সয়াবিন তেলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মাছ-মুরগির দাম
রায়হান হোসেন || রাইজিংবিডি.কম
রাজধানীর বাজারে বেড়েছে সয়াবিন তেল ও মুরগির দাম
রাজধানীর বাজারে বাড়তে শুরু করেছে অধিকাংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। বিক্রেতারা বলছেন, জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় গত এক সপ্তাহ ব্যবধানে খুচরা পর্যায়ে খোলা সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে প্রায় ১০ টাকা বেড়েছে, সঙ্গে খোলা পাম তেলের দামও বেড়েছে। একই সমস্যার কারণে বেড়েছে মাছ-মুরগি ও সবজির দামও।
শুক্রবার (৩ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর হাজারীবাগ, নিউমার্কেট ও কারওয়ান বাজারে বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।
বেড়েছে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দাম:
বাংলাদেশ রান্নার অন্যতম উপকরণ হলো সয়াবিন তেল। বিগত বছরগুলোতে দফায় দফায় বেড়েছে এই পণ্যটির দাম। বিক্রেতারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে চাহিদা অনুযায়ী আমদানি ব্যাহত এবং দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি তেলের সংকটে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় এ সপ্তাহে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দাম ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
তারা জানান, এখন বাজারে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১৯৫ থেকে ২০০ টাকায়, যা গত সপ্তাহে বিক্রি হয়েছে ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকায়। বাজারে খোলা পাম তেল বিক্রি হয় ১৮৪ থেকে ১৮৫ টাকায়, যা গত সপ্তাহে ছিল ১৭৫ টাকা।
কারওয়ান বাজারের ফরাজি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. ইসমাইল হোসেন ফরাজী রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সংঘাতের কারণে আমাদের দেশের বড় বড় কোম্পানিগুলো ভোজ্য তেল আমদানি করতে ঠিকভাবে পারছে না। এই পরিস্থিতিতে মিলগেটেও সয়াবিন ও পাম তেলের দাম বাড়তি। পরিবহন খরচও বৃদ্ধি পেয়েছে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ভালো না। গত সপ্তাহের তুলনায় এ সপ্তাহে লিটার প্রতি খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আমরা অর্ডার দিয়েও চাহিদা মতো সরবরাহ পাচ্ছি না।”
একই বাজারে সপ্তাহিক মুদি বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী রাসেল আহমেদ বলেন, “আমাদের বেতনের সঙ্গে বাজার দরের কোনো মিল নাই। লিস্টের অধিকাংশ বাজার বাকি থাকতেই পকেট খালি। গত সপ্তাহের তুলনা এ সপ্তাহে খোলা সয়াবিন তেলের দাম বেশি দেখলাম। বাচ্চাদের মাছ-মাংস খাওয়ানোর অবস্থা নেই। সবকিছুর দামি বাড়তি।”
তিনি বলেন, “সরকারি চাকরিজীবীদের বিভিন্ন ভাতা দেওয়া হয়, কিন্তু আমাদের মতো বেসরকারি চাকরিজীবীদের কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই। বাসা ভাড়া দিয়ে বাজার করে খেয়ে ঢাকায় থাকা এখন অনেক কষ্টের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুসারে, গত এক মাসের ব্যবধানে বাজারে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দাম লিটারে ৬ শতাংশ বেড়েছে। গত বছরের তুলনায় এখন খোলা সয়াবিনের দাম ১৮ শতাংশ এবং খোলা পাম তেলের দাম ১১ শতাংশ বেশি।
রেকর্ড দামে বিক্রি হচ্ছে সোনালি ও দেশী মুরগি:
দেশের বাজারে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে এখন চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে সোনালি ও দেশি মুরগি। প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে গিয়ে পকেটে টান পড়া সাধারণ ক্রেতাদের কাছে মুরগির বাজার এখন রীতিমতো এক আতঙ্কের নাম।
এখন বাজারে দেশি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকায়। আর সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৪২০ টাকায়। ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২২০ থেকে ২৩০ টাকায়।
