরাধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ লিপিবদ্ধ করা হয়। সেই দিক বিবেচনা করেই সারা বিশ্বে চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

দুই.
বিশ্বের অনেক দেশে যুদ্ধের নামে চলেছে গণহত্যা ও ধর্ষণের মতো নৃশংস অপরাধ। সেসব দেশ মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য গঠন করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী অপরাধীদের বিচার হয়েছে বা বিচার চলছে- এমন অসংখ্য ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। এর মধ্যে এমন কিছু ট্রাইব্যুনাল রয়েছে যা বিশ্বে বিচার ব্যবস্থায় নজির সৃষ্টি করেছে। যেমন নুরেমবার্গ ট্রায়াল, টোকিও ট্রায়াল, যুগোশ্লাভিয়া গণহত্যা ট্রায়াল, রুয়ান্ডা গণহত্যা ট্রায়াল, খেমাররুজ গণহত্যা ট্রায়াল ইত্যাদি। এগুলোর মধ্য দিয়ে সারা বিশ্বের মানবতাবাদীরা জানান দিয়েছে যে, অত্যাচারী যেই হোক, একদিন তাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতেই হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির একনায়ক হিটলার সারা বিশ্বকে পদানত করতে চাইলেও আজ তাদের বিচারের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সদ্য প্রয়াত নোবেল বিজয়ী কবি গুণ্টার গ্রাস অল্পের জন্য ফেঁসে যাননি। নাৎসী বাহিনীর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের সুর উঠে গিয়েছিলো। অর্থাৎ মানবতাবিরোধী যেই হোক তাঁর রেহাই নেই।

ন্যুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল (জার্মানি)
ন্যুরেমবার্গ ট্রায়াল যাত্রা শুরু করে ১৯৪৫ সালের ১৮ অক্টোবর। এই ট্রাইব্যুনাল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মানব ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের জন্য ২ জন উচ্চ পদস্থ জার্মান সামরিক অফিসার এবং রাজনীতিবিদ, শিল্পপতি ও বিনিয়োগকারীদের বিচারের মুখোমুখি করে। ১৯৪৬ সালের ৩১ আগস্ট ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্যগ্রহণ, শুনানি ও আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন কাজ সমাপ্ত করা হয়। বিচারিক কার্য শেষ হওয়ার পর ১৯৪৬ সালের ১ অক্টোবর রায় দেয়া হয়। ২২ জনের মধ্যে ২ জনকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং ১ জনকে শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ করার দায়ে শাস্তি দেয়া হয়। বাকীদের শাস্তি দেয়া হয় যুদ্ধাপরাধ ও চার্টার বর্ণিত অন্যান্য অপরাধ করার জন্য। নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের রায়ে ১২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ৪ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ৩ জনকে অভিযোগ থেকে খালাস দেয়া হয়। বিচারকায এখনো শেষ হয়নি; যে কোনো সময়, এমনকি অপরাধীর মৃত্যুর পরও বিচার প্রক্রিয়া চলতে পারে বলে ট্রাইব্যুনালের তরফ থেকে জানানো হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধাপরাধ করেছে এমন ব্যক্তিদের বিচার এখনও হচ্ছে। সর্বশেষ ২০১০ সালের ২৩ মার্চ জার্মানির একটি কোর্ট সাবেক নাজি সদস্য হেইনরিখ বোয়েরকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন। শুধু তাই নয়, এখনও নাজি দালালদের খোঁজা হচ্ছে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য।

