মমতার নির্বাচন পরিচালনাকারী তথ্য দপ্তরে ইডির হানা
কলকাতা ব্যুরো || রাইজিংবিডি.কম
আসন্ন ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের আগে দুর্নীতি ইস্যুতে ফের সরগরম ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য রাজনীতি। বৃহস্পতিবার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্বাচন পরিচালনাকারী আইটি দপ্তরে কয়লা পাচার সংক্রান্ত আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগে অভিযান পরিচালনা করেছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি। অভিযানকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা তার দলের নির্বাচনী প্রার্থী তালিকা ও দলীয় রণকৌশল চুরির অংশ দাবি করেছেন।
সম্প্রতি কয়লা পাচার কাণ্ডের পুরনো মামলায় তৎপর হয়ে উঠেছে ভারতের কেন্দ্রীয় আর্থিক তছরুপ সংক্রান্ত তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট। সেই মামলার তদন্তেই বৃহস্পতিবার সকালে আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে যান ইডি কর্মকর্তারা। সল্টলেকে সংস্থার অফিসেও তল্লাশি চালান তদন্তকারীরা।
বৃহস্পতিবার সকালে প্রথমে লাউডন স্ট্রিটে প্রতীকের বাড়িতে পৌঁছন তদন্তকারীরা। সেখানে তল্লাশি শুরু হওয়ার সাড়ে চার ঘণ্টার মধ্যে এই এলাকায় পৌঁছন কলকাতার পুলিশ কমিশনার। এর কিছুক্ষণ পরেই প্রতীকের বাড়িতে পৌঁছে যান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গাড়ি থেকে নেমে কিছুটা রাস্তা হেঁটেই বাড়ির ভিতর ঢুকে যান তিনি। কিছুক্ষণ পর একটি হার্ডডিস্ক ও একটি সবুজ একটি ফাইল নিয়ে বেরিয়ে আসেন তিনি। আর তার পরই গর্জে ওঠেন মমতা।
মমতার দাবি, “২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখেই পুরোনো মামলা নিয়ে তৎপর হয়ে উঠেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা যে ইডি আমার আইটি সেক্টরের অফিসে হানা দিয়েছে। ইনচার্জের অফিসে হানা দিয়ে দলের হার্ড ডিস্ক হাতিয়ে নিতে এসেছিল। দলের প্রার্থীতালিকা, দলের কৌশল এবং দলের পরিকল্পনা হাতাতে এসেছিল এরা। এই কি ইডি এবং অমিত শাহের ডিউটি? সবচেয়ে নোংরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, নটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। দেশ রক্ষা করতে পারে না, আর আমার দলের তথ্য হাতাতে এসেছে? আমি যদি বিজেপি-র পার্টি অফিসে তল্লাশি চালাই? তাহলে ফল কী হবে? একদিকে এসআইআর চলছে, বাংলার নাগরিকদের নাম মুছে দিচ্ছে। ২ কোটির বেশি মানুষ। দেড় কোটিকে ডাকা হয়েছে। কোনো নথি না চেয়েই মুছে দিচ্ছে। হোয়াটসঅ্যাপে চলছে। নির্বাচনের জন্য আমার দলের সব তথ্য সংগ্রহ করছে। আমি সব নিয়ে এসেছি দেখুন। প্রতীকের সঙ্গে কথা হয়েছে। আমার দলের ইনচার্জ ও। আমার দলের হার্ড ডিস্ক, ফোন নিচ্ছে। আমার আইটি অফিসেও গিয়েছে সল্টলেকে। আমি ওখানেও যাচ্ছি।”
কিছুক্ষণ পর ভারতীয় সময় বেলা ১২ টা ৪৪ মিনিট নাগাদ সেক্টর ফাইভে আইপ্যাক এর অফিসে পৌঁছানোর পর বেসমেন্ট দিয়ে লিফট ব্যবহার করে ১২ তলার অফিসে পৌঁছে যান মমতা। এরপর অভিযান চলাকালেই আইপ্যাকের অফিস থেকেও ফাইলের গোছা নিয়ে বেরিয়ে আসেন পুলিশকর্মীরা। তার পরে তা রাখা হয় মুখ্যমন্ত্রীর গাড়ির পিছনের আসনে। সেই গাড়িকে ঘিরে রাখে বিরাট পুলিশ বাহিনী।
এরপর দীর্ঘ চার ঘন্টার বেশি ওই অফিসেই অবস্থান করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
সন্ধ্যার দিকে আইপ্যাক এর অফিস থেকে বেরিয়ে আবারো গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন মমতা।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, “ভোর ৬টা থেকে এই অভিযান শুরু করা হয়, এমন সময়ে যখন অফিসে প্রায় কেউই ছিলেন না। ইলেকশন আর এসআইআর সংক্রান্ত আমাদের সমস্ত রাজনৈতিক ডেটা ওরা চুরি করেছে। এটা একটা অপরাধ। আইপ্যাক কোনো প্রাইভেট অর্গানাইজেশন নয়, এটা তৃণমূলের অথরাইজড টিম। সেই টিমের কাজ থেকে সব কাগজ ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। টেবিল ফাঁকা করে দিয়েছে। আবার নতুন করে সব করতে গেলে ইলেকশনই পেরিয়ে যাবে।”
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আমি মনে করি এটা একটা ক্রাইম। মার্ডার অফ ডেমোক্রেসি। আমাদের সব নির্বাচনী কাগজ চুরি করা হয়েছে।”
এরপরই সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে হুঁশিয়ারির সুরে বলেন, “আমি সৌজন্যতা দেখাব। কিন্তু এটা আমার দুর্বলতা ভাবলে ভুল করবেন। আমার সব আপনি লুট করবেন আর আমি কি চুপ করে বসে থাকব?”
