ঢাকা     মঙ্গলবার   ০৬ জানুয়ারি ২০২৬ ||  পৌষ ২৩ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

খালেদা জিয়ার কূটনৈতিক দর্শন: বিদেশে বন্ধু আছে, প্রভু নেই

‎মো. জসিম উদ্দিন || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:১১, ৩ জানুয়ারি ২০২৬   আপডেট: ১৮:১১, ৩ জানুয়ারি ২০২৬
খালেদা জিয়ার কূটনৈতিক দর্শন: বিদেশে বন্ধু আছে, প্রভু নেই

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু উক্তি আছে, যা কেবল বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং রাষ্ট্রচিন্তার দিকনির্দেশনা হয়ে ওঠে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার উচ্চারিত উক্তি ‘বিদেশে আমাদের বন্ধু আছে, প্রভু নেই’ ঠিক তেমনই একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ইশতেহার। এটি নিছক কোনো আবেগপ্রবণ রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং সার্বভৌমত্ব, কূটনীতি ও জাতীয় আত্মমর্যাদার প্রশ্নে একটি সুস্পষ্ট দর্শনের প্রকাশ। বর্তমান জটিল বৈশ্বিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এই উক্তির প্রাসঙ্গিকতা ও গুরুত্ব অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি।

বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে। ফলে এই ভূখণ্ডের পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শনে স্বাধীন সিদ্ধান্ত ও আত্মমর্যাদা থাকা ছিল এক ঐতিহাসিক অপরিহার্যতা। স্বাধীনতার পর থেকেই ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’—এই নীতি রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তবে সময়ের বিবর্তনে বিশ্ব রাজনীতি যখন মেরুকরণের শিকার হয়, তখন এই নীতির বাস্তব প্রয়োগে সাহসিকতার প্রয়োজন পড়ে। বেগম খালেদা জিয়ার কূটনৈতিক দর্শন সেই ধারারই একটি বাস্তববাদী এবং দৃঢ় রূপ, যেখানে বন্ধুত্ব স্বীকৃত, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই আধিপত্য বা খবরদারি নয়।

আরো পড়ুন:

বেগম জিয়ার উক্তিতে ‘বন্ধু’ শব্দটি পারস্পরিক সম্মান, সমমর্যাদা, দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা এবং স্বার্থের ভারসাম্য নির্দেশ করে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত্বে একে বলা হয় Sovereign Equality বা সার্বভৌম সমতা। অন্যদিকে ‘প্রভু’ শব্দটি এমন এক অসম সম্পর্ক নির্দেশ করে, যেখানে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র ক্ষুদ্রতর রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত, নীতি নির্ধারণ এবং রাজনৈতিক গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অনেক সময় উন্নয়ন সহায়তা, সামরিক ঋণ কিংবা কৌশলগত জোটের আড়ালে এক ধরনের সূক্ষ্ম নির্ভরশীলতা তৈরি করা হয়। এই নির্ভরশীলতা যখন অন্ধ আনুগত্যে রূপ নেয়, তখন দেশ তার সার্বভৌমত্ব হারায়। বেগম জিয়া এই আনুগত্যের সংস্কৃতিকেই ‘দাসত্ব’ হিসেবে চিহ্নিত করে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ডাক দিয়েছিলেন।

​বেগম জিয়ার কূটনৈতিক দর্শনের অন্যতম সফল এবং দূরদর্শী প্রয়োগ ছিল লুক ইস্ট (Look East) বা পূর্বমুখী নীতি। নব্বইয়ের দশকের পর বিশ্ব যখন এক মেরুকেন্দ্রীক হয়ে পড়ছিল, তখন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, কেবল পশ্চিমা বিশ্বের ওপর কিংবা নির্দিষ্ট কোনো প্রতিবেশীর ওপর অতিনির্ভরতা বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এই উপলব্ধি থেকে তিনি চীন, জাপান এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথে কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিবিড় করার উদ্যোগ নেন। এটি কেবল একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং এটি ছিল ‘প্রভুহীন’ পররাষ্ট্রনীতির একটি ব্যবহারিক রূপ। এই নীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বশক্তির ভারসাম্য রক্ষায় দর কষাকষির সক্ষমতা অর্জন করেছিল এবং প্রমাণ করেছিল যে বাংলাদেশ কোনো নির্দিষ্ট বলয়ের আজ্ঞাবহ নয়।

