ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ||  মাঘ ১ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নাগরিক সচেতনতা কেন জরুরি?

নেসার আমিন || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:৪৬, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬   আপডেট: ১২:৪৭, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬
সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নাগরিক সচেতনতা কেন জরুরি?

কোনো একটি নির্বাচনকে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করার জন্য নাগরিক সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের মৌলিক ভিত্তি। যেহেতু সচেতন নাগরিকরা নির্বাচনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান রাখেন, তাই তারা ভোট কারচুপি, প্রতারণা বা ভয়ভীতি প্রদর্শন ও নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরি করতে পারেন। এ ধরনের সচেতনতা শুধু ভোটাধিকার সম্পর্কে জানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ভোটারদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা, প্রার্থীদের প্রচারিত তথ্যের সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত থাকার বিষয়ও রয়েছে। সচেতন জনগণ নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সংঘটিত অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেন এবং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারেন।

বাংলাদেশের নির্বাচনি ব্যবস্থায় নাগরিক সচেতনতার অভাবের প্রভাব স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়। অনেক ভোটার এখনো নির্বাচন প্রক্রিয়ার মৌলিক দিকগুলো সম্পর্কে সচেতন নন, যার ফলে তারা সহজেই বিভ্রান্তি, অপতথ্য এবং প্রভাবশালীদের প্রতারণার শিকার হন। অতীতের অনেক নির্বাচনে দেখা গেছে, সাধারণ জনগণ বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নানা ধরনের চাপ ও প্রলোভনের মুখে পড়েছে, যা তাদের স্বাধীন ভোটাধিকার প্রয়োগে বাধা সৃষ্টি করেছে। একইসঙ্গে, জালভোট, কেন্দ্র দখল, প্রশাসনিক দুর্নীতি ও পক্ষপাতিত্বের মতো সমস্যাগুলোও প্রতিনিয়ত উঠে এসেছে, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। জনগণের সচেতনতার অভাবের ফলে এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি, বরং অনেক ক্ষেত্রে এগুলোকে স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবে মেনে নেওয়া হয়েছে।

আরো পড়ুন:

নির্বাচনি সচেতনতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী ও তরুণদের সম্পৃক্ত করা দরকার। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী, যেমন, নিম্ন আয়ের মানুষ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, কিংবা নিরক্ষর ভোটাররা প্রায়ই ভোটের অধিকার ও নির্বাচনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা রাখেন না, ফলে তারা সহজেই বিভ্রান্তি, ভুল তথ্য বা প্রতারণার শিকার হতে পারেন। এদের সচেতন করা না গেলে নির্বাচন কারচুপি, ভোট কেনাবেচা ও ভয়ভীতির প্রবণতা বৃদ্ধি পায়, যা পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করতে পারে। 

একইভাবে, তরুণ প্রজন্ম হলো জাতির ভবিষ্যৎ। তারা গণতন্ত্র সুসংহত করার মূল চালিকাশক্তি। তরুণদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা গেলে তারা শুধু দায়িত্বশীল ভোটার হিসেবেই গড়ে উঠবে না, বরং সমাজে অন্যদেরকেও সচেতন করতে ভূমিকা রাখবে। তরুণদের মধ্যে ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা হলে তারা ভবিষ্যতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সক্রিয় নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে। তাই পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী ও তরুণদের নির্বাচন বিষয়ে সচেতন করার জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ, নাগরিক সংগঠন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যৌথ প্রচেষ্টা জরুরি, যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে।

একটি গ্রহণযোগ্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত্তি হলো জনগণের স্বাধীন মতপ্রকাশ ও পছন্দের প্রতিনিধিকে নির্বাচিত করার সুযোগ। যখন ভোটাররা যথাযথ তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তখন যোগ্য ও নীতিনিষ্ঠ প্রার্থীদের নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়, ফলে সরকার জনগণের প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে পারে। এ ধরনের নির্বাচন ব্যবস্থা সমাজে আস্থার পরিবেশ তৈরি করে, যা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক শান্তি বজায় রাখতে সহায়ক হয়। বিপরীতে, যদি জনগণের সচেতনতার অভাব থাকে, তবে নির্বাচনি ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনি সংস্কার উদ্যোগের বাস্তবায়নেও নাগরিকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে নির্বাচন কমিশন, ভোটার তালিকা ব্যবস্থাপনা, ইভিএম ব্যবহার, নির্বাচনি নিরাপত্তা ও ভোট গ্রহণ পদ্ধতি নিয়ে নানা ধরনের বিতর্ক রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং নির্বাচনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি, যাতে সঠিক সংস্কারের জন্য চাপ সৃষ্টি করা যায়। কেবল আইন ও বিধিনিষেধ প্রণয়ন যথেষ্ট নয়, সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে নাগরিকদের ভূমিকাও অপরিহার্য। 