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আইপ্যাকের অফিস থেকে কী কী নথি লুট হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনে ইডির বিরুদ্ধে এফআইআর করা হবে।”
অমিত শাহকে নিশানা করে বলেন, “হিম্মত থাকলে রাজনৈতিকভাবে লড়াই করুন। তা না করে ইডিকে দিয়ে আমাদের ভোটের স্ট্র্যাটেজি চুরি করছেন?”
বিজেপিকে 'ডাকাতের দল' আখ্যা দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন "বিজেপিই দেশের সবচেয়ে বড় ডাকাত।রাজনৈতিকভাবে লড়াই করার সাহস নেই, তাই ইডিকে দিয়ে আমাদের ভোটের স্ট্র্যাটেজি ছিনতাই করল। আমাদের সব কাগজ, তথ্য লুট করেছে।" যতক্ষণ তল্লাশি চলবে ততক্ষণ তিনি আইপ্যাকের অফিসের সামনেই বসে থাকবেন বলেও জানান মমতা।
ইডি সূত্রে জানা যায় বৃহস্পতিবার এই তদন্তকারী সংস্থা কয়লা পাচার মামলায় ১০ জায়গায় তল্লাশি অভিযান শুরু করে, তার মধ্যে ৬টি বাংলায়, বাকি চারটি দিল্লিতে। সংস্থার প্রসিডিওর অনুযায়ী কেন্দ্রীয় বাহিনীকে সঙ্গে নিয়েই ইডি এদিন অভিযান শুরু করে। তারপরেও তদন্ত চলাকালে খোদ মুখ্যমন্ত্রীর তদন্ত প্রক্রিয়ায় দেওয়ার এমন ঘটনা রীতিমত বিরল। আচমকা ওই অভিযানে আইপ্যাকের পুরো টিমই খানিকটা হতচকিত হয়ে পড়েছিল। ভোরে যখন অভিযান শুরু হয়, তখন স্বাভাবিক ভাবেই আইপ্যাকের দপ্তরে বিশেষ কেউ ছিলেন না।
আইপ্যাকের অফিসে তদন্ত ও তল্লাশি চলাকালে সাংবিধানিক পদ ব্যবহার করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তদন্ত প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্থ করা ও তথ্য প্রমান লুটপাটের অভিযোগে কলকাতা হাইকোর্টের মামলা দায়ের করেছে ইডি।
বৃহস্পতিবারই গোটা ঘটনা তুলে ধরে মামলা করার অনুমতি চেয়ে হাইকোর্টের বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ইডি। পাল্টা ইডির তল্লাশি অভিযানের বিরোধিতা করে হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয় আইপ্যাক কর্ণধার প্রতীক জৈনের পরিবারও। ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবন করে মামলার অনুমতি দেন বিচারপতি। শুক্রবার এই মামলার শুনানির হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
একইসঙ্গে দিনশেষে ইডি সমাজমাধ্যমেও একটি বিবৃতি জারি করেছে। তাতে বলা হয়েছে, “ইডির সদর দফতরের ইউনিট আর্থিক তছরুপ প্রতিরোধ আইনে বেআইনি কয়লা পাচার মামলায় ১০টি জায়গায় তল্লাশি চালাচ্ছে। অনুপ মাজি কয়লা পাচারের সিন্ডিকেট চালাতেন এবং পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গা থেকে চুরি করে বেআইনিভাবে কয়লা বাইরে পাঠাতেন। শান্তিপূর্ণভাবেই তল্লাশি অভিযান চলছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার প্রশাসনের আধিকারিক এবং পুলিশ কর্তাদের নিয়ে সেখানে চলে আসেন এবং জোর করে নথি, ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণ নিয়ে চলে যান।”
ইডি আরও জানিয়েছে, তাদের তল্লাশি অভিযান তথ্যপ্রমাণভিত্তিক এবং কোনো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে এর মাধ্যমে নিশানা করা হয়নি। কোনো পার্টি অফিসে তল্লাশি চালানো হয়নি। এই তল্লাশির সঙ্গে নির্বাচনের সম্পর্ক নেই। সাধারণ আর্থিক তছরুপ মামলার বিরুদ্ধে এই অভিযান ছিল। আইন মেনে তল্লাশি চলছে।”
সুচরিতা/শাহেদ