ঢাকা     শনিবার   ১০ জানুয়ারি ২০২৬ ||  পৌষ ২৬ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

বিশ্লেষণ

ইরানে খামেনির শাসন টিকবে তো?

রাসেল পারভেজ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০২:১৮, ১০ জানুয়ারি ২০২৬  
ইরানে খামেনির শাসন টিকবে তো?

নজিরবিহীন বিক্ষোভের মুখে পড়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।

ইরানের শিয়া ইসলামী আদর্শের বিপ্লবী সরকারের বিরুদ্ধে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভের আগুন। সেই আগুনে ঘি ঢালছে আন্তর্জাতিক চাপ। উভয় সংকেটর মুখে দেশটির ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠী ও সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এক গভীর বৈধতা সংকটে পড়েছেন। 

রাজধানী তেহরান থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) রাতে এসে ইরানের মোট ৩১টি প্রদেশের সবকটিতেই ছড়িয়ে পড়েছে। 

আরো পড়ুন:

পশ্চিমা বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার মতো রাজনৈতিক আস্থা কিংবা কার্যকর কৌশল- কোনোটাই এই মুহূর্তে শাসকদের হাতে নেই।

সাম্প্রতিক বিক্ষোভের সূচনা হয় তেহরানের ঐতিহ্যবাহী গ্র্যান্ড বাজারে। জাতীয় মুদ্রা রিয়ালের ব্যাপক দরপতনে ক্ষুব্ধ দোকানিরা প্রথমে রাস্তায় নামেন। অল্পসময়ের মধ্যেই তাদের সঙ্গে যোগ দেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, বিশেষ করে বেকার ও হতাশ তরুণরা। অর্থনৈতিক সংকট থেকে শুরু হওয়া এই ক্ষোভ দ্রুত রূপ নেয় রাজনৈতিক প্রতিবাদে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, এটি শুধু মুদ্রার পতন নয়, রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থার পতন।

তরুণদের নেতৃত্বে ইরানের ধর্মীয় শাসকদের বিরুদ্ধে নতুন মাত্রার আন্দোলনও বলা যায় একে। মাশা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ২০২২ সালে যে আন্দোলন হয়েছিল, সেখানে নারীদের উপস্থিতি ছিল মুখ্য। কিন্তু এবারের বিক্ষোভে তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয় তরুণ পুরুষ ও শিক্ষিত যুবসমাজ। এ পরিবর্তন আন্দোলনের চরিত্রকে আরো বিস্তৃত ও গভীর করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস সংবাদ সংস্থা এইচআরএএনএ-কে জানায়, চলমান সহিংসতায় এ পর্যন্ত অন্তত ৩৪ জন বিক্ষোভকারী এবং নিরাপত্তা বাহিনীর চার সদস্য নিহত হয়েছেন। গ্রেপ্তার হয়েছেন প্রায় ২ হাজার ২০০ জন।

ক্রমেই উত্তাল হয়ে ওঠা বিক্ষোভ ঠেকাতে বৃহস্পতিবার দেশব্যাপী ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ, যা শুক্রবার পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। এর মধ্যেই বিদেশ থেকে আন্দোলন জোরদারের আহ্বান জানান ইরানের শেষ শাহের ছেলে নির্বাসিত নেতা রেজা পাহলভি।

ওয়াশিংটনভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউট-এর ইরানবিষয়ক পরিচালক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা বলেন, “এটা কেবল রিয়ালের পতন নয়, এটা মানুষের বিশ্বাসের পতন।”

তার মতে, অতীতে দমন-পীড়ন ও সীমিত ছাড় দিয়ে ইসলামী প্রজাতন্ত্র টিকে থাকলেও এবার সেই কৌশল কার্যকারিতা হারাচ্ছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার একদিকে সংলাপের কথা বলছে, অন্যদিকে কঠোর দমননীতি চালাচ্ছে। কোথাও কাঁদানে গ্যাস, কোথাও ব্যাপক গ্রেপ্তার। আবার কখনো অর্থনৈতিক অসন্তোষকে ‘বৈধ’ বলে স্বীকারও করছে কর্তৃপক্ষ। তবে এই দ্বৈত নীতি আন্দোলনকারীদের শান্ত করতে পারছে না।

ইসলামি বিপ্লবের প্রায় পাঁচ দশক পর ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্বের অগ্রাধিকার ও তরুণ সমাজের প্রত্যাশার মধ্যে ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ৩০ বছরের নিচের বয়সি জনগোষ্ঠী দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। তারা বিপ্লবী স্লোগান নয়, স্বাভাবিক জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা চায়।

লোরেস্তান প্রদেশের কুহদাশতের ২৫ বছর বয়সি মিনা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, “আমি শুধু শান্ত একটা জীবন চাই। কিন্তু সরকার পারমাণবিক কর্মসূচি, বিদেশে সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন আর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শত্রুতাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ১৯৭৯ সালে এসব অর্থবহ ছিল, এখন নয়।”

হিজাব না পরায় মাশা আমিনির মৃত্যুর পর যে সামাজিক পরিবর্তন শুরু হয়েছিল, তা এখন প্রকাশ্য রূপ নিচ্ছে। বহু নারী প্রকাশ্যে হিজাব পরতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। একই সঙ্গে ইরানের আঞ্চলিক নীতির বিরুদ্ধেও স্লোগান উঠছে, ‘গাজা নয়, লেবানন নয়- আমার জীবন ইরানের জন্য।”

রয়টার্সের যাচাই করা ভিডিওতে মাশহাদে ইরানি পতাকা ছেঁড়ার দৃশ্য এবং বিভিন্ন শহরে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের চিত্র দেখা গেছে। কোথাও কোথাও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও প্রকাশ্য ক্ষোভ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

খামেনির ভবিষ্যৎ কতটা অনিশ্চিত?
বিশ্লেষকদের মতে, শাসনব্যবস্থার পতন এখনো নিশ্চিত নয়, তবে তা আর অসম্ভবও নয়। মধ্যপ্রাচ্যে সিরিয়া, লিবিয়া ও ইরাকের অভিজ্ঞতা বলছে- দীর্ঘস্থায়ী বিক্ষোভের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক চাপ যুক্ত হলে ক্ষমতার ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের হত্যার বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেন, নিরাপত্তা বাহিনী যদি গুলি চালায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র জোরদার হামলা চালাতে দ্বিধা করবে না।

ইরানের ইতিহাসে এটি আরেকটি সাধারণ বিক্ষোভ নয়। এটি অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজ ও আদর্শ- সবকিছুর বিরুদ্ধে জমে ওঠা ক্ষোভের বিস্ফোরণ। প্রশ্ন একটাই: এই চাপের মুখে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নেতৃত্বাধীন ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা কি আগের মতো টিকে থাকতে পারবে, নাকি ইরান নতুন এক পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে?

ঢাকা/রাসেল

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়