ঢাকা     সোমবার   ২৫ মে ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ১১ ১৪৩৩ || ৮ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

বিদেশি জাত টেক্কা দিয়ে সৌন্দর্য বনেদিয়ানা ধরে রেখেছে মিরকাদিমের গরু

কাজী আশরাফ  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:৫১, ২৪ মে ২০২৬   আপডেট: ১৮:৪৬, ২৪ মে ২০২৬
বিদেশি জাত টেক্কা দিয়ে সৌন্দর্য বনেদিয়ানা ধরে রেখেছে মিরকাদিমের গরু

রাজধানীর রহমতগঞ্জে কোরবানির হাটে মিরকাদিমের ধবল গরু

পবিত্র ঈদুল আজহা ঘিরে রাজধানীতে জমে উঠতে শুরু করেছে কোরবানির পশুর হাট। স্থায়ী-অস্থায়ী হাটগুলোতে কোথাও দেখা যাচ্ছে বিশালদেহী গরুর দাপট, কোথাও বিদেশি জাতের চাকচিক্য, কোথাও আবার মিলছে ঐতিহ্যবাহী কোরবানির পশুর দেখা। বিশেষ করে পুরান ঢাকার বনেদি পরিবারগুলোর চোখ এখনও খুঁজে বেড়ায় সৌন্দর্য, আভিজাত্য এবং প্রায় দুইশ বছরের ঐতিহ্যের প্রতি। বুড়িগঙ্গার ওপার থেকে ধলেশ্বরীর বাতাসে ভেসে আসা সেই শুভ্র ঐতিহ্যের নাম মিরকাদিমের ধবল গরু। কোরবানির পশু হিসেবে এই গরু এখনও অনেক পরিবারের প্রথম পছন্দ, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান নদীর মতো বয়ে চলেছে।

ধবধবে সাদা রঙের এই গরু পুরান ঢাকার বনেদিয়ানা, সামাজিক মর্যাদা ও পারিবারিক ঐতিহ্যের এক নীরব ঘোষণা। ঢাকার নবাবদের সময় থেকে শুরু হওয়া এই ঐতিহ্য আজও টিকে আছে রাজধানীর রহমতগঞ্জের কোরবানির হাটে। এবার ঈদেও সেই ঐতিহ্যের ধারক হয়ে মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিম থেকে ২০টি ধবল গরু নিয়ে রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস সোসাইটির হাটে এসেছেন খামারি মো. মিজানুর রহমান মাতুব্বর। হাট এখনো পুরোপুরি জমে না উঠলেও এরই মধ্যে তার সাতটি গরু বিক্রি হয়ে গেছে। 

মিজানুর রহমান মাতুব্বর বলেন, ‘‘এখন গরুর আসল দাম পাওয়া কঠিন। এর অন্যতম কারণ, গরুর খাদ্যের দাম বৃদ্ধি। এই গরু পালতে যে পরিমাণ পরিশ্রম ও অর্থ ব্যয় হয় তা তোলা খুব কষ্ট। এখন মাঝারি আকারের ধবল গরু তিন থেকে ছয় লাখ টাকায় বিক্রি হয়, আর বড় গরুর দাম ওঠে দশ লাখ পর্যন্ত।’’

মিরকাদিমের ধবল গরু কেন ব্যতিক্রম

মীরকাদিমের ধবল গরুকে এক নজর দেখলেই বোঝা যায় এরা সাধারণ গরুর মতো নয়। এদের শরীরের প্রতিটি অংশে যেন শুভ্রতার নিখুঁত ছাপ লেগে থাকে। চোখের পাপড়ি থেকে শুরু করে শিং, নাকের সামনের অংশ, এমনকি খুর পর্যন্ত ধবধবে সাদা। শরীরে অন্য কোনো রঙের ছোপ প্রায় দেখাই যায় না। সাদা চামড়ার নিচে হালকা গোলাপি আভা আর শান্ত স্বভাব এই গরুর বৈশিষ্ট্য। 

পুরান ঢাকার অনেক বনেদি পরিবার বিশ্বাস করে, কোরবানির ঈদে ঘরের সামনে ধবল গরু দাঁড়িয়ে থাকাটা শুধু ধর্মীয় আয়োজন নয়, বরং পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ। তাই ঈদের অনেক আগেই তারা মীরকাদিম গিয়ে পছন্দের গরু বায়না করে রাখেন বা রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস সোসাইটির হাটে থেকে গরু সংগ্রহ করেন।

দুইশো বছরের ইতিহাস 

ইতিহাস ঘাটলে জানা যায়, ব্রিটিশ আমল থেকেই মীরকাদিমের ধবল গরুর পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে পুরান ঢাকায়। সে সময় ধলেশ্বরী ও ইছামতি নদীপথ ধরে চাল, ডাল ও তেলের ব্যবসার জন্য ব্যবসায়ীরা মুন্সীগঞ্জ যেতেন। সেখানে স্থানীয় চরে ঘুরে বেড়ানো ধবধবে সাদা গরু তাদের নজর কাড়ে।

