ইরানে খামেনিবিরোধী বিক্ষোভ চালাচ্ছে যেসব গোষ্ঠী
আন্তর্জাতিক ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম
ডিসেম্বরের শেষ দিকে নিত্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে ইরানে যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, তা এখন দেশটির ধর্মীয় শাসকদের বিরুদ্ধে একটি বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে রূপ নিয়েছে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকেই এই ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠী ইরান শাসন করে আসছে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে শতাধিক নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন। তবে বিরোধী কর্মীরা দাবি করছেন, নিহতের সংখ্যা আরো বেশি এবং এর মধ্যে বহু বিক্ষোভকারীও রয়েছেন।
আলজাজিরা লিখেছে, স্বাধীনভাবে তারা কোনো পক্ষের সংখ্যাই যাচাই করতে পারেনি।
সাড়ে চার দশকের মধ্যে ইরানে এবারের বিক্ষোভ সবচেয়ে প্রবল; যেখানে নড়বড় অবস্থার মুখে এসে ঠেকেছে শিয়া অধ্যুষিত দেশটির ধর্মীয় শাসকরা।
ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলনের বর্তমান চেহারা
ইরানের ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠী এখন বিভক্ত ও অসংগঠিত এক বিরোধী আন্দোলনের চাপের মুখে রয়েছে।
এই আন্দোলনের কিছু অংশ ইরানের ভেতরে সক্রিয় থাকলেও বড় একটি অংশ বিদেশে অবস্থানরত নেতাদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এদের অনেকেই নির্বাসিত নেতা বা প্রবাসী ইরানি।
যুক্তরাজ্য ও জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে প্রবাসী ইরানিরা রাস্তায় নেমে ইরানের বিক্ষোভকারীদের প্রতি সংহতি জানাচ্ছেন।
কেন বিক্ষোভের কোনো স্পষ্ট নেতা নেই?
অস্ট্রেলিয়ার ডিকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শাহরাম আকবরজাদেহ আলজাজিরাকে বলেন, বর্তমানে ইরানে এমন কোনো ঐক্যবদ্ধ বিরোধী গোষ্ঠী নেই, যারা সরকার গঠনের মতো অবস্থানে আছে।
ইরানের ভেতর ও বাইরে থাকা বিরোধী দলগুলো একে অপরের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন এবং তাদের লক্ষ্যও ভিন্ন। কারো নেতৃত্ব স্পষ্ট, আবার অনেকের নেই। তবে চলমান বিক্ষোভে ইরানের ভেতর থেকে কোনো একক নেতা উঠে আসেননি।
এর একটি বড় কারণ হলো, নেতৃত্ব সামনে এলে কঠোর দমন-পীড়নের আশঙ্কা।
২০০৯ সালের জুনে হওয়া ‘গ্রিন মুভমেন্ট’ ছিল একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলন। সাদা-কলার কর্মী, নারী অধিকারকর্মী ও সিভিল সোসাইটির সদস্যরা তখনকার বিতর্কিত নির্বাচনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিলেন। সে নির্বাচনে মাহমুদ আহমাদিনেজাদের বিজয় ঘোষণা করা হয়, যা ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল।
সেই নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মির-হোসেইন মুসাভি গ্রিন মুভমেন্টের প্রতীকী নেতা হয়ে ওঠেন। তবে ২০১১ সাল থেকে তিনি গৃহবন্দী। একইভাবে আরেক প্রার্থী ও সংস্কারপন্থি নেতা মেহদি কাররুবিও তখন আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং তাকেও গৃহবন্দি করা হয়। কাররুবির গৃহবন্দিত্ব গত বছর তুলে নেওয়া হলেও এই দুই নেতা বর্তমানে আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে নেই।
এই অভিজ্ঞতার কারণে এবারের বিক্ষোভকারীরা একজন নির্দিষ্ট নেতাকে সামনে আনতে আগ্রহী নন।
বর্তমান আন্দোলন অনেকটাই নেটওয়ার্কভিত্তিক। ছাত্র সংগঠন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম (যেমন ডিসকর্ড) ও পাড়া-মহল্লার মাধ্যমে সংগঠিত হচ্ছে আন্দোলন। ফলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বদলে গড়ে উঠছে বহু স্থানীয় নেতা ও গোষ্ঠী।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মরিয়ম আলেমজাদেহ বলেন, গত কয়েক দশকে ইরানি সরকার দেশে সংগঠিত বিরোধী শক্তিকে নির্মমভাবে দমন করেছে। এমনকি অরাজনৈতিক এনজিও, শ্রমিক ইউনিয়ন ও ছাত্র সংগঠনও ধ্বংস করা হয়েছে। এর ফলে সংগঠিত নেতৃত্ব বা শক্তিশালী তৃণমূল কাঠামো গড়ে ওঠেনি।
বিরোধী শিবিরের বিভিন্ন গোষ্ঠী: রেজা পাহলভি ও রাজতন্ত্রপন্থিরা
রেজা পাহলভি ইরানের শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির ছেলে। তিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসনে রয়েছেন।
তিনি সরাসরি রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনার কথা না বললেও ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে কথা বলেন। তবে প্রবাসী ইরানিদের একাংশ ও রাজতন্ত্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর সমর্থন পাওয়ায় তাকে নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
অনেক ইরানি রাজতন্ত্র যুগের বৈষম্য ও দমন-পীড়নের কথা ভুলতে পারেননি। ফলে পাহলভির প্রতি সমর্থন সীমিত ও বিভক্ত।
আলেমজাদেহ বলেন, ২০২২ সালের ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলনের পর পাহলভি সবচেয়ে পরিচিত বিরোধী মুখ হয়ে ওঠেন। তবে তার জনপ্রিয়তা মূলত নস্টালজিয়া ও বিকল্প নেতৃত্বের অভাব থেকে এসেছে; কোনো বাস্তব রাজনৈতিক পরিকল্পনা থেকে নয়।
মরিয়ম রাজাভি ও পিপলস মুজাহিদিন অর্গানাইজেশন (এমইকে)
মুজাহিদিন সংগঠনটি একসময় শাহবিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনে যুক্ত ছিল। তবে ইরান-ইরাক যুদ্ধে ইরাকের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় ইরানিদের বড় অংশ তাদের ক্ষমা করতে পারেননি।
সংগঠনটির বর্তমান নেত্রী মরিয়ম রাজাভি। মানবাধিকার সংগঠনগুলো তাদের ‘কাল্ট-সদৃশ আচরণ’-এর অভিযোগ করেছে। বর্তমানে এই গোষ্ঠীর ইরানের ভেতরে কার্যকর উপস্থিতি নেই।
ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের পক্ষে জোট
২০২৩ সালে বিদেশে থাকা কয়েকটি গোষ্ঠী একত্র হয়ে ‘ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ইরান’-এর দাবিতে একটি জোট গঠন করে।
তারা ধর্ম ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণ, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও মুক্ত গণমাধ্যমের পক্ষে কথা বলে। তবে ইরানের ভেতরে তাদের তেমন প্রভাব নেই।
কুর্দি ও বালুচ সংখ্যালঘু
ইরানের উল্লেখযোগ্য সংখ্যালঘু কুর্দি ও বালুচ জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে দ্বন্দ্বে রয়েছে। এই অঞ্চলগুলোতে প্রায়ই বিক্ষোভ বেশি জোরালো হয়।
তবে এখানেও কোনো একক বা ঐক্যবদ্ধ বিরোধী নেতৃত্ব নেই।
ঢাকা/রাসেল