বাজার থেকে উধাও গ্যাস সিলিন্ডার, চরম ভোগান্তিতে রাজধানীবাসী
রায়হান হোসেন || রাইজিংবিডি.কম
গ্যাস সিলিন্ডারের সরবরাহ না পেয়ে দোকান বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন অনেক ব্যবসায়ী
এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর রাজধানীর খুচরা বাজারে হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেছে গ্যাস সিলিন্ডার। গতকাল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কার্যালয়ে এক বৈঠকের পর সারা দেশে এলপিজি বিপণন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট প্রত্যাহার করেছে সংগঠনটি। তবু, সরকার নির্ধারিত দামে বাজারে মিলছে না এলপিজি সিলিন্ডার। বাধ্য হয়ে অনেকেই ১ হাজার ৩০০ টাকার সিলিন্ডার এখন কিনছেন ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায়। এমন পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে অনেক পরিবার বৈদ্যুতিক চুলা কিনছে। যারা বাড়তি দামে এলপিজি সিলিন্ডার বা বৈদ্যুতিক চুলা নিতে পারছেন না, তারা বাধ্য হয়ে মাটির চুলায় রান্না করছেন কিংবা রেস্তোরাঁয় খাবার খাচ্ছেন। অতি দ্রুত গ্যাস সংকটের অবসান না হলে নাগরিক অসন্তোষ দেখা দিতে পারে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
বেশি দামেও মিলছে না গ্যাস, রান্নার জন্য হাহাকার
রাজধানীর খুচরা বাজারগুলোতে এলপিজি গ্যাসের তীব্র সংকটে নাভিশ্বাস উঠেছে সাধারণ মানুষের। সরকার নির্ধারিত মূল্যের দ্বিগুণ দিয়েও মিলছে না রান্নার এই প্রয়োজনীয় জ্বালানি। রাজধানীর পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোতে সিলিন্ডারের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করেও শেষ পর্যন্ত খালি হাতে ফিরছেন গ্রাহকরা। রান্নার বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না থাকায় চরম বিপাকে পড়া নগরবাসী বাধ্য হয়ে ঝুঁকছেন বৈদ্যুতিক চুলা কিংবা রেস্তোরাঁর খাবারের ওপর।
শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) রাজধানীর রায়ের বাজার, হাজারীবাগ, জিগাতলাসহ বিভিন্ন আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিন-চার দিন ধরে একেবারেই গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। এর ফলে অনেকে বাধ্য হয়ে বাইরে রেস্তোরাঁয় খাবার খাচ্ছেন এবং অনেকে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছেন।
রায়ের বাজারের বাসিন্দা সাফাত ইসলাম রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেছেন, “বাসার লাইনে গ্যাস নেই চার-পাঁচ দিন ধরে। বাজারে সিলিন্ডার পাচ্ছি না। কয়েক দিন বাইরে খাবার খেয়েছি। আজ মোহাম্মদপুর থেকে অনেক খোঁজাখুঁজি একটা গ্যাস সিলিন্ডার পেয়েছি। তবে, দাম দ্বিগুণ রেখেছে। আগে দাম ছিল ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা, আজকে ২ হাজার ২০০ টাকায় নিয়েছি। কোনো উপায় নেই। না খেয়ে তো আর বাঁচা যাবে না। আসলে সরকার ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি। কোনো সরকারই ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ভাঙতে পারেনি। তারপরও সরকারের কাছে অনুরোধ করব, এরকম অবস্থা চলতে পারে না। মানুষ বেশি সমস্যায় পড়লে পরে আন্দোলনে যেতে পারে। তাই, অতি দ্রুত গ্যাস সংকটের সমাধান করা উচিত।
হাজারীবাগের ব্যবসায়ী সাগর হোসেন রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেছেন, “গ্যাসের দাম বাড়ানো ক্ষেত্রে আমাদের কোনো হাত নেই। আমরা যে দামে কিনি, তার থেকে সামান্য কমিশন রেখে বিক্রি করে দেই। এখানে বড় বড় কোম্পানির হাত আছে। তারা এখন সাপ্লাই দিচ্ছে না। বাজারে এখন চাহিদা থাকা সত্ত্বেও এলপিজি সিলিন্ডারের সাপ্লাই নেই। এই সময়ে সাধারণত বাসা-বাড়িতে গ্যাসের লাইনে চাপ থাকে না। তাই, অনেকে এলপিজি সিলিন্ডার কিনে। কিন্তু, আমরা দিতে পারছি না। আমাদের দোষারোপ করে কোনো লাভ নেই। যারা দাম বাড়ায়, তাদের সাথে কথা বলেন। এখন আমাদের সাধারণ মানুষেরও কথা শুনতে হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী, চলতি মাসের মধ্যে এই সংকট কাটার সম্ভাবনা খুব কম।”
এলপিজি সিলিন্ডার উধাও, বেড়েছে বৈদ্যুতিক চুলার চাহিদা