টোকিও যুদ্ধ অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (টোকিও)
টোকিও যুদ্ধ অপরাধ ট্রাইব্যুনালটি ২৯৪৬ সালের ২৯ এপ্রিল গঠন করা হয়। এ ট্রাইব্যুনালটি গঠনের প্রধানতম উদ্দেশ্য ছিল জাপান সাম্রাজ্যের নেতারা যে সব যুদ্ধাপরাধ করেছিল তার বিচারের জন্য এটি গঠন করা হয়। তবে এ ট্রাইব্যুনাল ৩টি ভাগে ভাগ করে নেয়া হয়। ১. যে সব অভিযুক্তরা যৌথ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাপ্রাপ্ত সংস্থার বিরুদ্ধে যুদ্ধ সংগঠনে সহায়তা করেছিল। ২. যে সব অভিযুক্তরা মানবতার বিরুদ্ধে নৃশংসতামূলক অপরাধ করেছিল। ৩. সেই সব অভিযুক্তদের যারা পরিকল্পনা কিংবা অনুমোদনে সহায়তা করেছিল বা অন্য কোনোভাবে এর সঙ্গে জড়িত ছিল। এই ট্রাইব্যুনালটি প্রথম ভাগে ২৮ জন জাপানি সামরিক ও রাজনৈতিকের বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য অভিযুক্ত করা হয়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাগে ৫ হাজার ৭ শত জাপানি নাগরিকের বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য অভিযুক্ত করে। পরবর্তী সময়ে ৫০৪ জনকে কারাদণ্ড, ১৪৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। জানা যায়, এই ট্রাইব্যুনালটি গঠনকালে নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের নীতি অনুসরণ করা হয়।

যুগোস্লাভিয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, নেদারল্যান্ডস
১৯৯৩ সালের ২৫ মে গঠন করা হয় যুগোস্লাভিয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। নেদারল্যান্ডসের হেগ নামক স্থানে ট্রাইব্যুনালটি গঠিত হয়। ১৯৯১ সাল থেকে যুগোস্লাভিয়ায় মানবিক আইন লঙ্ঘন, ১৯৪৯ সালে জেনেভা কনভেনশনের গুরুতর লঙ্ঘন, আইন এবং যুদ্ধের প্রথা লঙ্ঘন, মানবতা ও গণহত্যার মতো ঘটনা ঘটে। যার বিচারে এই ট্রাইব্যুনালটি গঠন করা হয়েছে। এই ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে ৯০০ কর্মকর্তা কর্মচারী কাজ করছেন। ২০১৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ১৬১ জন ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৪১ জনের বিচার কাজসম্পন্ন হয়েছে। এবং খালাস পেয়েছে ১৮ জন। এছাড়াও বর্তমানে ২০ অভিযুক্তের বিরুদ্ধে বিচারকাজ চলছে। ৪টি মামলা বিচারের শেষ পর্যায়ে। এবং ২৬টি মামলা আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে। জানা যায়, যুগোস্লাভিয়া ট্রাইব্যুনাল ২০০৪ সালে তাদের ৫টি অর্জনের তালিকা প্রকাশ করেন। এর মধ্যে রয়েছে ১. দায়মুক্তি থেকে জবাবদীহিতা সৃষ্টি, ২. ঘটনা প্রতিষ্ঠা, ৩. হাজারো ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার প্রদান এবং তাদের অধিকার নিশ্চিতকরণ, ৪. আন্তর্জাতিক আইনের যথাযথ প্রতিপালন, ৫. আইনের শাসন শক্তিশালীকরণ।

রুয়ান্ডার জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ( তানজানিয়া)
রুয়ান্ডার জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালটি ১৯৯৪ সালের ৮ নভেম্বর গঠন করা হয়। এই ট্রাইব্যুনালটি গঠনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল রুয়ান্ডা ও তার প্রতিবেশী রাজ্যের মধ্যে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন এবং গণহত্যার মতো অপরাধের বিচার করা।এই ট্রাইব্যুনালে এখন পর্যন্ত ৯৩ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তার মধ্যে ৬১ জনকে বিভিন্নভাবে সাজা দেয়া হয়েছে। ১৪ জনকে খালাস দিয়েছে। ১০ জনকে জাতীয় এখতিয়ারের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ৩ জন বিচার চলা অবস্থায় মারা গেছেন। ৩ জনকে এমআইসিতে পাঠানো হয়েছে। এবং ২ জনের বিরুদ্ধে মামলা তুলে নেয়া হয়েছে। এই ট্রাইব্যুনালে গণহত্যার সঙ্গে ধর্ষণকেও আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জানা যায়, ২০১৬ সালে এই ট্রাইব্যুনালটি বন্ধ করে দেয়া হবে। তবে বর্তমানে এই ট্রাইব্যুনালে একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা চলছে। এই মামলাটি শেষ হলেই ট্রাইব্যুনাল বন্ধ করে দেয়া হবে।

