নাসিরুদ্দিন হোজ্জার গল্পে হাস্যরস
কবীর আলমগীর || রাইজিংবিডি.কম
বুখারাতে নাসিরুদ্দিন হোজ্জার ভাস্কর্য
মধ্য এশিয়ায় কিংবদন্তি এক চরিত্র মোল্লা নাসিরুদ্দিন হোজ্জা। চরিত্রটির খ্যাতি ভারতবর্ষেও কম নয়। নাসিরুদ্দিন হোজ্জা নামে ইতিহাসে যে ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া যায়, তাঁর জন্ম তুরস্কের খোর্তো গ্রামে। সময়টা ত্রয়োদশ শতাব্দী। তাঁর কিংবদন্তি আর গল্পগুলো তুরস্কের বাইরে মূলত মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। এর বাইরে ইউরোপের গ্রিস, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া আর জার্মানিতেও প্রচলিত আছে। চীনেও তাঁর কিংবদন্তির চল আছে। উইঘুর মুসলমানদের দাবি—নাসিরুদ্দিনের জন্ম আর কর্মস্থল চীনদেশেই।
মধ্য এশিয়ার মোল্লা নাসিরুদ্দিন হোজ্জা পরিচিত নাসিরুদ্দিন এফেন্দি নামে। ‘এফেন্দি’ সম্মানসূচক পদবি, এই নামেই সমাজের জ্ঞানী ব্যক্তিদের অভিহিত করার রেওয়াজ ছিল মধ্য এশিয়ায়। তাঁর জীবন রহস্য উদঘাটন করা কষ্টসাধ্য, তবে এ কথা দৃঢ়ভাবেই বলা যায়, তাঁর জীবনের প্রতিটা ঘটনার সঙ্গে কোনো না কোনো রসিকতা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। সৈয়দ মুজতবা আলীও রসিকতা করে মোল্লা নাসিরুদ্দিনকে নিয়ে বলেছিলেন, ‘তার সম্পর্কে প্রচলিত দু’আনা পরিমাণ কিংবদন্তি বিশ্বাস করলে আমাদের কালিদাস সম্পর্কে প্রচলিত সব ক’টাই বিশ্বাস করতে হয়।’
মোল্লা নাসিরুদ্দিন হোজ্জা সম্পর্কে পাওয়া তথ্য থেকে জানা যায়, তিনি খুব জ্ঞানী ব্যক্তি ছিলেন, ধর্ম বিষয়ে উঁচু পণ্ডিত হওয়ার কারণে মানুষ তাঁর কাছে পরামর্শের জন্য আসত। জীবদ্দশায় মানুষকে তিনি শুধু পরামর্শ দিয়ে ক্ষান্ত হতেন না, একদম হাতে-কলমে কাউকে কাউকে শিক্ষা দিয়ে দিতেন। বাস্তব জীবনে অর্থ উপার্জনের জন্য তাঁর পেশা কী ছিল সে ব্যাপারে গবেষকরা সন্দিহান। তিনি সুফি সাধক ছিলেন বলেও ধারণা করেন অনেকে। তাঁর গল্পের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অনেক বাণী সুফিবাদ থেকে অনুপ্রাণিত বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। সমাজে প্রচলিত সত্যের প্রতি কটাক্ষ সেখানে উপস্থিত। এ কটাক্ষ সাধারণ দৃষ্টিতে হাস্যরসাত্মক মনে হলেও এর নিগূঢ় অর্থের সন্ধানে ব্যস্ত অনেকেই।
অনেকে বলেন, হোজ্জার জন্ম আধুনিক ইরানের পশ্চিম আজারবাইজান প্রদেশের ‘খোয়’ শহরে। এই মতবাদ অনুসারে, পেশায় তিনি ছিলেন বিচারক বা কাজি, এবং ইসলামের নানা নিগূঢ় তত্ত্বে তিনি ছিলেন বিরাট পণ্ডিত। নাসিরুদ্দিনের উপস্থিত বুদ্ধি ও বিজ্ঞতার খ্যাতি দেশ ও কালের সীমানা ছাড়িয়েছে, যদিও কোনো কোনো গল্পে তাঁকে পাওয়া যায় বোকা ও নেহাতই সাদাসিধে মানুষ হিসেবে। ফলে নাসিরুদ্দিন মহাবুদ্ধিমান না কি মহাবোকা ছিলেন তা নিয়ে জল্পনাকল্পনার শেষ নেই। তবে আসল ঘটনা যাই হোক, নাসিরুদ্দিনের গল্পগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষকে নির্মল আনন্দ জুগিয়ে আসছে।
