ঢাকা     শুক্রবার   ০৩ এপ্রিল ২০২৬ ||  চৈত্র ২০ ১৪৩২ || ১৪ শাওয়াল ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

স্বাধীনতা দিবসের বিশেষ রচনা

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র : ইথারে অপ্রতিরোধ্য যোদ্ধা

আমিনুল ই শান্ত || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২০:১০, ২৫ মার্চ ২০১৪   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র : ইথারে অপ্রতিরোধ্য যোদ্ধা

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র

আমিনুল ই শান্ত
ঢাকা, ২৬ মার্চ : মুক্তিযুদ্ধের সময় গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। সে সময় এটি অস্থায়ী বেতার সম্প্রচার কেন্দ্র ছিল। যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে প্রতিষ্ঠিত হয়।

৬ ড়িসেম্বর ১৯৭১ সাল। এ দিনই ভারত বাংলাদেশকে সার্বভৌম স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি  দেয়। এরপর এ বেতার কেন্দ্রটির নামকরণ করা হয় বাংলাদেশ বেতার

২২ ড়িসেম্বর ১৯৭১ সাল। ঢাকা থেকে সম্প্রচার শুরু করে বাংলাদেশ বেতার কেন্দ্রটি। এর আগে রেডিও পাকিস্তান নামে পরিচিত ছিল এটি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতো স্বাধীন বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান শোনার জন্য। সে সময় এটি শুধু তথ্য সরবরাহের কাজ করেনি। এটি নিজেই হয়ে উঠেছিলো অপ্রতিরোধ্য যোদ্ধা। এই বেতারটি কাজ করেছে একজন গেরিলার মতই। কোন গণমাধ্যমও যে একটি দেশ সৃষ্টির ক্ষেত্রে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র তার উদাহরণ।

যেভাবে প্রতিষ্ঠা পায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র :

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ। তখন মধ্য রাত। বাঙ্গালিরা গভীর ঘুমে নিমঘ্ন। অপারেশন সার্চলাইটের নামে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ঢাকা শহরের কয়েক হাজার নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করে। এবং গ্রেফতার করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। কিন্তু গ্রেফতারের পূর্বে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা ও একটি সংক্ষিপ্ত বার্তা প্রদান করে যান। বার্তাটি ঢাকা ইপিআর ওয়ারলেস স্টেশন থেকে সিলিমপুর ওয়ারলেস স্টেশনের ইঞ্জিনিয়ার গোলাম রব্বানী ডাকুয়ার হাতে এসে পৌঁছায়। তারপর তিনি এ বার্তাটি  চট্টগ্রামে পৌঁছে দেন ২৫ মার্চ মধ্যরাতে।  এরপরই পাকিস্তানীরা  ইপিআর ওয়ারলেস ধ্বংস করে দেয়।

সাইক্লোষ্টাইল মেশিনের সাহায্যে ভোর হবার আগেই বার্তাটির শত শত কপি তৈরী করা হয়। এবং মধ্য রাতেই চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় মাইকে বার্তাটি প্রচার করা হয়। চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান। ২৬ মার্চ দুপুরবেলা চট্টগ্রামের কালুরঘাট ট্রান্সমিশান কেন্দ্র থেকে প্রথমবারের মতো স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র পাঠ করেন তিনি (বঙ্গবন্ধুর পাঠানো বার্তা)।

এরপর বেলাল মোহাম্মদ এবং আবুল কাশেম সন্দীপসহ চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের কয়েকজন বেতারকর্মী একত্রিত হোন। এবং  সিদ্ধান্ত নেন বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনগণকে সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করতে তারা বেতারের মাধ্যমে কিছু অনুষ্ঠান প্রচার করবেন। এ ভাবনা থেকে তারা চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রকে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন। এবং  তার নতুন নাম দেন স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র

তবে তারাও নিরাপত্তাহীনতার কারণে আগ্রাবাদ অবস্থিত চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রকে  ব্যবহার না করে শহর থেকে দূরে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে চলে যান। এরপর ২৬ মার্চ সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিট। প্রথম প্রচার করেন স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে বলছি! তখন এম এ হান্নান বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাটি আবার পাঠ করেন।

২৭ মার্চ সকাল। তারা পটিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হোন। মেজর জিয়া তখন পটিয়াতেই অবস্থান করছিলেন। তখন বেতার কেন্দ্রের নিরাপত্তা চেয়ে মেজর জিয়ার কাছে সাহায্য চাওয়া হয়। সেদিনই জিয়াউর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে কালুরঘাটে ফেরত আসেন তারা। তখন রাত আটটা। হঠাৎ এক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নতুন লিখিত ও সম্প্রসারিত বক্তব্যের মাধ্যমে মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।

পরদিন ২৮ মার্চ। স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে বিপ্লবী শব্দটি বাদ দিতে অনুরোধ করেন মেজর জিয়া। এরপর বিপ্লবী শব্দটি বাদ দেয়া হয়। নতুনভাবে নামকরণ করা হয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র`

২৮ মার্চ প্রথম অধিবেশনে বিমান হামলায় করণীয় নির্দেশনাবলী প্রচারিত হয়। দ্বিতীয় অধিবেশনে প্রথম একটি কথিকা পাঠ করা হয়। ৩০ মার্চ প্রভাতী অধিবেশনে প্রথম বারের মতো জয় বাংলা, বাংলার জয় গানটি প্রচারিত হয়। ৩০ মার্চ দুপুরের অধিবেশন শেষ হবার পর প্রায় ২টা ১০ মিনিটের দিকে বেতার কেন্দ্রে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী বিমান হামলা করে। এবং তারপর থেকেই এ বেতার কেন্দ্রটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

