রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু উপলব্ধি
শাহ মতিন টিপু || রাইজিংবিডি.কম
শান্তিনিকেতনে এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ
শাহ মতিন টিপু : এ কথা সবারই জানা পঁচিশে বৈশাখ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন। আর বাইশে শ্রাবণ তার মহাপ্রয়াণ দিবস। বাংলা ক্যালেন্ডারের দুটো মুখস্থ করা দিন। রবীন্দ্রনাথ বাঙালি ব্যক্তিমননে বিশেষ করে আবদ্ধ থাকেন এই দুটি দিনই। জন্মদিনের আড়ম্বর নিয়ে কবি নিজেই ১৩৪৩ সালে প্রবাসী পত্রিকায় লিখেছিলেন, ‘খ্যাতির কলবরমুখর প্রাঙ্গণে আমার জন্মদিনের যে আসন পাতা রয়েছে, সেখানে স্থান নিতে আমার মন যায় না। আজ আমার প্রয়োজন স্তব্ধতায় শান্তিতে।’ জন্মদিনেই কবি মৃত্যুচিন্তাকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন।
মৃত্যুকে রবীন্দ্রনাথ অনেকভাবেই তার লেখায় টেনে এনেছেন। হতে পারে এ চিন্তাটি তাকে গ্রাস করত বারবার অথবা লেখায় যেহেতু কোনো বিষয়ই বাদ পড়েনি, মৃত্যুটাইবা বাদ পড়বে কেন? তিনি তো দার্শনিক কবি। তিনি এ বিষয়টি তার লেখায় আনবেন না- তা কী হয়! যেমন, তিনি নৈবেদ্য কাব্যগ্রন্থে ‘মৃত্যু’ কবিতায় লিখেছেন- ‘মৃত্যু অজ্ঞাত মোর/ আজি তার তরে/ ক্ষণে ক্ষণে শিহরিয়া কাঁপিতেছি ডরে/ এত ভালোবাসি/ বলে হয়েছে প্রত্যয়/ মৃত্যুরে আমি ভালো/ বাসিব নিশ্চয়।’
কবির অকাল স্ত্রী-বিয়োগ এবং রবীন্দ্রনাথের ‘স্মরণ’ কাব্যগ্রন্থটি কবি স্ত্রীর মৃত্যুর অব্যাহত পরেই রচনা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তিজীবনে মৃত্যুকে বড় গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। মাত্র একচল্লিশ বছর বয়সে কবির স্ত্রী বিয়োগ হয়। কবি যখন দূরে থাকতেন স্ত্রী মৃণালিণী দেবীকে ‘ভাই ছুটি’ সম্বোধন করে চিঠি লিখতেন। কবির সেই ‘ছুটি’ যখন সংসার জীবন থেকে সত্যিই একদিন ছুটি নিয়ে চলে গেলেন, তার বয়স তখন মাত্র ঊনত্রিশ। তাদের উনিশ বছরের দাম্পত্য জীবনে পাঁচটি সন্তানের জনক হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাদের জীবনে একে একে এসেছে- বেলা, রথী, রানির, মীরা ও শমি। তবে ‘স্মরণ’ কবিতাগুলি পড়ে মনে হয়, স্ত্রী চলে যাওয়ার পরই কবি যেন নতুন করে মৃণালিনী দেবীকে আবিষ্কার করেছিলেন। কবি তার মিলন কবিতায় লেখেন- ‘মিলন সম্পূর্ণ আজি/ হল তোমা-সনে /এ বিচ্ছেদ বেদনার।’
রবীন্দ্রনাথ স্ত্রীর স্মৃতিতে ১৩০৯ সালের অঘ্রাণ মাসের বঙ্গদর্শন পত্রিকায় প্রতীক্ষা, শেষকথা, প্রার্থনা, আহ্বান, পরিচয় ও মিলন কবিতাগুলি লেখেন। মৃণালিনী দেবীর শেষ বেলার বিদায় মুহূর্তের কথা মনে করেই পরবর্তীতে কবি লেখেন- ‘দুজনের কথা দোঁহে/ শেষ করি লব /সে রাত্রে ঘটেনি/ হেন অবকাশ তব।’
‘শেষ কথা’ কবিতায় কবি লিখেছেন- ‘তখন নিশীথরাত্রি,/ গেলে ঘর হতে/ যে পথ চলেনি কভু,/ সে অজানা পথে /যাবার বেলায় কোনো/ বলিলে না কথা/ লইয়া গেলে না কোনো বিদায়বারতা।’