প্রথমেই বলা যাক ভিনদেশি সেই হাসির রাজার কথা, যাঁকে আমরা চিনি নাসিরুদ্দিন হোজ্জা নামে। কিন্তু তাঁর একটা নাম নয়, নানা দেশে নানা নামে তিনি পরিচিত। কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তানে তিনি খোজা নাসির আলদীন; আফগানিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশজুড়ে মোল্লা নাসিরুদ্দিন হোজ্জা এবং আরবদের কাছে তিনি পরিচিত জোহা আল রুমি নামে। হোজ্জার জন্মস্থান ও জন্মসাল নিয়েও নানা কথা প্রচলিত। বিতর্কও আছে প্রচুুর। তুরস্কের একজন গবেষক দেখিয়েছেন, হোজ্জার জন্ম তুরস্কেই; ১২০৮ সালে। সেখানকার সিভরিহকার প্রদেশে। গ্রামের নাম হরতু। হোজ্জা সেই গ্রামেই লাভ করেন প্রাথমিক শিক্ষা। স্থানীয় কয়েকটি মাদ্রাসায়ও পড়াশোনা করেন। ১২৩৭ খ্রিষ্টাব্দে বাবার মৃত্যু হলে তিনি চলে আসেন আকশিরে। এখানে কাজির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। মাদ্রাসায় শিক্ষকতার দায়িত্বও পালন করেন একইসঙ্গে। তিনি কবি ও দার্শনিক মওলানা জালালুদ্দিন রুমির সমসাময়িক ছিলেন। রুমির সুফি মতবাদের তিনি ছিলেন গভীর অনুরাগী।
তুরস্ক এবং এর বাইরের দেশের অনেক পণ্ডিত ও গবেষকের অভিমত, হোজ্জার গল্পের সঙ্গে আরও অনেকের গল্প যোগ হয়। সেগুলো এখন প্রচলিত তাঁরই নামে। হোজ্জার এসব গল্প মুখে মুখেই প্রথমে প্রচলিত ছিল। গল্পের পাণ্ডুলিপির প্রথম সন্ধান পাওয়া যায় ১৪৮০ খ্রিষ্টাব্দে। হাস্যরসাত্মক আলাপেই মোল্লা নাসিরুদ্দিন বলে দিলেন, সত্য সময়ের সাথে বদলে যায়, একই কথা আজকে সত্য হলে কাল হয়তো মিথ্যা হয়ে যেতে পারে। তাই সময়ের সাথে আমাদের বদলে যেতে হয়, এটাই আমাদের ভবিতব্য।
হোজ্জার গল্পে প্রায়শই একটি পরিবার দেখা যায়, তাঁর পুত্র-কন্যার সন্ধান খুব একটা পাওয়া না গেলেও, স্ত্রীর সন্ধান পাওয়া যায় প্রায়শই। যেখানে তাঁর স্ত্রীকে বোকা বানিয়ে কিংবা কথার ফাঁদে আটকে ফেলে বেশ মজা নেন হোজ্জা। একবার হোজ্জা বাজার থেকে এক সের মাংস এনে স্ত্রীকে বললেন, কাবাব বানিয়ে দিতে। স্ত্রী কাবাব বানিয়ে হোজ্জা ফিরে আসার আগেই সব খেয়ে ফেললেন। হোজ্জা এসে মাংস চাইতেই স্ত্রী বললেন, বিড়াল খেয়ে ফেলেছে। হোজ্জাও কম যান না, বিড়াল ধরে দাঁড়িপাল্লায় মেপে দেখলেন, বিড়ালের ওজন এক সের। মাংসের ওজনও একসেরই ছিল। হোজ্জা এবার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, এই যদি বিড়াল হয় তবে মাংস কোথায়? আর এটাই যদি মাংস হয় তবে বিড়াল কোথায়?