আনুষ্ঠানিক যাত্রা :

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল। গঠিত হয় মুজিবনগর সরকার। এরপর মে মাসের মাঝামাঝি সময়। বাংলাদশে সরকার ও বেতারকেন্দ্রের কর্মীরা একটি শক্তশিালী ট্রান্সমিটারের আবেদন করেন ভারত সরকারের কাছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ভারত সরকার ৫০ কিলোওয়াট মিডিয়াম ওয়েভের ট্রান্সমিটার প্রদান করেন। তখন থেকেই বেতারকর্মীরা মুজিবনগরে আসতে থাকে।

কলকাতার বালিগঞ্জের সার্কুলার রোডের ৫৭/৮ নাম্বার বাড়ি। এ  বাড়িটির দ্বিতীয়তলায় ছিল রাষ্ট্রপতি ও অন্যান্য মন্ত্রীদের আবাসস্থল। তাদের থাকার ঘরের পাশেই একটি কক্ষে এ ট্রান্সমিটার দিয়ে সম্প্রচার শুরু করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। পরবর্তিতে এখানে আরো একটি ট্রান্সমিটার বসানো হয়। এ বাড়িটিই হয়ে  উঠে বেতার কেন্দ্রের স্থায়ী কার্যলয়। এরপর থেকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান নিয়মিতভাবে সম্প্রচার হতে থাকে।

মুক্তিযুদ্ধে প্রেরণা জোগানো অনুষ্ঠান :

এ সময় জনপ্রিয় কিছু অনুষ্ঠান প্রচারিত হতো। এ অনুষ্ঠানগুলোর নেপথ্যে ছিলেন কিছু গুণীজন। যাদের মেধা ও মননের কারণেই এ অনুষ্ঠান প্রচার করা সম্ভব হতো। একনজরে দেখে নেওয়া যাক অনুষ্ঠানসমূহ।

চরমপত্র নামে রম্যকথিকা বিষয়বস্তুকে অবলম্বন করে অনুষ্ঠানটি পরিকল্পনা করেছিলেন আবদুল মান্নান এবং উপস্থাপনা করতেন এম আর আখতার মুকুল। ইসলামের দৃষ্টিতে ধর্মীয় কথিকা উপস্থাপক সৈয়দ আলি আহসান। জল্লাদের দরবার জীবন্তিকা(নাটিকা), লেখক: কল্যাণ মিত্র, কণ্ঠ: রাজু আহমেদ এবং নারায়ণ ঘোষ। বজ্রকন্ঠ নামের এ অনুষ্ঠানটি সাজানো হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর ভাষণের অংশবিশেষ নিয়ে।

দৃষ্টিপাত নামের অনুষ্ঠানটি উপস্থাপন করতেন ডঃ মাজহারুল ইসলাম। বিশ্বজনমত নামে সংবাদভিত্তিক এ অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ছিলেন সাদেকীন। প্রতিনিধির কণ্ঠ নামের এ অনুষ্ঠান অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিদের ভাষণ নিয়ে সাজানো হতো। পিন্ডির প্রলাপ, দর্পণ, প্রতিধ্বনী, কাঠগড়ার আসামী নামের এ অনুষ্ঠানসমূহ উপস্থাপনা করতেন যথাক্রমে আবু তোয়াব খান, আশরাফুল আলম, শহীদুল ইসলাম, মুস্তাফিজুর রহমান।

যে গানগুলো প্রেরণা জুগিয়েছে মুক্তিযুদ্ধে:

মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনেক গানই জনপ্রিয়তা লাভ করে। কিন্তু শুধু জনপ্রিয়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না এ গানগুলো। মুক্তিযুদ্ধাদের প্রেরণাও জুগিয়েছে বিভিন্নভাবে। জনপ্রিয় এ গানগুলোর কথা ও শিল্পীর নাম উল্লেখ করা হলো:

১. জয় বাংলা, বাংলার জয়- শাহনাজ বেগম (রহমতুল্লাহ)
২. আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি- কোরাস (সমবেত)
৩. কারার ঐ লৌহ কপাট- (কোরাস)            
৪. সোনা সোনা সোনা লোকে বলে সোনা- শাহনাজ বেগম
৫. মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে- আপেল মাহমুদ
৬. অনেক রক্ত দিয়েছি আমরা- (কোরাস)
৭. অত্যাচারের পাষাণ জ্বালিয়ে দাও- (কোরাস)
৮. তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর– (কোরাস)
৯. পূর্ব দিগন্তে, সূর্য উঠেছে- (কোরাস)
১০. এক সাগর রক্তের বিনিময়ে- স্বপ্না রায়
১১. আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী - (কোরাস)
১২. আমি এক বাংলার মুক্তি সেনা- (কোরাস)
১৩. সালাম সালাম হাজার সালাম - মোহাম্মদ আবদুল জব্বার

তথ্যসূত্র : মাহবুব উল আলমের বাঙ্গালীর মুক্তিযুদ্ধের ইতিবৃত্ত ও ইন্টারনেট

অলংকরণ : অপূর্ব খন্দকার

 



রাইজিংবিডি/রাশেদ শাওন

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়