‘বাড়ি গেলে তো খালি হাতে যাওয়া যায় না, বোঝেন নাই?’
কাজী আশরাফ || রাইজিংবিডি.কম
ঈদের ছুটিতে প্রায় ফাঁকা রাস্তায় বাস নিয়ে বেরিয়েছেন সজীব হাসান
দেশজুড়ে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে, উৎসবে-আনন্দে পালিত হচ্ছে পবিত্র ঈদুল আজহা। প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে কোটি মানুষ ঢাকা ছেড়েছেন নাড়ির টানে। কিন্তু এই উৎসবমুখর সময়ে রাজধানীতেই এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের জীবনে ঈদের আনন্দ অধরা। বুকচাপা কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকার নির্মম লড়াই করতে তাদের প্রতিদিনই ঘাম ঝড়াতে হয়।
আজ বৃহস্পতিবার ঈদুল আজহার দিন সকালে রাজধানীর বিভিন্ন রুটের গণপরিবহন চালক ও রিকশা চালকদের সঙ্গে কথা বলে এমনটাই জানা গেছে। ইট-পাথরের এই শহরে তাদের জীবনে ঈদ বাড়তি কোনো আনন্দ যোগ করে না। ‘ছুটি’ মেলে না কর্মজীবনে। প্রতিদিনের রোজগারে চলে প্রতিদিনের জীবন। অথবা ঋণে চাপা পড়েছে জীবনের বাকি আনন্দ। তারা আরেকটু বেশি রোজগারের আশায় ঘর থেকে বের হন প্রতিদিনের মতো।
রাজধানীর ধানমন্ডি ২৭ নাম্বারে যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করছিলেন রিকশাচালক ওমর ফারুক। আজকে তার থাকার কথা ছিল শেরপুরে গ্রামের বাড়িতে। সেখানে ছোট ছোট দুটি ছেলে, একটি মেয়ে এবং স্ত্রীর সঙ্গে তার ঈদের আনন্দ উপভোগ করার কথা ছিল।
বাড়ি যাননি কেন? জিজ্ঞেস করতেই ওমর ফারুকের চোখ দুটো টলমল করে ওঠে। গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসা কান্না চেপে যান। সামলে নিয়ে বলেন, ‘‘বাড়িতে আমার দুইটা ছোট ছেলে আর একটা মেয়ে পথ চেয়ে আছে— বাবা আসবে, একসঙ্গে ঈদ করবে। কিন্তু আমি যাইতে পারি নাই।’’
ঈদের ঠিক পনেরো দিন পর একটা বড় কিস্তির টাকা শোধ করতে হবে ওমর ফারুকের। ঋণের যাতাকলে চক্রবৃদ্ধি হারে পিষ্ট হচ্ছেন তিনি। ‘‘টাকা না দিলে ওরা (এনজিও) আমারে বাঁচতে দিবো না,’’ বলতে বলতেই জানতে চাইলেন, কই যাইবেন?
বোঝা গেল ওমর ফারুকের তাড়া আছে। এই তাড়া অর্থ সংগ্রহের জন্য। ঈদের এ ক’দিন রিকশা চালিয়ে টাকা সংগ্রহ হলেই তার ছুটি মিলবে আপাতত। আর এ কারণেই বুকের ভেতর পাথর চেপে, কলিজার টুকরো সন্তানদের কান্না উপেক্ষা করে তিনি ঢাকায় রয়ে গেছেন। ফারুক বলেন, ‘‘বুকের ভেতরটা ফাইট্টা যায় যখন ছেলেমেয়ে ফোন করে কান্নাকাটি করে। কিস্তি পরিশোধের তারিখ ঈদের ১৫ দিন পর। তাই ভাবছি এই ১৫ দিন কষ্ট করে চলে টাকা জমিয়ে কিস্তি পরিশোধ করে দেব। কিস্তি আমার জীবন নষ্ট করে দিয়েছে। গরিবের ঈদ বলতে কিছু নাই ভাই, আমার ঈদ হইলো কিস্তি শোধের পর।’’
আরো কিছু জানার আগেই রিকশা ঘুরিয়ে চলে গেলেন ওমর ফারুক
কথা যখন বলছিলাম পাশে এসে দাঁড়াল একটি গণপরিবহন। চালক সজীব হাসান বাসের স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে বনে আছেন। উদাস চোখে দেখছেন আশপাশের সবাইকে। বাবার সঙ্গে ঈদের নামাজ পড়ে ফিরছে কোনো সন্তান। অথবা পরিবার নিয়ে কেউ উঠে পড়েছে তারই বাসে। সবাই উৎফুল্ল। প্রত্যেকের চোখেমুখে খুশির ঝিলিক।
সজীব হাসানের বাড়ি বরিশালের পটুয়াখালী। ঈদের ছুটিতে প্রায় ফাঁকা রাস্তায় তিনি বাস নিয়ে বেরিয়েছেন। বাড়ির কথা জিজ্ঞেস করতেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘‘টাকা নাই ভাই, পকেট শূন্য। শূন্য পকেট নিয়া বাড়ি যামু কেমনে? মা বারবার ফোন দিয়ে বাড়ি যেতে বলছে। বাড়ি গেলে তো খালি হাতে যাওয়া যায় না। বোঝেন নাই?’’
সজীব জানান, সারাদিন গাড়ি চালিয়ে যা পান, তার সিংহভাগ চলে যায় মালিকের জমা আর তেল খরচে। অবশিষ্ট যা থাকে, তা দিয়ে ঢাকায় নিজের থাকা-খাওয়াই চলে না, বাড়িতে টাকা পাঠাবেন কী করে? তিনি বলেন, ‘‘আজকের দিনে সবার ঘরে আনন্দ, আর আমার মা হয়তো আমার কথা ভেবে কষ্ট পাচ্ছে। কিন্তু আমার কষ্টের কথা বলার জায়গা নাই।’’
আরেক বাস চালক শিমুল মিয়া। গ্রামের বাড়ি রংপুর। তিনি বলেন, ‘‘একদিন গাড়ি না চালাইলে আমাদের ঘরে চাল কেনা হয় না, চুলায় আগুন জ্বলে না। আমরা হইলাম দিন আনি দিন খাই। আজকের দিনে সবাই কোরবানি দিতেছে, ভালোমন্দ খাইতেছে, আর আমরা রাজপথে ঘুরতেছি একবেলা ভাতের খোঁজে। আসলে গরিব মানুষের কোনো শখ-আহ্লাদ থাকতে নাই ভাই।’’
‘‘ঈদ তো তাদের জন্য, যাদের পকেটে টাকা আছে, যারা হাজার টাকা খরচ কইরা আনন্দ করতে পারে। আমাদের মতো মানুষের গাড়ি চালাইয়াই ঈদ কাটাতে হয়। রাস্তায় রাস্তায় যাত্রী তুলি, এদিক-ওদিক হইলে গালি খাই এই নিয়াই আমাগো ঈদ,’’ শিমুল মিয়ার কণ্ঠে একটু কি ক্ষোভ ঝরে পড়ে?
ঢাকা/তারা//
হামে আক্রান্ত-উপসর্গে আরো ৮ শিশুর মৃত্যু