আকশেহিরে উৎসবে নাসিরুদ্দিন হোজ্জা সেজে একজন ঘুরে বেড়াচ্ছেন
হোজ্জার গল্পকে মোটা দাগে তিনভাগে ভাগ করে থাকেন অনেকেই। প্রথম ধরনটি হলো, তিনি এখানে চালাকি করে অন্যকে বোকা বানাচ্ছেন। আরেক ধরনের গল্পে সাধারণ প্রশ্নের উত্তরে অদ্ভুত জবাব দিয়ে প্রতিপক্ষকে নিরস্ত্র করে দিয়েছেন। আর তৃতীয় ধরনের গল্পে তিনি বোকা সেজে বসে আছেন, যেন গল্প থেকে উঠে আসা মোল্লা নাসিরুদ্দিন পাঠককে জব্দ করে মজা নিচ্ছেন। হোজ্জার গল্পগুলো অনেকে মোটাদাগে তাই ‘স্যাটায়ার’ হিসেবেও মানেন। ঈশপের গল্পের মতোই গল্পগুলো দীর্ঘদিন মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়িয়েছে, কখনো নিজেদের মতো করে পরিবর্তন হয়েছে গল্পগুলো, অনেক ক্ষেত্রে বদলে গেছে মূলভাবও। তবে এই গল্পের মধ্যেই বেঁচে আছেন হোজ্জা।
তুরস্কে তাঁর সম্মানে হয়ে থাকে ‘আন্তর্জাতিক নাসিরুদ্দিন হোজ্জা উৎসব’। জুলাইয়ের পাঁচ থেকে দশ তারিখের মাঝে তুরস্কের আকশেহিরে এই উৎসব হয়। এই শহরেই নাসিরুদ্দিন হোজ্জার সমাধি অবস্থিত। সারাবিশ্ব থেকে হোজ্জা অনুরাগীরা সেখানে পাড়ি জমান, হোজ্জাকে স্মরণ করেন। সেই উৎসবে একজন প্রতীকী নাসিরুদ্দিন আকশেহিরে ঘুরে বেড়ান। হোজ্জার কাজকর্মের আলোচনা, ছবি আঁকার মাধ্যমে তাঁকে স্মরণ করা হয়। একবার হোজ্জার জন্মদিন পালনের সময় দীর্ঘদিন পরে তুরস্কের বুকে আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ঘটে, তো সৈয়দ মুজতবা আলী এ নিয়ে ‘চতুরঙ্গ’ বইয়ে মন্তব্য করেছিলেন, ‘তা হলে বোঝা গেল মা ধরণীর পাকা দুশো বছর লেগেছে হোজ্জার রসিকতার মর্ম গ্রহণ করতে; তাই বোধহয় হাসতে হাসতে তার নাড়িভুঁড়ি এখন ভূগর্ভ থেকে ছিঁড়ে বেরিয়েছে!’