​দক্ষিণ এশীয়ার রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থানকে মর্যাদাপূর্ণ করতে বেগম খালেদা জিয়া সবসময় আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে যে সার্ক-এর জন্ম, বেগম জিয়া তাকে নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তার দর্শনে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সমস্যা থাকতে পারে; তা সে গঙ্গার পানি বণ্টন হোক বা সীমান্ত সমস্যা, কিন্তু সেই সমস্যা সমাধানের পথ হতে হবে দ্বিপাক্ষিক সম্মান ও আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক জোট থাকলে বড় শক্তিগুলোর একক আধিপত্য বা ‘বিগ ব্রাদার’সুলভ আচরণ মোকাবিলা করা সহজ হয়। তার সময়ে সার্ক সম্মেলনে বাংলাদেশের বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল মূলত ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াই।

কূটনীতির ইতিহাসে একটি বড় বিচ্যুতি ঘটে যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য কোনো শক্তি বিদেশের কাছে ধরনা দেয় বা তোষামোদি করে। বেগম জিয়ার ‘প্রভু নেই’ উক্তিটি মূলত এই রাজনৈতিক হীনম্মন্যতার বিরুদ্ধে এক চরম চপেটাঘাত। তাঁর দর্শনের মূল কথা হলো—ক্ষমতার উৎস হবে দেশের জনগণ, কোনো বিদেশি শক্তি নয়। যখন কোনো সরকার জনগণের ম্যান্ডেট হারিয়ে বিদেশের সমর্থনে টিকে থাকতে চায়, তখন তারা রাষ্ট্রের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে ‘দাসত্ব’ মেনে নিতে বাধ্য হয়। বেগম জিয়া শিখিয়েছেন যে, একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে টিকে থাকতে হলে বাইরের শক্তির সাথে সম্পর্ক হবে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে, ক্ষমতার মোহে নয়। জাতীয় স্বার্থকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখাই তার কূটনীতির মূল পাঠ।

বর্তমান বৈশ্বিকীকরণের যুগে কোনো রাষ্ট্রই দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন হয়ে টিকে থাকতে পারে না। ২০২৪–২৫ অর্থবছরের অর্থনৈতিক উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের অর্থনীতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও রেমিট্যান্সের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে, যার প্রধান গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র। একইসঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা ও অবকাঠামো উন্নয়নে চীন ও রাশিয়ার ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতা স্পষ্ট করে যে, উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশের বন্ধুর প্রয়োজন রয়েছে। তবে সেই বন্ধুত্ব যেন কখনো একতরফা নির্দেশনা বা চাপের সম্পর্কে পরিণত না হয়—এই সতর্কতাই ছিল বেগম খালেদা জিয়ার উক্তির মূল সুর।

বাংলাদেশের বর্তমান বৈদেশিক ঋণের বোঝা দ্রুত বাড়ছে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ১০০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করার আশঙ্কা রয়েছে। ঋণের এই বিশাল বোঝার সাথে সাথে জুড়ে দেওয়া হয় নানা কঠিন শর্ত, যা অনেক সময় দেশের অভ্যন্তরীণ নীতি নির্ধারণে হস্তক্ষেপ করে। খালেদা জিয়ার কূটনৈতিক দর্শন এই জায়গায় অত্যন্ত স্পষ্ট—আমরা বিদেশি বিনিয়োগ ও ঋণ গ্রহণ করব উন্নয়নের স্বার্থে, কিন্তু সেই ঋণের বিনিময়ে দেশের নীতিনির্ধারণী চাবিকাঠি অন্য কারও হাতে তুলে দেব না। উন্নয়ন হতে হবে নিজস্ব অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে, কোনো দাতা সংস্থার প্রেসক্রিপশনে নয়।

বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি অত্যন্ত অস্থির। একদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও গাজা সংকট, অন্যদিকে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা বাংলাদেশকে এক কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে। এই ‘গ্রেট পাওয়ার গেম’-এ ছোট দেশগুলো প্রায়ই দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বর্তমান সময়ে মানবাধিকার, গণতন্ত্র কিংবা কৌশলগত অবস্থানের দোহাই দিয়ে যে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি হয়, তা মোকাবিলা করার জন্য বেগম জিয়ার সেই সাহসী উচ্চারণের চেয়ে কার্যকর কোনো ঢাল নেই। তিনি শিখিয়েছিলেন, চাপের মুখে মাথা নত না করে জাতীয় ঐক্য ও আত্মমর্যাদার ভিত্তিতে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করাই হলো শ্রেষ্ঠ প্রতিরক্ষা।

বাংলাদেশ ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় পূর্ণাঙ্গভাবে যুক্ত হতে যাচ্ছে। এই যাত্রায় বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (FDI) আমাদের জন্য অপরিহার্য। তবে বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রতিযোগিতায় নেমে যদি আমরা আমাদের সমুদ্রবন্দর, খনিজ সম্পদ কিংবা ভৌগোলিক কৌশলগত স্থানগুলো কোনো বিশেষ শক্তির কাছে দীর্ঘ মেয়াদে ইজারা দিয়ে দেই, তবে তা আধুনিক যুগের দাসত্ব হিসেবেই গণ্য হবে। খালেদা জিয়ার দর্শন আমাদের সতর্ক করে যে, বিনিয়োগ যেন শোষণে রূপ না নেয় এবং বন্ধুত্ব যেন জবরদখলের সুযোগ না পায়।

খালেদা জিয়ার এই উক্তি কেবল রাজনীতির ময়দানের কথা নয়, এটি একটি নৈতিক প্রশ্ন যা প্রতিটি নাগরিকের মনে থাকা উচিত। রাষ্ট্র কি কেবল একটি ভৌগোলিক মানচিত্র, নাকি এটি একটি স্বাধীন সত্তা? যদি আমরা অন্যের নির্দেশে আমাদের জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি, তবে স্বাধীনতার অর্থ অর্থহীন হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক হতে হবে সমমর্যাদার ভিত্তিতে—যেখানে ছোট-বড় ভেদাভেদ থাকবে না, থাকবে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ।

সময়ের অমোঘ নিয়মে রাজনীতির মঞ্চ থেকে এই মহীয়সী নেত্রীর প্রয়াণ ঘটলেও, তার রেখে যাওয়া আদর্শ ও সাহসিকতা বাংলাদেশের প্রতিটি দেশপ্রেমিক মানুষের হৃদয়ে অক্ষয় হয়ে থাকবে। আপসহীন নেত্রী হিসেবে তিনি কেবল গণতন্ত্রের জন্যই লড়াই করেননি, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে হিমালয়সম উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তার বিদায় মানে কেবল একজন ব্যক্তির চলে যাওয়া নয়, বরং একটি বলিষ্ঠ অধ্যায়ের সমাপ্তি—যে অধ্যায় আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে চরম প্রতিকূল সময়েও কোনো শক্তির কাছে মাথা নত না করে শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াতে হয়। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর সেই কালজয়ী উক্তি ‘বিদেশে আমাদের বন্ধু আছে, প্রভু নেই’—বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রতিটি বাঁকে ধ্রুবতারার মতো পথ দেখাবে। 

​পরিশেষে বলতে পারি কালজয়ী এই উক্তি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির জন্য একটি চিরন্তন কম্পাস। এটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে, একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই টেকসই হয় যখন তার পেছনে থাকে আত্মমর্যাদা। বন্ধুত্ব রাষ্ট্রকে সমৃদ্ধ করে, সহযোগিতা রাষ্ট্রকে গতিশীল করে; কিন্তু প্রভুত্ব বা দাসত্ব রাষ্ট্রের মর্যাদা ধূলিসাৎ করে দেয়। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কূটনীতির সাফল্য নির্ভর করবে এই চিকন সুতোর পার্থক্যটি বুঝে চলার ওপর। বেগম খালেদা জিয়ার এই রাষ্ট্রদর্শন তাই কেবল অতীতের কোনো স্লোগান নয়, বরং একটি সার্বভৌম ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়ার অবিনাশী মন্ত্র।

লেখক: ‎প্রভাষক ও প্রাবন্ধিক 

ঢাকা/তারা//

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়