আবার প্রার্থনা কবিতায় স্ত্রী-হারা কবি লেখেন- ‘আজ শুধু এক প্রশ্ন/ মোর জাগে মনে/ হে-কল্যাণী, গেলে যদি, গেলে, মোর আগে,/ মোর লাগি কোথাও/ কী দুটি স্নিগ্ধ করে/ রাখিবে পাতিয়া শয্যা চিরসন্ধ্যা-তরে।’ স্ত্রী হারা অশ্রুসজল কবি আরো লেখেন- ‘মৃত্যুর নেপথ্যে হতে আরবার/ এলে তুমি ফিরে নতুন বধুর/ সাজে হৃদয়ের বিবাহমন্দিরে/ নিঃশব্দ চরণপাতে।’
এক পঁচিশে বৈশাখে শান্তিনিকেতন পাঁচটি চারারোপণ করে প্রথম বৃক্ষরোপণ উৎসবের আয়োজন করেন। উৎসবে উৎসবে শান্তিনিকেতনে অনেক বৃক্ষ রোপণ করেছিলেন কবি। বৃক্ষরোপণ নিয়ে লেখা একটি কবিতায়ও দেখতে পাই সেই অনাগত মৃত্যুচেতনার আভাস- ‘হে তরু, এ ধরাতলে/ রহিব না যবে/ সে দিন বসন্তে/ নব পল্লবে পল্লবে/ তোমার মর্মরধ্বনি/ পথিকেরে কবে/ ভালোবেসে ছিল কবি বেঁচেছিল যবে।’
কবির মৃত্যু উপলব্ধি যে অনেক আগেই তার আরেকটি উদাহরণ সম্ভবত ‘গীতাঞ্জলি’ এই কটি লাইন- ‘দিবস যদি সাঙ্গ হল/ না যদি গাহে পাখি/ ক্লান্ত বায়ু না যদি আর চলে/ এ বার তবে গভীর করে ফেলো গো মোরে ঢাকি।’
রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর সত্তর দশক পার হয়েও যেন মৃত্যুহীন অনন্ত জীবনের স্বাক্ষর বয়ে চলেছেন আজও। সেই ১৯৪০ সালের কথা। পুত্রবধূ প্রতিমাদেবী পাশেই আছেন। অসুস্থ শরীরেই কবি লেখার ঘরে কবিতার খাতা নিয়ে এসে বসলেন। মংপু থেকে মৈত্রেয়ী দেবীও কালিম্পং-এর বাড়িতে চলে আসাতে কবি তাকে খুশি হয়ে কয়েকটি কবিতা শোনালেন। দুপুরে শরীর খারাপের মাত্রা আরো বাড়ল। চেতনাও আচ্ছন্ন। কাউকে তেমন করে চিনতে পারছেন না। সেই ঘোরের মাঝেও রবীন্দ্রনাথ বলছেন, ‘আমার কী হল বল তো’।
প্রথম তিন চার দিন হাতের কাছে হোমিওপ্যাথি ঔষধ যা ছিল, তাই দিয়েই কোনো রকমে কবির চিকিৎসা চলছিল। অবশ্য তার চেতনা পরদিনই ফিরে এসেছিল। তিন জন চিকিৎসক নিয়ে কলকাতা থেকে কালিম্পং চলে এলেন শ্রী প্রশান্ত মহালনবিশ। রবীন্দ্রনাথের অসুস্থ অবস্থায় সবাই কলকাতায় জোড়াসাঁকোর বাড়িতে ফিরে এলেন। জোড়াসাঁকোর দোতলার পাথরের ঘরে তিনি অসুস্থ অবস্থায় কদিন কাটিয়ে কিছুটা সুস্থ হলেন।
জীবনের শেষ নববর্ষের সময় রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তার সাধের শান্তি নিকেতনে। সে দিন তার কলমে রচিত হয়েছিল ‘সভ্যতার সংকট’ নামের অমূল্য লেখাটি। তারও কদিন পর ১৯৪১ সালেরই ১৩ মে লিখে রাখলেন, রোগশয্যায় শুয়ে ‘আমারই জন্মদিন মাঝে আমি হারা’।
এই সময়গুলোতে রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত কাহিল, কখনো রোগশয্যায় আচ্ছন্ন। নিজে হাতে লেখার ক্ষমতাও তার আর নেই। তিনি তখন যন্ত্রণাকাতর অবস্থায় কখনো শুয়ে শুয়েই বলে যাচ্ছেন, আর তার মুখনির্সিত বাণী কবিতার ছন্দে লিখে রাখছেন রানী চন্দ। কবি কখনো রানী চন্দকে বলছেন লিখে রাখতে- ‘আমৃত্যু দুঃখের তপস্যা এ জীবন’।