জীবিত থাকাকালে মোল্লা নাসিরুদ্দিন হোজ্জা কতটুকু জনপ্রিয় ছিলেন সেই দলিল দস্তাবেজ নেই। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন আর কর্মের ব্যাপারে খুবই কম তথ্য গ্রন্থিত হয়েছে। তাঁর গল্প আর কিংবদন্তির কাছে সব ঢাকা পড়ে গেছে। এমনকি তাঁর গল্পগুলো সংকলন আর পরিমার্জন করে পাঠ্য আকারে বিভিন্ন দেশের পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নাসিরুদ্দিনের কিংবদন্তি বিশ্বের মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে ইউনেস্কো ১৯৯৬-৯৭ সালকে আন্তর্জাতিক নাসিরুদ্দিন বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করে।
মোল্লা নাসিরুদ্দিন হোজ্জার নামে যত অদ্ভুত গল্প ঘুরে বেড়ায় সেসবের সংকলন নিয়ে বেশ কয়েকটি বইও প্রকাশিত হয়েছে। ইদরিস শাহ The Pleasantries of the Incredible Mulla Nasrudin নামে একটি সংকলন প্রকাশ করেন ১৯৬৮ সালে। এই বই অনূদিত হয়েছে বিভিন্ন ভাষায়, পৌঁছে গেছে মানুষের হাতে হাতে। বাংলায় সত্যজিৎ রায়ও ‘মোল্লা নাসিরুদ্দিনের গল্প’ নামে হোজ্জার গল্পের একটি সংকলন বের করেছিলেন। নাসিরুদ্দিন থেকে অনুপ্রাণিত অনেক নাটক, সিনেমা আর চলচ্চিত্র আছে। তিনি পৃথিবীর জন্য অনন্য এক সম্পদ।
একদিন সকালবেলা গ্রামের লোকজন দেখলো, নাসিরুদ্দিন হোজ্জা গাধায় চড়ে যাচ্ছেন। তিনি তো প্রতিদিনই গাধার পিঠে চড়েন, তবে আজকে কেন সবাই তাকিয়ে আছে? কারণ নাসিরুদ্দিন গাধার পিঠে বসে আছেন ঠিকই, কিন্তু মুখটা উল্টোদিক করে বসা, লেজের দিকে। লোকজন হেসে বললো, ‘এই মোল্লা! তুমি উল্টো হয়ে চড়ে আছো কেন? পাগল হয়ে গেলে নাকি?’
নাসিরুদ্দিন এক চিলতে হাসি দিয়ে জবাবে বললেন, ‘আমি ঠিকই আছি। গাধাটাই ভুুল দিকে মুখ করে আছে।’ এই হলো নাসিরুদ্দিন হোজ্জা। তিনি জানান দেন, নিজেকে, সামষ্টিকভাবে নিজেদের চেনার পথটা কখনও কখনও সমাজের চোখে অদ্ভুত লাগে। প্রকৃত জ্ঞান কখনো অদ্ভুত এমন কাজের মধ্যেও অপেক্ষা করে। পেছনের জঞ্জাল সামনে থেকে দেখা যায় না। পেছন থেকে দেখে সামনের পথ মেরামত করতে হয়— গল্পের ভেতর এমন এক তাৎপর্যপূর্ণ অর্থ রয়েছে বলেই মোল্লার সেই অদ্ভুত ভঙ্গি আজও প্রাসঙ্গিক হয়ে সামনে আসে।
হোজ্জা মানুষটা ছোটখাটো, বেঁটে। মাথায় পরে পাগড়ি আর গায়ে চড়ায় জোব্বা। সার্বক্ষণিক সঙ্গী একটা গাধা। হোজ্জাকে নিয়ে হাজারেরও বেশি গল্প চালু আছে। কোনো গল্পে তাঁকে মনে হয় খুব বুদ্ধিমান একজন মানুষ। আবার কোনো গল্পে তাঁর আচরণ একেবারেই বোকার মতো হয়। তবে তিনি পরিচিত সূক্ষ্ম রসবোধের কারণে। তার নানা কথা আমাদের যেমন হাসায়, তেমনই ভাবায়ও বটে। তিনি আজ বিশ্বসাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