এ সপ্তাহে গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকায় ও খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে ১২০০ টাকা কেজি দরে।
রাজধানীর জিগাতলা সালেক গার্ডেন কাঁচাবাজারের মুরগি বিক্রতে মালেক চৌকিদার রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “আমার ব্যবসায়ী জীবনে দেশি ও সোনালী মুরগির দাম এত বেশি দেখিনি। দাম এত বেশি বাড়ার কারণ হলো সরবরাহ সংকট। আমরা অর্ডার দিয়ে চাহিদা মতা মুরগি পাচ্ছি না। পরিবহন খরচ বাড়ার কারণে আগের মতো মুরগির গাড়িও আসছে না। তাই দাম বাড়তি।”
একই বাজারে মুরগি কিনতে আসা গৃহিণী তামান্না খাতুন বলেন, “আমার বাচ্চাদের জন্য দেশি মুরগি নিতে এসেছি, দাম শুনে আমি অবাক হয়েছি। ৮০০ টাকা কেজি চাচ্ছে। গরুর মাংসের কেজিও ৮০০ টাকা, তাহলে কেন মুরগি নেব। বাধ্য হয়ে আজকে দেশি মুরগি না নিয়ে ব্রয়লার মুরগি নিয়েছি। এভাবে দাম বাড়তে থাকলে আমাদের মতো মধ্যবিত্ত মানুষের টিকে থাকা কষ্টকর হয়ে দাঁড়াবে।”
বাজারে মাছের দাম:
এখন বাজারে মাঝারি আকারের চাষের রুই বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি দরে। চাষের পাঙাস আকার অনুযায়ী কেজি ২২০ থেকে ২৫০ টাকা, তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, মাঝারি আকারের কৈ মাছ ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আকারভেদে দেশি শিং ৮০০ থেকে ৯০০টাকা, বড় সাইজের পাবদা ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা, চিংড়ি ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা, দেশি পাঁচমেশালি ছোট মাছ ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা কেজি দরে বাজারে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
মলা ৬২০ টাকা, টেংরা ৭৫০ টাকা, রূপচাঁদা ১৫০০, বোয়াল ৪৫০ থেকে ৬০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। ৪০০ গ্রাম ওজনের পদ্মার ইলিশ ১২০০টাকা এবং চট্টগ্রামের ইলিশ ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বাজারে মাছ কিনতে আসা ঢাকা কলেজে শিক্ষার্থী মুজাহিদ মোল্লা বলেন, "আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে মেসে থাকি। আজকের সপ্তাহিক বাজার করতে আসলাম। মাছের বাজার এসে দেখি আগুন। গত সপ্তাহের তুলনায় এ সপ্তাহে অধিকাংশ মাছের দাম বেড়েছে। আমাদের বাড়ি থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দেওয়া হয় এবং সেই টাকা দিয়ে আমাদের পুরো মাস চলতে হয়। বাজারে হঠাৎ এরকম দাম বৃদ্ধি আমাদের জন্য অনেক সমস্যা হয়।"
সবজির দাম
এখন বাজারে প্রতিকেজি বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৭০ থাকে ৮০ টাকা। সিম ৮০ টাকা, মুলা ৩০ থেকে ৪০ টাকা, দেশি শশা ৬০ টাকা, করলা ১২০ টাকা, গাজর (দেশি) ৬০ থেকে ৮০ টাকা, চিচিঙ্গা ১০০ টাকা, বরবটি ও ঢেঁড়স ১০০০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৩০ টাকা কেজি হিসেবে বিক্রি হচ্ছে।
কাঁচা পেঁপে ৩০ টাকা পিস বিক্রি করতে দেখা গেছে বিক্রিতাদের। পটল ৮০ টাকা, টমেটো ৪০ থেকে ৫০ টাকা, কাঁচমরিচ ১২০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি এবং ফুলকপি ও বাঁধাকপির পিস ৪০ থেকে ৫০ টাকা এবং প্রতিটি পিস জালি কুমড়া ও লাউ ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এছাড়া, মুদি বাজারে চালসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। এখন নতুন আলু বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ টাকায়। দেশি পেঁয়াজ ৪০ টাকা, রসুন (দেশি) ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, দেশি আদা ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
রাজধানীর নিউমার্কেটের সবজি বিক্রেতা মাসুম আব্দুল্লাহ বলেন, “গত সপ্তাহে তুলনায় এ সপ্তাহে সবজির দাম কিছুটা বেড়েছে। এর অন্যতম কারণ হলো পরিবহন খরচ আগের থেকে বেড়ে গেছে।”
ঢাকা/মাসুদ
অফিস ৯টা-৪টা, সন্ধ্যা ৬টার পর বন্ধ মার্কেট