সিয়েরা লিওনের বিশেষ আদালত (এসসিএসএল):
হত্যা, দাসত্ব, নির্বাসন, নির্যাতন, ধর্ষণ, জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তিতে নামানো- এসব অমানবিক ঘটনা যারা ঘটিয়েছেন তাদের বিচারে ২০০২ সালের ১৬ জানুয়ারি গঠন করা হয় সিয়েরা লিওনের বিশেষ আদালত। এই আদালতটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ১৩১৫ নং রেজুলেশন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বিশেষ আদালতটি সিয়েরা লিওনের ফ্রিটাউন এ অবস্থিত। এই আদালতে ২২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। ২১ জনের বিচারসম্পন্ন করা হয়েছে। ৯ জন সাজা ভোগ করছে। ৭ জনের সাজা ভোগ শেষ হয়েছে। ২ জন খালাস পেয়েছে। এবং ৩ জন বিচার চলাকালে মারা গেছেন। এই আদালতে ২টি আদালত অবমাননার মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।

খেমাররুজ ট্রাইব্যুনাল (ইসিসিসি)
২০০১ সালে কম্বোডিয়ার খেমার রুজ ট্রাইব্যুনালটি ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি কর্তৃক বিশেষ আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠা করা হয়। যাতে ১৯৭৫-১৯৮৯ সাল পর্যন্ত কম্বোডিয়ার খোমাররুজের শাসনামলে তার জ্যেষ্ঠ নেতাদের দ্বারা যে সব মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তার বিচারে এই ট্রাইব্যুনালটি গঠন করা হয়। এই ট্রাইব্যুনালে এখন পর্যন্ত ১৪ জন অভিযুক্তের বিচার কাজ শেষ হয়েছে। তবে এই ট্রাইব্যুনালের বিস্তারিত কোনো তথ্য এখন ও পাওয়া যায়নি।

রোম-বিধি ও আন্তর্জাতিক আদালত:
স্থায়ী কার্যকর আন্তর্জাতিক আদালত গঠনের উদ্দেশ্যে ১৯৯৮ সালের জুলাই মাসে ‘রোম বিধি’ গৃহীত হয়। এর উদেশ্য ছিলো যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি, ব্যক্তিবর্গের বিচার আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় বিচারের মুখোমুখি করা।  প্রয়োজনীয় ৬০ রাষ্ট্রের অনুমোদনের পর ২০০২ সালের ১ জুলাই রোমবিধি কার্যকর হলে এর মধ্য দিয়ে ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত’ যাত্রা শুরু করে। এখন পর্যন্ত এ আদালত উগান্ডা, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক ও সুদানের দারফুর ঘটনার বিচার হাতে নেন। এখনও এসব দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম চলছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, বাংলাদেশ:
বাংলাদেশে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে এই আদালত গঠন করা হয়। যাতে আন্তর্জাতিক ল’ কমিশনের সাহায্য নেয়া হয়। ২০১০ সালের ২৫ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল একাত্তরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে যাত্রা শুরু করে। ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর থেকে এখন পর্যন্ত ১৭টি মামলায় ১৮ অভিযুক্তের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করা হয়েছে। ২ জনের রায় কার্যকর করা হয়েছে। ২ জন যুদ্ধাপরাধী সাজা ভোগরত অবস্থায় এবং ১ জন মামলা চলাকালীন অবস্থায় মারা যায়। ২টি মামলা রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে। বেশ কিছু মামলার কাজ চলমান রয়েছে।  বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সারা বিশ্বে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছে। শুধু তাই নয়, ট্রাইব্যুনাল গঠনের ৫ বছরের মধ্যে ১৭টি রায় হয়েছে। এতে বিশ্বে বাংলাদেশ নজির স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোয় যারা এমন বিচারের কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি, তাদের কাছে বাংলাদেশ একটি দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে অসাধ্য সাধন করেছে বলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ মন্তব্য করেছে। এই ট্রাইব্যুনাল সাজা প্রদানের পর সর্বোচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ রয়েছে। এতে কিছু সংশোধনী আইনও আনা হয়েছে।

তথ্যসূত্র:
১। Encyclopaedia Britannica
২। Wikipedia
৩। War in Human Civilization by Azar Gat
৪। ইন্টারনেট ও বিভিন্ন পত্রপত্রিকা
৫। UN - Children & Armed Conflict

 

 

 


রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৮ অক্টোবর ২০১৫/শাহনেওয়াজ

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়