একসময় চিকিৎসক হিসেবে নাসিরুদ্দিনের বেশ সুনাম ছিল। একদিন গ্রামের জমিদার এলেন তাঁর কাছে। বললেন, ‘বড় মুটিয়ে যাচ্ছি, মেদ কমাতে চাই। একটু ওষুধ দাও।’ নাসিরুদ্দিন অনেকক্ষণ ধরে তাঁর দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘ওষুধ দেওয়া লাগবে না। আপনার দিন ফুরিয়ে এসেছে। দিন পনেরোর মধ্যেই আপনি মারা যাবেন।’ ভয়ে-ভাবনায় জমিদার টলতে টলতে বাড়ি ফিরে বিছানায় শুয়ে পড়লেন। খাবারে রুচি নেই। ঘুম আসে না। মোসাহেব-বন্ধুপরিবেষ্টিত আড্ডা তাঁর ভালো লাগে না। এভাবে মৃত্যুচিন্তায় তাঁর দেহ শুকিয়ে যেন কাঠ। পনেরো দিন কাটিয়ে তিনি নাসিরুদ্দিনকে ভর্ৎসনা করে বললেন, ‘কী হে, গণকঠাকুর! পনেরো দিন তো পার হলো। আমি তো দিব্যি তোমার সামনে দাঁড়িয়ে।’ নাসিরুদ্দিন বললেন, ‘রাগ করবেন না হুজুর। রোগা হতে চেয়েছিলেন, রোগা করে দিয়েছি। এখন চিকিৎসাবাবদ টাকাটা দিন।’
নাসিরুদ্দিন হোজ্জার ভাস্কর্য
নাসিরুদ্দিনের হাস্যরসের মূল উৎস হলো তাঁর চরিত্রের দ্বৈততা। কিছু গল্পে তিনি প্রখর বুদ্ধি, তীক্ষ্ম প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব এবং গভীর জীবন দর্শনের অধিকারী এক সুফি সাধক। আবার কিছু গল্পে তাঁকে দেখা যায় বোকা, সাদাসিধে এবং উদ্ভট আচরণকারী একজন সাধারণ গ্রাম্য মানুষ হিসেবে। এই ডরংব ঋড়ড়ষ বা ‘বিজ্ঞ মূর্খ’ আদিরূপটিই তাঁর চরিত্রে স্বতন্ত্র্য মাত্রা দিয়েছে। তাঁর আপাত বোকামি বা পাগলামির আড়ালে লুকিয়ে থাকে গভীর ব্যঙ্গ ও শ্লেষ, যা সমাজের ক্ষমতাধর ও ভণ্ড ব্যক্তিদের মুখোশ খুলে দেয়। এই দ্বৈততার কারণেই তাঁর হাস্যরস দর্শক বা পাঠককে ভাবতে বাধ্য করে।
নাসিরুদ্দিনের গল্পগুলোতে হাস্যরস বিভিন্ন রূপে প্রকাশ পেয়েছে। এর প্রধান কয়েকটি দিক নিচে আলোচনা করা হলো: নাসিরুদ্দিনের হাস্যরসের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো তাৎক্ষণিক বুদ্ধিদীপ্ত জবাব। তিনি প্রায়শই প্রতিকূল পরিস্থিতিকে নিজের অনুকূলে নিয়ে আসতেন কেবল কথার মারপ্যাঁচে। এর অন্যতম সেরা উদাহরণ হলো তাঁর মসজিদে ভাষণ দেওয়ার গল্পটি।
একবার গ্রামের লোকেরা নাসিরুদ্দিনকে অনুরোধ করলো মসজিদে ভাষণ দেওয়ার জন্য। তিনি মিম্বরে উঠে বললেন, ‘আমি আজ কী বিষয়ে বলবো, আপনারা কি তা জানেন?’ সমস্বরে সবাই উত্তর দিল, ‘না, আমরা জানি না।’ নাসিরুদ্দিন বললেন, ‘আপনারা যে বিষয়ে কিছুই জানেন না, সে বিষয়ে কথা বলে কী লাভ?’ এই বলে তিনি নেমে চলে গেলেন। পরের সপ্তাহে গ্রামবাসীরা আবার তাঁকে আমন্ত্রণ জানালো। এবারও তিনি একই প্রশ্ন করলেন। লোকেরা বুদ্ধি করে উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ, আমরা জানি।’
