রাজধানীতে বাড়ছে ছিনতাই, ঠেকাতে তৎপর ডিএমপি
রাজধানীর অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়ক— কোথাও মিলছে না স্বস্তি। উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ছিনতাই। বিশেষ করে, ভোররাত এবং সন্ধ্যার পর নির্জন রাস্তাগুলোতে বেপরোয়া ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। মোবাইল ফোন ও নগদ টাকাসহ মূল্যবান জিনিসপত্র খোয়ানোর পাশাপাশি প্রাণ হারাচ্ছেন অনেকে।
গত ১৯ মার্চ সকাল ৯টার দিকে ঘটে তুরাগ থানাধীন এলাকায় বাজার থেকে রিকশায় করে বাসায় ফেরার পথে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন মুক্তা আক্তার। ছিনতাইকারীরা ব্যাগ ধরে টান দিলে রাস্তায় ছিটকে পড়েন ওই নারী। পরে তার মৃত্যু হয়।
নিহতের স্বামী লিমন হোসেন জানিয়েছেন, সকাল ৯টার দিকে বাজার শেষে অটোরিকশায় করে ফেরার সময় ছিনতাইকারীরা ব্যাগ ধরে টান দিলে মুক্তা ছিটকে রাস্তায় পড়ে গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা প্রথমে তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ওই দিন দুপুর ২টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) নিয়ে গেলে চিকিৎসক মুক্তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তারা দক্ষিণখান এলাকার ফায়দাবাদের একটি বাসায় ভাড়া থাকেন। নিহতের গ্রামের বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায়।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) রাতে তুরাগ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রফিকুল ইসলাম রাইজিংবিডি ডটকমকে জানিয়েছেন, ওই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। আসামিদের শনাক্ত করতে প্রযুক্তির সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে।
গত ১৪ জুলাই (মঙ্গলবার) মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোড এলাকায় ছিনতাইয়ের শিকার হন জাতীয় জাদুঘরের ফটোগ্রাফার সাঈদ হাসান তানিম। কাজ শেষে রাতে বাসায় ফেরার পথে ধারোলো অস্ত্র দেখিয়ে জিম্মি করে ক্যামেরাসহ মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। তানিম অস্ত্রের আঘাতে জখম হন।
এর আগে মোহাম্মদপুর থানা এলাকায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মহাপরিচালক আখতার হোসেন ছিনতাইয়ের শিকার হন। অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ছিনতাইকারীরা তার মোবাইল ফোন নিয়ে যায়। ভুক্তভোগী থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। পুলিশ তদন্ত করে ছিনতাইকারীদের গেপ্তার করে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) জুয়েল রানা বলেছেন, “দুটি ঘটনাই আমরা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি। অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মোহাম্মদপুর ও আশপাশের এলাকায় বিশেষ অভিযান অব্যাহত আছে।”
সম্প্রতি জান্নাতুল ফেরদৌস নামের এক নারী সন্ধ্যায় মুগদায় মায়ের বাসায় বেড়ানো শেষে মিরপুরে নিজ বাসায় ফিরছিলেন। মেট্রোরেলে যাওয়ার জন্য রিকশায় করে মতিঝিল শাপলা চত্বর এলাকা আসলে এক ছিনতাইকারী এক কানের দুল টান দিয়ে নিয়ে চলে যায়। এতে জান্নাতুল ফেরদৌসের কান ছিঁড়ে রক্তাক্ত হয়।
জান্নাতুল ফেরদৌস বলেছেন, “কয়েক মাস আগে একই জায়গা থেকে একইভাবে আমার মায়ের কানের দুল নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। তবে, পুলিশকে জানানো হয়নি। জানালে কানের দুল হয়ত ফেরত পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু শারীরিক ও মানসিক যে ক্ষতি হয়েছে, তা ফেরত দেবে কে?”
সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকায় বিভিন্ন বাস ও কাউন্টার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ইদানিং এ এলাকায় ছিনতাই বেড়েছে। এ কারণে বিভিন্ন দূর পাল্লার পরিবহন ছাড়ার আগে সুপারভাইজাররা যাত্রী সাধারণকে সতর্ক করে বলছেন, জানালার কাছে হাত নিয়ে মোবাইলে কথা বলবেন না। তাহলে যেকোনো সময় তা ছিনতাইকারী নিয়ে যেতে পারে।
ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার বলেছেন, “শুধু ছিনতাই নয়, জনগণের জানমালের নিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটাতে পারে, এমন দুষ্কৃতকারীদের গ্রেপ্তারে অভিযানের পাশাপাশি ব্যাপক গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত আছে। ছিনতাই নিয়ন্ত্রণে পুলিশের প্রতিটি সদস্যকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”
ডিএমপির এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজধানীর ৫০ থানা এলাকায় তিন মাসে ছিনতাইয়ের মামলার সংখ্যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে। তবে, অনেক ভুক্তভোগী আইনি ঝামেলার ভয়ে অভিযোগ করেন না। তাই, প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে।
সম্প্রতি ডিএমপির এক বৈঠকে ছিনতাইসহ অন্যান্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখতে থানার অফিসার ইনচার্জদের (ওসি) বিশেষ বার্তা দেওয়া হয়েছে।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর মিরপুর, উত্তরা, বনানী, যাত্রাবাড়ী, ফার্মগেট, বিভিন্ন ফ্লাইওভার ও কারওয়ান বাজার-সংলগ্ন এলাকা ছিনতাইয়ের হটস্পট। ‘টানা পার্টি’র সক্রিয়তাও রয়েছে এসব এলাকায়। তারা মোটরবাইক ও প্রাইভেটকার ব্যবহার করে টান দিয়ে জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিয়ে যায়। ভোরে বাসস্ট্যান্ডগামী যাত্রীদের টার্গেট করছে স্থানীয় কিশোর গ্যাং ও ভবঘুরে মাদকাসক্তরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত কয়েক সপ্তাহে ডিএমপির আটটি ক্রাইম বিভাগ একযোগে অভিযান চালিয়ে শতাধিক পেশাদার ছিনতাইকারী ও কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র ও লুণ্ঠিত মালামাল। নগরীর প্রবেশপথ ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে অস্থায়ী চেকপোস্টের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। ডিএমপির কুইক রেসপন্স টিম এবং বাইক টহল দল নিয়মিতভাবে অলিগলিতে তল্লাশি চালাচ্ছে। ডিএমপির কন্ট্রোল রুম থেকে রাজধানীর প্রধান মোড়গুলোর সিসিটিভি ফুটেজ রিয়েল-টাইম মনিটর করা হচ্ছে। সন্দেহভাজন বাইক আরোহীদের গতিবিধি লক্ষ করে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে, ভোররাতে বাসস্ট্যান্ড ও রেল স্টেশন এলাকায় ডিবির বিশেষ টিম মোতায়েন থাকছে।
অন্যদিকে, কারাগার থেকে সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পাওয়া পেশাদার ছিনতাইকারীদের ওপর বিশেষ নজরদারি করা হচ্ছে। তাদের বর্তমান অবস্থান ও কার্যক্রম যাচাই করতে থানা পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে, ডিএমপি সাধারণ নাগরিকদের কিছু নিরাপত্তা সতর্কতা অবলম্বনের অনুরোধ জানিয়েছে।
সেগুলো হলো—নির্জন রাস্তায় একা চলাচলের সময় মোবাইল ফোন ব্যবহারে সতর্ক থাকা, রিকশায় যাতায়াতের সময় ব্যাগ ও মূল্যবান সামগ্রী সাবধানে রাখা,কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় জরুরি সেবার নম্বরে ৯৯৯-এ কল করা বা নিকটস্থ থানায় অবহিত করা।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আশরাফুল হুদা বলেছেন, “ছিনতাই দমনে কেবল অভিযানই যথেষ্ট নয়; বরং কিশোর গ্যাং কালচার বন্ধ এবং মাদকের সহজলভ্যতা রোধ করা জরুরি। এক্ষেত্রে আইনের কঠোর প্রয়োগ বা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে এই জাতীয় অপরাধীদের বিষয়ে প্রতিটি নাগরিককে আরো সচেতন থাকতে হবে।”
ঢাকা/রফিক