জানা যায়, মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিমের ধবল গরুর বিশেষ চাহিদা থাকায় ১৯৩৩ সাল থেকে পুরান ঢাকায় গণি মিয়া হাট কর্তৃপক্ষ হাটের সামনে মুন্সীগঞ্জের খামারিদের জন্য স্থান রাখতেন। এভাবে ধীরে ধীরে ধবল গরু হয়ে ওঠে পুরান ঢাকার অভিজাত মুসলিম পরিবারগুলোর কোরবানির প্রথম পছন্দ। রহমতগঞ্জের বিখ্যাত ‘গনি মিয়ার হাট’ ছিল সেই ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দু। সময় বদলেছে, হাটের চেহারা বদলেছে, কিন্তু ধবল গরুর কদর কমেনি। বরং এখন হাটে ওঠার আগেই খামার থেকে বিক্রি হয়ে যায় অধিকাংশ গরু।

ধবল গরুর অনন্য স্বাদের রসায়ন

খামারিদের ভাষ্য, মীরকাদিমের ধবল গরুর আসল রহস্য লুকিয়ে আছে এর খাদ্যতালিকা ও পরিচর্যায়। সাধারণ গরুর মতো এদের সবুজ ঘাসের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা হয় না। বরং খাওয়ানো হয় বাছাই করা খইল, বুট, খেসারি, গম, মসুর ডালের ভুসি ও বিশেষভাবে চূর্ণ করা ভুট্টা।

মুন্সীগঞ্জের খামারি মো. মাজেদ মাতুব্বর বলেন, ‘‘এই গরু পালন শুধু ব্যবসা না, এটা আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য। খাবার থেকে শুরু করে গোসল, ঘুম সবকিছুর আলাদা নিয়ম আছে। এই গরু পালতে একজন রাখালের অনেক পরিশ্রম করতে হয়। এর মাংসের অন্যতম স্বাদ হলো আঁশ কম থাকে।  নরম সুস্বাদু।’’

আরেক খামারি মো. সেলিম মাউন বলেন, ‘‘মিরকাদিমের ধবল গরুর যত্ন নিতে হয় সন্তানের মতো। সামান্য অবহেলাতেও এর রঙ ও স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে যায়। আমরা রুটিন অনুযায়ী এই গরুর পরিচর্যা করি। তবে এখন গো খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো লাভ থাকে না।’’

রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস সোসাইটির হাটে ধবল গরু বিক্রি করছেন রাখাল দুদু মিয়া। তিনি বলেন, ‘‘ধবল গরুর শরীরে দাগ পড়ে গেলে তার সৌন্দর্য কমে যায়। তাই আমরা সবসময় খুব সতর্ক থাকি। এবং এর খাবারের এদিক সেদিক হলে সমস্যা হয়। তবে এরা খুবই শান্ত প্রকৃতির।’’

‘‘প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় গোসল করাতে হয় এই গরুকে। শরীর পরিষ্কার রাখতে আলাদা কাপড় লাগে। রোদ-বৃষ্টি থেকেও খুব সাবধানে রাখতে হয়। আর খাবার দিতে হয় নিয়ম মেনে,’’ বলেন আরেক রাখাল উমর ফারুক। 

খামারিদের দাবি, বিশেষ খাদ্যাভ্যাসের কারণেই এই গরুর মাংস হয় তুলনামূলক নরম, তেলতেলে ও কম আঁশযুক্ত। আর সেই স্বাদই ধবল গরুকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে।

হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যের লড়াই

একসময় মিরকাদিমের বিস্তীর্ণ এলাকায় ধবল গরুর খামার ছিল। এখন সেই সংখ্যা কমে এসেছে আশঙ্কাজনকভাবে। বাড়তি খরচ, জায়গার সংকট ও আধুনিক বাণিজ্যিক খামারের প্রতিযোগিতায় অনেকেই এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারেননি। তবু মিরকাদিম পৌরসভার রামগোপালপুর ও এনায়েতনগরের কিছু পরিবার এখনো বংশপরম্পরায় ধবল গরু লালন-পালন করছেন। তাদের কাছে এটি শুধু অর্থ উপার্জনের মাধ্যম নয়; এটি ইতিহাস, ভালোবাসা ও আত্মপরিচয়ের অংশ।

মুসলিম ফ্রেন্ডস সোসাইটির হাটে মিরকাদিমের ধবল গরু বিক্রি করতে আসা খামারিরা জানান, প্রায় দুইশ বছরের পুরোনো নিজস্ব দেশীয় জাতের গরু বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের প্রণোদনা প্রয়োজন। 