নাসিরুদ্দিন মুচকি হেসে বললেন, ‘আপনারা যখন সবই জানেন, তখন আমার আর নতুন করে কিছু বলার নেই।’ এই বলে তিনি চলে গেলেন। তৃতীয় সপ্তাহে লোকেরা সিদ্ধান্ত নিল, অর্ধেক ‘হ্যাঁ’ আর অর্ধেক ‘না’ বলবে। নাসিরুদ্দিন একই প্রশ্ন করলে তারা তাই করলো। তখন হোজ্জা বললেন, ‘খুব ভালো কথা। আপনারা যারা জানেন, তারা বাকিদের জানিয়ে দিন।’ এই বলে তিনি আবারও প্রস্থান করলেন। এই গল্পে নাসিরুদ্দিনের তীক্ষ্ম বুদ্ধি ও রসবোধ প্রকাশ পায়। তিনি একদিকে যেমন ভাষণ দেওয়ার মতো বিরক্তিকর কাজ এড়ালেন, তেমনই গ্রামবাসীদের নির্বুদ্ধিতাকে হাসির খোরাকে পরিণত করলেন।
আরেকটি বিখ্যাত গল্পে দেখা যায়, এক অহঙ্কারী রাজা শিকার করতে বেরিয়ে নাসিরুদ্দিনকে দেখে বলেছিলো, ‘লোকটা অপয়া। আজ শিকার পণ্ড হবে।’ কিন্তু সেদিন রাজার প্রচুর শিকার জুটেছিল। রাজা খুশি হয়ে নাসিরুদ্দিনের কাছে ক্ষমা চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনি আমাকে দেখে অনেক হরিণ মারলেন, আর আমি আপনাকে দেখে বিশ ঘা চাবুক খেলাম। বলুন তো, কে কার জন্য অপয়া?’ এই একটি বাক্যে তিনি ক্ষমতার অসারতা এবং সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে পরিস্থিতিকে তুলে ধরেছেন, যা হাস্যরসের মাধ্যমে এক তীব্র সমালোচনায় রূপান্তরিত হয়েছে।
নাসিরুদ্দিনের অনেক গল্পে এমন সব পরিস্থিতি তৈরি হয়, যা আপাতদৃষ্টিতে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন মনে হয়, কিন্তু এর গভীরে থাকে এক বিশেষ বার্তা। যেমন: হারানো চাবি খোঁজার গল্পটি। নাসিরুদ্দিনকে একবার তাঁর বাড়ির বাইরের রাস্তায় কিছু খুঁজতে দেখা গেল। এক প্রতিবেশী জিজ্ঞেস করলো, ‘মোল্লা সাহেব, কী খুঁজছেন?’ তিনি বললেন, ‘আমার ঘরের চাবি হারিয়ে গেছে।’ প্রতিবেশী অবাক হয়ে বললো, ‘চাবি হারিয়েছে ঘরে, আর আপনি খুঁজছেন রাস্তায়?’ নাসিরুদ্দিন শান্তভাবে জবাব দিলেন, ‘ঘরের ভেতরটা বড্ড অন্ধকার, তাই বাইরে আলোতে খুঁজছি।’
গল্পটি শুনে হাসি পেলেও এর অন্তর্নিহিত অর্থ গভীর। মানুষ প্রায়শই সমস্যার মূল উৎসে না গিয়ে সহজ বা সুবিধাজনক জায়গায় সমাধান খোঁজে, যদিও সেখানে সমাধান পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই থাকে না। নাসিরুদ্দিনের এই উদ্ভট আচরণ মানবচরিত্রের এই সাধারণ দুর্বলতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
