বন রক্ষায় নতুন অধ্যাদেশ, আইন না মানলে লাখ টাকা জরিমানা
বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণে কঠোরতা আরোপ করে নতুন অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। এ অধ্যাদেশ অনুযায়ী কাটা যাবে না এমন গাছ বা বন অধিদপ্তর থেকে বিপদাপন্ন ঘোষিত কোনো গাছ কাটলে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা দিতে হবে।
মঙ্গলবার (৭ জানুয়ারি) আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয়।
‘বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ অধ্যাদেশ, ২০২৬’এ বনভূমির জরিপ, রেকর্ড সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি স্পষ্ট করা হয়েছে। একই সঙ্গে শিল্পকারখানা স্থাপনের প্রয়োজনে শর্তসাপেক্ষে এক একরের কম বনভূমি বিনিময়ের সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শিল্প প্রতিষ্ঠানকে বনসংলগ্ন দ্বিগুণ নিষ্কণ্টক জমি বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করতে হবে, যা সরকার সংরক্ষিত বনভূমি হিসেবে ঘোষণা করবে।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী বন সংরক্ষণ কর্মকর্তার পূর্বানুমোদন সাপেক্ষে ‘বন আইন, ১৯২৭’-এর ৪ ও ৬ ধারায় ঘোষিত বন, অশ্রেণিভুক্ত রাষ্ট্রীয় বন, সামাজিক বন, সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং গণপরিসরের গাছ কাটা বা অপসারণ করা যাবে। এ অধ্যাদেশ বাস্তবায়নে প্রধান বন সংরক্ষক বিভাগীয় বন কর্মকর্তাদের বৃক্ষ সংরক্ষণ কর্মকর্তার দায়িত্ব দেবেন।
গেজেটে প্রকাশিত কাটা যাবে না এমন গাছের তালিকাভুক্ত কিংবা বন অধিদপ্তর ঘোষিত বিপদাপন্ন কোনো গাছ কাটার অনুমতি থাকবে না। তবে তালিকাভুক্ত বৃক্ষ ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে থাকলে নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে পূর্বানুমোদন নিয়ে কাটা যাবে।
এ জন্য আবেদনকারীকে গাছের প্রজাতি, সংখ্যা, আনুমানিক উচ্চতা, বুক সমান উচ্চতায় বেড়, কাটার কারণসহ নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হবে। আবেদন যাচাই ও সরেজমিন পরিদর্শনের পর আবেদন প্রাপ্তির ৩০ দিনের মধ্যে লিখিত সিদ্ধান্ত দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের মৌজা রিজার্ভ এলাকায় গাছ কাটার ক্ষেত্রে এই অধ্যাদেশের পরিবর্তে ‘চট্টগ্রাম হিল ট্র্যাকস রেগুলেশন, ১৯৯০’-এর বিধান প্রযোজ্য হবে। কোনো আবেদন অনুমোদিত হলে কাটা গাছের পরিবর্তে একই এলাকায় নির্ধারিত প্রজাতি ও সংখ্যার বৃক্ষরোপণ নিশ্চিত করতে হবে। বৃক্ষ সংরক্ষণ কর্মকর্তার সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হলে ১৫ দিনের মধ্যে বন সংরক্ষকের কাছে আপিল করা যাবে।
বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের আওতাধীন বনভূমিতে এ বিধান কার্যকর হবে না। একই সঙ্গে কর্তন নিষিদ্ধ ও অনুমতি সাপেক্ষে কর্তনযোগ্য তালিকার বাইরে থাকা বাণিজ্যিক বা গ্রামীণ এলাকায় ব্যাপক ব্যবহৃত গাছ কাটার জন্য অনুমোদনের প্রয়োজন হবে না। ব্যক্তি মালিকানাধীন রোগাক্রান্ত বা মৃত গাছ, ঝড়ে উপড়ে পড়া গাছ, সড়ক যোগাযোগে বাধাসৃষ্টিকারী বা জীবন ও সম্পদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ গাছ কাটতে আগাম অনুমোদন লাগবে না।
অধ্যাদেশে আরো বলা হয়েছে, বাণিজ্যিক উৎপাদন ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে গাছে পেরেক বা ধাতব বস্তু ব্যবহার করে ক্ষতি করা নিষিদ্ধ। এ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে বন অধিদপ্তরকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অধ্যাদেশ কার্যকর হওয়ার তিন মাসের মধ্যে কাটা যাবে না এমন গাছ ও অনুমতি সাপেক্ষে কাটা যাবে এমন গাছের তালিকা গেজেটে প্রকাশ এবং প্রয়োজনে হালনাগাদ করতে হবে।
অধ্যাদেশ লঙ্ঘন করে কাটা যাবে না এমন গাছ কাটলে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা এবং ক্ষতিপূরণমূলক বনায়নের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা রাখা হয়েছে। অনুমতি সাপেক্ষে কর্তনযোগ্য বৃক্ষের বিধান ভঙ্গ করলে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা এবং গাছের ক্ষতিসাধনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
সরকারি বা বেসরকারি কোনো সংস্থার মাধ্যমে অপরাধ সংঘটিত হলে সংশ্লিষ্ট পরিচালক, কর্মকর্তা বা প্রতিনিধিকে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করে সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা জরিমানা করা যাবে। একই সঙ্গে ক্ষমতাপ্রাপ্ত বন কর্মকর্তাদের মামলা দায়ের, তদন্ত, তল্লাশি, জব্দ এবং আদালতে বন অধিদপ্তরের পক্ষে মামলা পরিচালনার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
বনভূমির জরিপ ও রেকর্ড
নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, বৃক্ষাচ্ছাদন থাকুক বা না থাকুক গেজেট দ্বারা ঘোষিত সব বনভূমি বন বিভাগের নামে রেকর্ডভুক্ত থাকবে। রক্ষিত ও অর্জিত বনভূমি জেলা প্রশাসকের নামে রেকর্ড হলেও তা বন বিভাগের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হবে। বন বিভাগের অধীন কোনো বনভূমি বন্দোবস্ত দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি।
অধ্যাদেশ কার্যকর হওয়ার পর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বনভূমির জরিপ, সীমানা নির্ধারণ ও রেকর্ড হালনাগাদে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের মাধ্যমে উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বনের অখণ্ডতা রক্ষায় সরকার বনাঞ্চলের ভেতরের খাস জমি বন বিভাগের অনুকূলে হস্তান্তর এবং প্রয়োজনে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি অধিগ্রহণ করে বন ঘোষণা করতে পারবে। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকায় অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রথাগত ও ঐতিহ্যগত বন অধিকার নিষ্পত্তির শর্ত আরোপ করা হয়েছে।
শর্তসাপেক্ষে বনভূমি বিনিময়
কোনো বিধিবদ্ধ সংস্থা বা শিল্প প্রতিষ্ঠানের জমির মধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে এক একরের কম বনভূমি থাকলে জনস্বার্থ ও অপরিহার্যতা বিবেচনায় সরকারপ্রধানের অনুমোদনে নির্ধারিত বিধিমালা অনুযায়ী বিনিময়ের সুযোগ রাখা হয়েছে। বিনিময়ের ক্ষেত্রে দ্বিগুণ নিষ্কণ্টক জমি বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করতে হবে এবং তা সংরক্ষিত বনভূমি হিসেবে ঘোষণা করা হবে।
ঢাকা/এএএম/ইভা