নির্বাচনি সংস্কার যাতে কেবল নীতিগত কাগজপত্রে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবিক অর্থে কার্যকর হয়, সেজন্য জনগণের চাপ ও পর্যবেক্ষণ দরকার। নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে নাগরিকদের কণ্ঠস্বর শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি, নির্বাচনি প্রক্রিয়ার ওপর সক্রিয় নজরদারি বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বা প্রশাসনিক জটিলতা সংস্কারের ধারাবাহিকতা ব্যাহত করতে না পারে। কারণ, যদি নির্বাচন ব্যবস্থা ত্রুটিপূর্ণ থাকে এবং সঠিক সংস্কার বাস্তবায়ন না হয়, তবে এর সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হবে সাধারণ জনগণ। তারা বঞ্চিত হবে ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব থেকে, হারাবে গণতান্ত্রিক অধিকার|

বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে রাজনৈতিক পরিবেশ অস্থিরতা ও অনিয়মের শিকার, সেখানে নাগরিকদের সচেতনতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণ নির্বাচন ব্যবস্থার সুষ্ঠুতা নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখার অন্যতম প্রধান উপায়, যা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে। নাগরিকদের দায়িত্ব শুধু ভোট দেওয়া নয়, বরং পুরো নির্বাচনি প্রক্রিয়ার প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখা এবং যে কোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া। এ জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন এবং রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে সাধারণ জনগণকে নির্বাচনি অধিকার ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দেওয়া, যাতে তারা নিজেদের সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে নিতে পারে এবং প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে পারে।

নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করতে এবং নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারে সচেতন নাগরিকদের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলো গণতান্ত্রিক নীতিমালার রক্ষক হিসেবে কাজ করে, স্বাধীন পর্যবেক্ষক হিসেবে তারা নির্বাচনি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তারা ভোটার নিবন্ধন, প্রচারণা, ভোটগ্রহণ এবং ফলাফল ঘোষণার প্রতিটি ধাপে তদারকি করে, যাতে কোনো অনিয়ম বা কারচুপি না ঘটে। নির্বাচনের দিন, ভোটকেন্দ্র্রে পর্যবেক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে যে কোনো অনিয়ম নথিভুক্ত করা এবং কারচুপিমূলক কার্যক্রম প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়। তাদের উপস্থিতি নির্বাচনে কারসাজি নিরুৎসাহিত করতে পারে এবং নির্বাচনের গুণগত মান সম্পর্কে একটি নিরপেক্ষ মূল্যায়ন প্রদানের মাধ্যমে নির্বাচনের বিভিন্ন ত্রুটি উত্তরণে সহায়তা করে। এ ছাড়া, তারা ভোটারদের শিক্ষিত করতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে, যাতে নাগরিকরা তাদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা লাভ করে এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দ্বারা বিভ্রান্ত বা প্রতারিত না হয়। 

নাগরিক সমাজ সাধারণ জনগণ ও নির্বাচনি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবেও কাজ করে। তারা বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে সংলাপের ব্যবস্থা করে, যাতে নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পায় এবং জনগণের আস্থা তৈরি হয়। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের সঙ্গে নাগরিকদের সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি করতে নাগরিক সমাজ সংলাপ ও সভা আয়োজন করতে পারে। এটি ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বাড়ায় এবং প্রার্থীদের নির্বাচনি অঙ্গীকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করে। 

একইসঙ্গে, নাগরিক সমাজ গণমাধ্যমের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করে, যাতে ভোটাররা বিভ্রান্তিকর তথ্য ও অপপ্রচারের শিকার না হন। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে নাগরিক সমাজ শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে, যাতে নির্বাচনি সহিংসতা প্রতিরোধ করা যায় এবং রাজনৈতিক উত্তেজনার অবসান ঘটে।

সামগ্রিকভাবে, নাগরিক সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণই গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে পারে। তারা শুধু নির্বাচনের দিন পর্যবেক্ষণের মধ্যে নিজেদের ভূমিকা সীমাবদ্ধ না রেখে দীর্ঘমেয়াদি নির্বাচনি সংস্কার, ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে নাগরিক সমাজ কাজ করতে পারে। নির্বাচনি প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করতে হলে নাগরিক সমাজকে আরও সক্রিয়ভাবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নাগরিক অধিকারের পক্ষে কাজ করতে হবে, যাতে একটি গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়।

লেখক: প্রাবন্ধিক, সহযোগী সমন্বয়কারী, সুজন

ঢাকা/তারা//

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়