নাসিরুদ্দিনের হাস্যরসের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে সামাজিক ও রাজনৈতিক ভণ্ডামি, শ্রেণিবৈষম্য এবং প্রশাসনিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে তীব্র কশাঘাত। একইভাবে, কাজি হিসেবে তাঁর বিচার করার গল্পটিও প্রশাসনিক দুর্বলতাকে তুলে ধরে। একবার এক মামলায় তিনি বাদীর বক্তব্য শুনে বললেন, ‘তোমার কথাই ঠিক।’ এরপর বিবাদীর বক্তব্য শুনে বললেন, ‘তোমার কথাও ঠিক।’ পর্দার আড়াল থেকে তাঁর স্ত্রী যখন বললেন, ‘দুজনের কথা কীভাবে ঠিক হয়?’, তিনি স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বিবি, তোমার কথাও ঠিক।’ এই গল্পটি সেই বিচার ব্যবস্থার প্রতি শ্লেষ, যা কোনো পক্ষকেই অসন্তুষ্ট করতে চায় না এবং ফলস্বরূপ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়।
নাসিরুদ্দিনের গল্পগুলো কেবল ক্ষমতাধরদেরই নয়, সাধারণ মানুষের লোভ, ঈর্ষা এবং বোকামির মতো দুর্বলতাগুলোকেও হাস্যরসের মাধ্যমে তুলে ধরে। ‘হাঁসের বন্ধুর বন্ধুর বন্ধু’ গল্পটি এর একটি চমৎকার উদাহরণ। নাসিরুদ্দিনের গল্পের ভাষা অত্যন্ত সরল এবং এর প্রেক্ষাপট দৈনন্দিন জীবন থেকে নেওয়া। যেমন: বাজার, বিচারালয়, প্রতিবেশী বা নিজের পরিবার। এই সরলতার কারণেই গল্পগুলো সহজেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারে। তাঁর হাস্যরস কোনো নির্দিষ্ট সংস্কৃতি বা সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের আচরণ, দুর্বলতা এবং সামাজিক অসঙ্গতি এসব চিরন্তন বিষয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হওয়ায় তাঁর গল্পগুলো আজও বিশ্বজুড়ে প্রাসঙ্গিক। গল্পগুলো যেন এক একটি আয়না, যা দিয়ে আমরা নিজেদের এবং আমাদের চারপাশের সমাজকে দেখে হাসি।
মোল্লা নাসিরুদ্দিন হোজ্জার গল্পগুলোতে হাস্যরস কেবল বিনোদনের উপকরণ নয়, এটি একটি শক্তিশালী সামাজিক অস্ত্র এবং জীবন দর্শনের বাহন। তিনি বুদ্ধিমত্তা, উদ্ভট যুক্তি এবং নির্ভীক ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের অসঙ্গতি, ভণ্ডামি ও অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। তাঁর হাস্যরস একইসঙ্গে নির্মল ও গভীর, যা পাঠককে হাসানোর পাশাপাশি ভাবতেও শেখায়।
নাসিরুদ্দিনের চরিত্র প্রমাণ করে, হাস্যরসের শক্তি তরবারির চেয়ে কম নয়। তিনি যুদ্ধ করেননি, বিপ্লবের ডাক দেননি, কিন্তু তাঁর ছোট ছোট গল্পগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের মনে চিন্তা ও চেতনার খোরাক জুগিয়ে আসছে। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে হাসিমুখে গ্রহণ করতে হয় এবং কীভাবে হাস্যরসের মাধ্যমে বড় বড় সত্যকে সহজভাবে প্রকাশ করা যায়। মোল্লা নাসিরুদ্দিন কেবল রসিক চরিত্র নন, তিনি লোক-দার্শনিক, যাঁর প্রজ্ঞার আলো আজও তাঁর অমর গল্পগুলোর হাসির আড়ালে দ্যুতি ছড়িয়ে যাচ্ছে।
ঢাকা/তারা//
হামে আক্রান্ত-উপসর্গে আরো ৮ শিশুর মৃত্যু