হলফনামা বিশ্লেষণ
তারেক রহমানের আয়ের উৎস শেয়ারবাজার
বাংলাদেশে রাজনীতির সঙ্গে আয় ও সম্পদের যোগসূত্র খুঁজলে দেখা যাবে, অধিকাংশ শীর্ষ রাজনীতিকের আয়ের উৎস ব্যবসা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান কিংবা পারিবারিক সম্পদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তবে, এই প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে শেয়ারবাজারকে নিজের প্রধান আয়ের উৎস হিসেবে তুলে ধরেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার দাখিল করা নির্বাচনি হলফনামা রাজনীতি ও পুঁজিবাজারের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
দেশের রাজনীতির মঞ্চে তারেক রহমান প্রভাবশালী নেতা। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কিন্তু, তার জীবনের আরেকটি দিক সম্প্রতি সামনে এসেছে, সেটি হলো শেয়ারবাজার। অর্থাৎ যেটি রাজনীতির চেয়ে অনেক বেশি নীরব, হিসেবি এবং ঝুঁকিপূর্ণ।
হলফনামা অনুযায়ী, তারেক রহমানের বার্ষিক আয় আসে মূলত শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার, বন্ড এবং ব্যাংক আমানত থেকে। রাজনীতি ছাড়া তার অন্য কোনো পেশা নেই। অর্থাৎ দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা কার্যত একজন বিনিয়োগনির্ভর ব্যক্তি—যার জীবনযাপন আংশিকভাবে হলেও পুঁজিবাজারের গতিবিধির ওপর নির্ভরশীল।
বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজার আস্থাহীনতা, কারসাজি ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের অভাবে জর্জরিত। এমন সময়ে একজন শীর্ষ রাজনৈতিক নেতার আয়ের উৎস হিসেবে শেয়ারবাজারের নাম উঠে আসা গুরুত্ব বহন করে। এতে বোঝা যায় যে, যদি বাজারে সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে পুঁজিবাজার কেবল ব্যবসায়ীদের নয়, রাজনীতিকদেরও আর্থিক নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন। তারেক রহমানের হলফনামা রাজনীতি ও পুঁজিবাজারের সম্পর্ককে নতুনভাবে আলোচনায় এনেছে।
তারেক রহমানের আয় ও সম্পদের হিসাব
নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, তারেক রহমানের বার্ষিক আয় ৬ লাখ ৭৬ হাজার ৩৫৩ টাকা। এই আয়ের পুরোটা আসে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার, বন্ড এবং ব্যাংক আমানত থেকে। কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, চাকরি কিংবা পেশাগত আয় নেই, রাজনীতিই তার একমাত্র পেশা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আয়কর নথিতে দেখা যায়, তারেক রহমান মোট ১ কোটি ৯৬ লাখ ৮০ হাজার ১৮৫ টাকার সম্পদের বিপরীতে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ৭১৩ টাকা কর পরিশোধ করেছেন। বিনিয়োগকেন্দ্রিক এই আয়ের কাঠামো দেশের রাজনীতিতে তুলনামূলকভাবে বিরল বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অস্থাবর সম্পদের হিসাবে দেখানো হয়েছে, বিভিন্ন কোম্পানিতে তার বিনিয়োগ আছে। অর্জনকালীন হিসাবে এসব শেয়ার ও বিনিয়োগের মূল্য ৫ লাখ, ৪৫ লাখ এবং ১৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা। পাশাপাশি নগদ অর্থ ও ব্যাংকে তার জমা আছে ৩১ লাখ ৫৮ হাজার ৪২৮ টাকা। ব্যাংকে স্থায়ী আমানত (এফডিআর) হিসেবে তার নামে আছে ৯ লাখ ২৪ হাজার ৩০৭ টাকা।
তার স্ত্রী ডা, জুবাইদা রহমানের নামে আছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ—ব্যাংক ও নগদ মিলিয়ে ৬৬ লাখ ৫৪ হাজার ৭৪৭ টাকা। তার নামে রয়েছে ৩৫ লাখ টাকার এফডিআর এবং ১৫ হাজার ২৬০ টাকার সঞ্চয়ও।
স্থাবর সম্পদের ক্ষেত্রে তারেক রহমান জানিয়েছেন, তার কোনো কৃষিজমি নেই। তবে, অকৃষি জমি হিসেবে তার মালিকানায় আছে ২.০১ একর ও ১.৪ শতাংশ জমি, যার অর্জনকালীন মূল্য ৩ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। উপহার হিসেবে পাওয়া ২.৯ শতাংশ বসতভিটা থাকলেও এর আর্থিক মূল্য উল্লেখ করা হয়নি। তার স্ত্রী জুবাইদা রহমানের নামে আছে যৌথ মালিকানায় ১১১.২৫ শতাংশ জমি এবং ৮০০ বর্গফুটের একটি দোতলা ভবন, যার মূল্যও অনির্ধারিত।
হলফনামায় আরো উল্লেখ করা হয়েছে, তারেক রহমানের নামে বর্তমানে কোনো ফৌজদারি মামলা নেই। ২০০৭ সাল থেকে দায়ের হওয়া ৭৭টি মামলার সবকটি থেকে তিনি খালাস বা অব্যাহতি পেয়েছেন অথবা মামলাগুলো প্রত্যাহার ও খারিজ হয়েছে।
তার দ্বৈত নাগরিকত্ব নেই। শিক্ষাগত যোগ্যতা উচ্চমাধ্যমিক। একমাত্র সন্তান জাইমা রহমান বর্তমানে শিক্ষার্থী।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—হলফনামায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, দেশে বা বিদেশে তারেক রহমানের নিজের নামে কোনো বাড়ি, ফ্ল্যাট কিংবা বাণিজ্যিক স্থাপনা নেই।
নির্বাচনি তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২০ জানুয়ারি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। ১২ ফেব্রুয়ারি একই সঙ্গে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হবে।
ঢাকা/এনটি/রফিক