কিশোর বয়সে বন্ধুপ্রতিম বৌদি কাদম্বরী দেবীর অকালমৃত্যু ও আরো পরে স্ত্রীর মৃত্যু এবং একে একে প্রিয়জনদের মৃত্যুর নীরব সাক্ষী ও মৃত্যু শোক রবীন্দ্রনাথের এক অনন্য অভিজ্ঞতা লাভে সহায়ক হয়েছিল। কবি জীবনস্মৃতিতে ‘মৃত্যু শোক’ পর্যায়ে অকপটে লেখেন, ‘জগৎকে সম্পূর্ণ করিয়া এবং সুন্দর করিয়া দেখিবার জন্য যে দূরত্ব প্রয়োজন, মৃত্যু দূরত্ব ঘটাইয়া দিয়াছিল। আমি নির্লিপ্ত হইয়া দাঁড়াইয়া মরণের বৃহৎ পটভূমিকার ওপর সংসারের ছবিটি দেখিলাম এবং জানিলাম, তাহা বড়ো মনোহর।’
মৃত্যুকালীন সময় পর্বে অর্থাৎ অসুস্থ অবস্থায় রচিত রবীন্দ্রনাথের বেশ কিছু কবিতা ছিল মৃত্যুচেতনাকে কেন্দ্র করে সৃজিত কিছু অবিস্মরণীয় পংক্তিমালা। ১. মরণের মুখে রেখে দূরে .যাও দূরে যাও চলে ২. মরণ বলে, আমি তোমায় জীবনতরী বাই ৩. আবার যদি ইচ্ছা করে আবার আসি ফিরে ৪. পেয়েছি ছুটি বিদায়/ দেহো ভাই/ সবারে আমি প্রণাম করে যাই/ ফিরায়ে দিনু ঘরের চাবি/ রাখি না আর ঘরের দাবি/ সবার আজি প্রসাদ বাণী চাই ৫. আবার যাবার বেলাতে সবাই জয়ধ্বনি কর ৬. জানি গো দিন যাবে/ এ দিন যাবে/ একদা কোনো বেলা শেষে/ মলিন রবি করুণ হেসে/ শেষ বিদায়ের চাওয়া/ আমার মুখের পানে চাবে।
মৃত্যুর মাত্র সাত দিন আগে পর্যন্তও কবি সৃষ্টিশীল ছিলেন। জোড়াসাঁকো রোগশয্যায় শুয়ে রানী চন্দকে লিখে নিতে বলেছিলেন। কবি বলে গেছেন, ক্রমশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন কবিতাটি বলতে বলতে। দিনটা ছিল কবির শেষ বিদায়ের দিন কয়েক আগে চৌদ্দ শ্রাবণ। রানী চন্দ সে দিন লিখেও নেন রবীন্দ্রনাথের শেষ লেখা কবিতাটি- ‘তোমার সৃষ্টির পথ/ রেখেছ আকীর্ণ করি/ বিচিত্র ছলনাজালে,/হে ছলনাময়ী।’
এর পর কবি তার পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীকেও চিঠি লিখতে বলেছিলেন। রানী চন্দ সেই চিঠি লিখে দেওয়ার পর কবি অশক্ত হাতে কাঁপা কাঁপা অক্ষরে সইও করে দিয়েছিলেন, ‘বাবামশাই’। প্রতিমাদেবী নিজেও সে সময় খানিক অসুস্থ ছিলেন। শান্তিনিকেতন থেকে অসুস্থ শরীরেই তিনি রবীন্দ্রনাথের কাছে এসেছিলেন। কবির শয্যার পাশে দাঁড়িয়ে কবির কানের কাছে মুখ এনে বলেছিলেন, ‘বাবামশাই, বাবামশাই, আমি এসেছি, আপনার মামণি। জল খাবেন?’ রবীন্দ্রনাথ খুবই অস্পষ্ট স্বরে পুত্রবধূকে করুণ ভাবে তখন বলেছিলেন, ‘ কী হবে কিছুই বুঝতে পারছি না।’
১৬ শ্রাবণ রবীন্দ্রনাথের হিক্কা শুরু হয়। কবি কাতর স্বরে তখন উপস্থিত সবাইকে বলেন, ‘একটা কিছু করো, দেখতে পাচ্ছো না কী রকম কষ্ট পাচ্ছি।’ পরের দিন হিক্কা থামানোর জন্য ময়ূরের পালক পুড়িয়ে খাওয়ানো হলেও তাতে কিছুমাত্র লাঘব হল না। ১৮ শ্রাবণ কিডনিও নিঃসাড় হয়ে পড়ল। ২১ শ্রাবণ রাখি পূর্ণিমার দিন কবিকে পূবদিকে মাথা করে শোয়ানো হল। পরদিন ২২ শ্রাবণ, ৭ আগস্ট রবীন্দ্রনাথের কানের কাছে মন্ত্র জপ করা হলো ব্রাহ্ম মন্ত্র- ‘শান্তম, শিবম, অদ্বৈতম..’, ‘তমসো মা জ্যোতির্গময়..।’ রবীন্দ্রনাথ তখন মৃত্যু পথযাত্রী। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির ঘড়িতে তখন বেলা ১২টা বেজে ১০ মিনিট।
কৃতজ্ঞতা : মধুছন্দা মিত্র ঘোষ ও আজকাল
রাইজিংবিডি/ঢাকা/৭ আগস্ট ২০১৫/টিপু/সাইফুল
রাইজিংবিডি.কম
হামে আক্রান্ত-উপসর্গে আরো ৮ শিশুর মৃত্যু