রাজধানীর বাজারে এলপিজি সিলিন্ডারের তীব্র সরবরাহ সংকট দেখা দেওয়ায় রান্নার বিকল্প হিসেবে এখন বৈদ্যুতিক চুলার ওপরই ভরসা করছেন সাধারণ মানুষ। ফলে, রাজধানীর ইলেকট্রনিক্স পণ্যের দোকানগুলোতে বৈদ্যুতিক চুলার চাহিদা রাতারাতি কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। এ সুযোগে ব্যবসায়ীরা বৈদ্যুতিক চুলার দামও বাড়তি নিচ্ছে।
রাজধানীর চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটের নিচ তলায় গৃহস্থলি মার্কেটে বৈদ্যুতিক চুলার কিনতে আসা গৃহিণী সাহেলা আক্তার এ প্রতিবেদককে বলেন, “বাসার লাইনে গ্যাস নাই গত ৪-৫ দিন থেকে। প্রথম দুই দিন হোটেল থেকে খাবার কিনে খেয়েছি। আজকে রাইস কুকার ও বৈদ্যুতিক চুলা কিনতে এসেছি। সাধারণ সময়ের থেকে এখন বৈদ্যুতিক চুলার দামও বেশি রাখছেন ব্যবসায়ীরা। আগে যে বৈদ্যুতিক চুলা বিক্রি হয়েছে ২ থেকে আড়াই হাজার টাকায়, আজকে দাম চাচ্ছে ৪ হাজার টাকা। কিছু করার নাই। বাধ্য হয়ে নিতে হচ্ছে।”
চন্দ্রিমা মার্কেটের সিয়াম এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী সিয়াম চৌধুরী রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেছেন, “গত এক সপ্তাহে বৈদ্যুতিক চুলার চাহিদা বেড়েছে। চাহিদা অনুযায়ী ক্রেতাদের দিতে পারছি না। তবে, অর্ডার দিলে কোম্পানিগুলো সময়মতো দিয়ে যায়। আপনি যে দাম বাড়তি রাখার কথা বলছেন, এটা সত্য নয়। সাধারণ ক্রেতারা একটু বাড়িয়ে বলছে। তবে, কেউ যে বেশি দাম রাখছে না, এটা বলা যাবে না। অনেক অসাধু ব্যবসায়ী আছে, সুযোগে বেশি ব্যবসা করতে চায়। সরকারের উচিত অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া।”
ব্যাচেলরদের ভরসা রেস্তোরাঁ
গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন মেসে থাকা শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী তরুণরা। খুচরা বাজারে গ্যাস সিলিন্ডার উধাও হয়ে যাওয়ায় অনেক মেসে কয়েকদিন ধরে রান্না পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি দিয়েও গ্যাস না পেয়ে বাধ্য হয়ে খাবারের জন্য এই বিশাল ব্যাচেলর জনগোষ্ঠী এখন রেস্তোরাঁগুলোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। লাইনের গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এ সংকট ব্যাচেলরদের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।
রাজধানীর হাজারীবাগে মেসে থাকেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেদার ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী আয়ান রহমান। তিনি বলেন, “তিন দিন হলো আমাদের খালাকে ছুটি দিয়েছি। বাসার লাইনে গ্যাস নেই, তাই রান্না হচ্ছে না। বাড়তি দামে যে এলপিজি সিলিন্ডার নেবো, সে টাকাও নেই। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। তাই, বাধ্য হয়ে রেস্তোরাঁতে সব বেলার খাবার খাচ্ছি। সামনে পরীক্ষা আছে। তা না হলে বাড়ি চলে যেতাম।”
রাজধানীর জিগাতলায় মেসে থাকেন বেসরকারি চাকরিজীবী নোমান হাসান। তিনি রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “বাসায় লাইনের গ্যাস নেই। তাই, কষ্ট করে হলেও বাইরে খেতে হচ্ছে। চুলা একেবারে জ্বলে না। আমাদের খালা ছুটিতে আছেন। ঢাকায় এবারের মতো গ্যাস সংকট দেখিনি। এলপিজি সিলিন্ডারের দাম দ্বিগুণ। সবাই মিলে রেস্তোরাঁয় খাচ্ছি।”
গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেছেন, এলপিজির মূল্য অস্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা দায়ী। এটা সাময়িক সমস্যা এবং ধীরে ধীরে কমে যাবে। অস্বাভাবিকভাবে এলপিজির দাম বাড়ানো ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট করা হচ্ছে। যারা দোকান বন্ধ রেখেছেন, সেগুলোও খোলার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
এদিকে, তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, আমিন বাজারে তুরাগ নদীর তলদেশে মালবাহী ট্রলারের নোঙরের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত গ্যাস সরবরাহের পাইপলাইন মেরামত করা হয়েছে। তবে, মেরামতের সময় পাইপলাইনে পানি ঢুকে যাওয়ায় এবং একই সময়ে ঢাকা শহরে গ্যাসের সরবরাহ কম থাকায় ঢাকা মহানগরীতে গ্যাসের মারাত্মক স্বল্পচাপ বিরাজ করছে। গ্যাসের স্বল্পচাপ সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।
সাময়িক অসুবিধার জন্য গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি।
ঢাকা/রফিক