জামায়াত জোট ছাড়ল ইসলামী আন্দোলন
‘আমিরের অপমান’ ও আসন ভাগাভাগিই মূল কারণ
মোহাম্মদ নঈমুদ্দীন || রাইজিংবিডি.কম
ছবি সংগৃহীত
ইসলামী দলগুলোর সম্মিলিত ভোটের ‘ওয়ান বাক্স’ নীতি গ্রহণ করে একসঙ্গে নির্বাচন, পরবর্তী সরকার গঠনের স্বপ্ন নিয়ে গড়া ১১ দলীয় জোট থেকে শেষ মুহূর্তে বেরিয়ে গেল চরমোনাইপীরের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।এজন্য জামায়াতে ইসলামীকে দায়ী করেছে দলটি।
জামায়াতের বিরুদ্ধে জোটের বৃহত্তর শরিকদল ইসলামী আন্দোলনের আমিরকে কথায় কথায় অপমান অপদস্থ করে গুরুত্বহীন মনে করা, জোটের সঙ্গে আলোচনা না করে ইসলামী দলগুলোর ওয়ান বাক্সনীতি অনুযায়ী ইসলামী রাষ্ট্র কায়েমের খেলাফ বিএনপির সঙ্গে মিলেমিশে সরকার গঠনের লক্ষ্যসহ নানা অভিযোগ তুলেছে দলটি। এসব কারণে শেষ মুহূর্তে ১১ দলীয় জোট থেকে সংবাদ সম্মেলন করে বেরিয়ে যায় ইসলামী আন্দোলন।তবে যেসব অভিযোগ করে ইসলামী আন্দোলন জোট থেকে বেরিয়ে গেছে, তার সঙ্গে মূল কারণ হলো আসন ভাগাভাগি।
ইসলামী আন্দোলনের নেতারা জানান, কথা ছিল জোটের নেতারা সবাই মিলে সংসদীয় আসন যাচাই-বাছাই করে যে যেখানে শক্তিশালী সে সেখানে মনোনয়ন পাবে। এভাবে আসন ভাগাভাগির বিষয়টি আলোচনা হয়।কিন্তু নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসে ততই ইসলামী আন্দোলনকে অবহেলা করতে থাকে জামায়াত।তারা বড় দল হিসেবে বেশি আসন নেওয়ার বিষয়টি দলগুলোর ওপর চাপিয়ে দেয়।ক্ষেত্রবিশেষ ছোট দলগুলোকেও ভেতরে ভেতরে এ বিষয়ে ম্যানেজ করে রাখে।ইসলামী আন্দোলন তাদের প্রার্থী তালিকা জমা দিয়ে সেখান থেকে যাচাই-বাছাই করে কমপক্ষে ৬০টি আসন দাবি করে।কিন্তু জামায়াত জোট ৪০ আসনে রাজি হয়। পরবর্তী এ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। কে কাকে আসন দেবে এ নিয়ে স্নায়ুযুদ্ধও চলে দল দুটির নেতাদের মধ্যে। কথা উঠে, ইসলামী আন্দোলন যেটা ন্যায্য সেটা নেবে, এখানে জামায়াত আসন দেওয়ার কে? একপর্যায়ে জোট ভাঙার গুঞ্জন শুরু হয়। জামায়াতসহ দলগুলোর নেতারা আসন সমঝোতা করতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন।বৈঠকের পর বৈঠক চলে। ইসলামী আন্দোলনকে ৪৫ আসন পর্যন্ত ছেড়ে দেওয়ার কথা চাওর হয়।এর মধ্যে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করে মিলেমিশে সরকার গঠনের প্রস্তাব দিলে ইসলামী আন্দোলন আরো ক্ষুব্ধ হয়।এর মধ্যেই আসন বণ্টনের বিষয়টি সামনে আসে।
সমঝোতার চেষ্টা চলে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ জোটের নেতাদের মধ্যে।একাধিক বৈঠক করে যেকোনো মূল্যে জোট ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়।
অভিযোগ আছে, ইসলামী আন্দোলন কমপক্ষে ৫০টি আসন চাইলেও জামায়াতের বিরোধিতায় জোট তাতে রাজি হয়নি। অন্যদিকে ৫০টির কম আসন নিয়ে জোটে থাকতে রাজি নয় ইসলামী আন্দোলনও।এমন পরিস্থিতিতে ইসলামী আন্দোলন, জাগপা ও খেলাফত আন্দোলনের জন্য ৪৭টি আসন রেখে আসন ভাগাভাগি করে নেয় জামায়াতসহ শরিক দলগুলো। বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলন করে আসন বণ্টন তালিকা ঘোষণা করে জামায়াতসহ দশ দলের নেতারা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন না ইসলামী আন্দোলনের কেউ। তখনই দলটির জোট ছাড়ার গুঞ্জনের ডালপালা মেলে।আসন সমঝোতা না হওয়ায় একদিন পরেই শুক্রবার ইসলামী আন্দোলন সংবাদ সম্মেলন করে জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়।
১১ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য জামায়াত ইসলামকে দায়ী করে ইসলামী আন্দোলন বলেছে, দলের আমিরের প্রতি অপমানজনক আচার আচরণ, জোটের শরিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা ছাড়া প্রতিশ্রুত ইসলামী এক বাক্স ভোটনীতি বিরুদ্ধে গিয়ে কার্যকলাপ ও ইচ্ছামত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বিশেষ করে জোটের শরিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই নির্বাচন পরবর্তী বিএনপির সঙ্গে জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাবসহ নানা কারণে তারা এই জোটে না থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এদিকে, জামায়াতকে দায়ী করে ইসলামী আন্দোলনের অভিযোগের বিষয়ে সতর্ক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে জামায়াত।তারা ইসলামী আন্দোলনের বক্তব্য অসত্য বলে দাবি করেছে।
শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) রাতে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেছেন, “আজ বিকেলে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান সম্প্রতি খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের একটি সংগঠনের দায়িত্বশীল নেত্রীর বরাত দিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা সঠিক নয়। এ ব্যাপারে আমাদের পক্ষ থেকে প্রেস ব্রিফিং চলাকালেই তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।”
“গাজী আতাউর রহমান ‘আল্লাহর আইন ও ইসলামী আদর্শ থেকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ভিন্ন দিকে চলে গেছে’ বলে যে মন্তব্য করেছেন, তাও সঠিক নয়। আমরা মনে করি, জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই তিনি এমন মন্তব্য করেছেন।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ পর্যায়ের একজন নেতা বলেন, “১১ দলীয় জোটের ওয়ান বাক্স নীতির স্বপ্নদ্রষ্টা হলেন আমাদের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম।কিন্তু জামায়াত নেতাদের দ্বিচারিতাসহ একগুয়েমির কারণে আজ আমাদের এই ওয়ান বাক্স নীতির জোট থেকে বেরিয়ে যেতে হলো।এতে আমাদের ক্ষতি হলেও নির্বাচনি মাঠে জামায়াতেরও ক্ষতি হবে।তবে নির্বাচন পরবর্তী ভুল বুঝাবুঝি হলে তখন তো আরো বেশি ক্ষতি হতো। ফলে, আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন।”
শুক্রবার সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান জোট ছাড়ার কারণ তুলে ধরে বলেন, “প্রথম দিন থেকেই জামায়াত আমাদের আমির চরমোনাই পীরকে ইনসাল্ট করেছেন।তিনি জরিপের (একটি জাতীয় পত্রিকার জরিপ) কথা বলে আমাদের আমিরকে ইনসাল্ট করেছেন।সেদিনই আমাদের আমির বলেছেন, তাদের হয়তো মতলব ভালো না। আমরা দেখলাম শেষ পর্যন্ত তারা এই জরিপের মধ্যেই ছিলেন।তারা বলেছেন, আপনাদের তো অনেক আসন দেওয়া হয়েছে, জরিপে তো এত পার্সেন্ট না।”
“প্রচলিত আইনে ৫৪ বছর রাষ্ট্র পরিচালিত হয়েছে, এই আইন ব্যর্থ হয়েছে। আমরা সব সময় বলে এসেছি প্রচলিত আইনের পরিবর্তে আল্লাহর আইন, ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করি।এখন যদি দেখি প্রধান রাজনৈতিক শক্তি আল্লাহর আইন নয়, প্রচলিত আইন প্রতিষ্ঠার রাজনীতি করবেন,তখন আমাদের লক্ষ্য অর্জিত হবে না।জোটবদ্ধ ইসলামী সংগঠনগুলোর প্রতি আমরা শ্রদ্ধা জানাই। তবে তারাও যেন জামায়াতের এসব নীতির ব্যাপারে ক্লিয়ার হয়ে নেন।”
তিনি বলেন, “শুধু এই একটি কারণই নয়, রাজনৈতিক কারণের মধ্যে হচ্ছে আমরা যখন একই সঙ্গে নির্বাচন করব তখন উভয়ের পারস্পারিক সম্মানবোধ থাকতে হবে। জামায়াত নেতারা বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বলেছেন তারা ক্ষমতায় গেলে জাতীয় সরকার গঠন করবেন।আমাদের প্রশ্ন হল—তিনি একটি জোটে আছেন, এখানে জাতীয় সরকার হবে না কি সরকার হবে-এটা একটা মৌলিক প্রশ্ন। তিনি তো এই বিষয়টি আমাদের সঙ্গে আলোচনা করেননি। নির্বাচনের আগেই যদি সমন্বয় হয়ে যায় প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সাথে, তাইলে এই নির্বাচন পাতানো হবে কিনা, সমঝোতার হবে কিনা সেটিও সন্দেহ চলে আসে। ফলে আগামী দিনের সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে কিনা এই আশঙ্কা আমাদের মধ্যে আছে। যখন আস্থা, বিশ্বাস, শ্রদ্ধার জায়গা ভেঙে যায়, তখন জোট থাকে না।”
জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন গেলে লক্ষ্য অর্জন হবে না বলে মন্তব্য করেছেন গাজী আতাউর রহমান।
ঢাকা/এসবি