পুরান ঢাকার সূত্রাপুরের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী হাজী আশরাফ উদ্দিন এবার ছোট ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন রহমতগঞ্জ হাটে মিরকাদিমের ধবল গরু দেখাতে। দীর্ঘক্ষণ ঘুরে একটি ধবধবে সাদা গরু পছন্দও করেছেন। হাজী আশরাফ উদ্দিন বলেন, ‘‘আমাদের ছোটবেলা থেকেই দেখেছি, ঈদের আগে পরিবারে একটা আলাদা উত্তেজনা কাজ করত কবে মিরকাদিমের ধবল গরু বাসায় আসবে। এখন আমি আমার ছেলেকেও সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। বাজারে অনেক বড় গরু আছে, কিন্তু এই ধবল গরুর মধ্যে যে রাজকীয় সৌন্দর্য আর বনেদিয়ানা আছে, সেটা অন্য কোথাও পাই না। তাই প্রতি বছর চেষ্টা করি পরিবারের নতুন প্রজন্মকে সঙ্গে নিয়ে এসে পছন্দের গরু কিনতে।”

পুরান ঢাকার চকবাজারের বাসিন্দা হাজী সোলাইমান খানও একই হাটে মিরকাদিমের গরু দেখছিলেন। তিনি বলেন, ‘‘আমি প্রায় প্রতিবছরই মিরকাদিমের গরু কোরবানি দেই। এর মাংসের স্বাদ আলাদা। মাংস নরম হয়, রান্নার পর একটা আলাদা ঘ্রাণ পাওয়া যায়। আজ মূলত দেখতে এসেছি। পরে পরিবারের সবাইকে নিয়ে আবার আসব। কারণ আমাদের বাসায় গরু পছন্দ করার বিষয়টা এক ধরনের পারিবারিক আয়োজন। সবাই মিলে দেখে, আলোচনা করে তারপর গরু নেওয়া হয়। ছোটবেলা থেকে এভাবেই দেখে আসছি।’’

তিনি আরো বলেন, ‘‘এখন বাজারে অনেক বিদেশি জাতের গরু এসেছে, কিন্তু ঐতিহ্যের জায়গা তো আর বদলায় না। মিরকাদিমের ধবল গরুর মধ্যে অভিজাত একটা ভাব আছে, যেটা পুরান ঢাকার মানুষ খুব ভালো বোঝে।’’

পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জের আরেক বাসিন্দা সৈয়দ আল-আমিন বলেন, ‘‘মিরকাদিমের গরু ছাড়া আমাদের কোরবানির আনন্দ পূর্ণ হয় না। আমরা প্রতিবছর দুটি গরু কোরবানি দেই। এর মধ্যে একটি অবশ্যই মিরকাদিমের ধবল গরু। এটা শুধু কোরবানি না, আমাদের পরিবারের বহু বছরের রেওয়াজ।’’

‘‘ধবল গরু বাসার সামনে আসার পর থেকেই ঈদের আমেজ অন্যরকম হয়ে যায়। আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশীরা দেখতে আসে। বাচ্চারাও খুব আনন্দ পায়। আসলে এই গরুর সঙ্গে পুরান ঢাকার মানুষের আবেগ জড়িয়ে আছে। তাই দাম একটু বেশি হলেও আমরা ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করি,’’ যোগ করেন তিনি। 

মিরকাদিমের ধবল গরু সম্পর্কে জানতে চাইলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য কর্মকর্তা (প্রাণিসম্পদ) ডা. মনিরুজ্জামান তরফদার বলেন, ‘‘বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী প্রায় দুইশ বছরের ব্রিডের নাম মিরকাদিম। এটা মুন্সিগঞ্জ জেলায় স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা হয় এবং এর কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। যেমন এর আকৃতি আর রং। আকৃতি হলো মাঝারি সাইজের এবং গায়ের রং সম্পূর্ণ সাদা। এর মাংসের বিশেষত্ব হলো স্বাদ। আর যদি উৎপাদনশীলতার কথা বলি তাহলে একটা গরু প্রায় তার জীবনকালে ১৪ থেকে ১৬টা পর্যন্ত বাচ্চা দিতে পারে। ধবল গরু এখন শুধু পুরান ঢাকার মানুষ না, দেশের মানুষের মধ্যেও চাহিদা তৈরি করেছে।’’ 

‘‘বাংলাদেশ সরকারের প্রাণিসম্পদ দপ্তরের যে প্রজেক্ট রয়েছে তার মধ্যে জাত সংরক্ষণ একটা প্রকল্প আছে। সেটার মাধ্যমে এই জাত সংরক্ষণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে,’’ বলেও জানান তিনি। 

ঢাকা/তারা//

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়