ঢাকা     শনিবার   ৩০ মে ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ১৬ ১৪৩৩ || ১৪ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

নির্ধারিত দামের চেয়ে কমে বিক্রি, লোকসানে মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীরা

রায়হান হোসেন  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:৪৭, ২৯ মে ২০২৬   আপডেট: ২০:১১, ২৯ মে ২০২৬
নির্ধারিত দামের চেয়ে কমে বিক্রি, লোকসানে মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীরা

চামড়া সংগ্রহ করছেন মৌসুমী ব্যবসায়ীরা। ছবি: রাইজিংবিডি

পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দের মধ্যে প্রতিবছরের মতো এবারও বিষাদের ছায়া নেমে এসেছে কোরবানির কাঁচা চামড়ায় জড়িত মৌসুমী ব্যবসায়ীদের মনে। সরকার প্রতিটি লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। 

শুক্রবার (২৯ মে) রাজধানীর নিউমার্কেট, আজিমপুর ও মোহাম্মদপুর এলাকায় ঘুরে মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা গত বছরের তুলনায় এবছর চামড়ার দাম অনেক কম পেয়েছে। রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় ঈদের দ্বিতীয় দিন কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করছিলেন জাকের আলী। তিনি রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, ‘‘আমি গতকাল ৮০০ টাকা দরে বড় সাইজের চামড়া সংগ্রহ করেছি। কিন্তু বিক্রি করতে গিয়ে দাম পাইনি। শেষে বাধ্য হয়ে ৭০০ টাকা করে বিক্রি করেছি। এখন পর্যন্ত আমার দুই হাজার টাকা লোকসান হয়েছে।’’

জাকের আলী দশ বছর ধরে কোরবানির চামড়ার ব্যবসা করছেন উল্লেখ করে বলেন, ‘‘এবারের মত এত ক্ষতির সম্মুখীন কখনো হইনি। সরকার একটা দাম নির্ধারণ করে দিলেও বড় ব্যবসায়ীরা আমাদের মত মৌসুমী ব্যবসায়ীর কাছ থেকে সেই দামে নিচ্ছে না।’’ 

মোহাম্মদপুর এলাকায় কোরবানির চামড়া সংগ্রহ করেন মো. সোহেল খান। তিনি বলেন, ‘‘আমি গত ৬ বছর ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এবারের মত এত খারাপ কখনো হয়নি। যারা কোরবানি দিচ্ছে তাদের কাছ থেকে আমরা সরকারের নির্ধারিত দামে চামড়া নিয়ে এলেও বড় ব্যবসায়ীরা আমাদেরকে সরকার নির্ধারিত দাম দিচ্ছে না।’’

এই ব্যবসায় অনেক পরিশ্রম। কষ্ট করার পরও যদি ব্যবসা না হয় তাহলে কী লাভ? প্রশ্ন করেন তিনি। 

ধানমন্ডির বাসিন্দা জামাল চৌধুরী। এবার তিনি দুইটি বড় গরু কোরবানি দিয়েছেন। রাইজিংবিডি ডটকমকে তিনি বলেন, ‘‘প্রতিবছর কোরবানির চামড়া বিক্রি করে মাদ্রাসায় দান করে দেই। গত বছরে তুলনায় এবার ব্যবসায়ীরা দাম খুব কম দিয়েছে। ওই টাকা মাদ্রাসায় দিতে নিজেরও লজ্জা লাগে। কোরবানির চামড়ার দাম এত কম হলে কীভাবে হয়। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে চামড়ার অনেক দাম। কিন্তু আমাদের দেশেই দাম পাওয়া যায় না। অথচ চামড়ার জিনিস কিনতে যান, তখন আপনার কাছ থেকে বেশি দাম নেবে।’’

একই কথা বলেন রাজধানীর আজিমপুরের বাসিন্দা হাজী শরীয়তুল্লাহ নিজামী। তিনি মৌসুমী ব্যবসায়ীরা দাম কম বলায় মাদ্রাসায় চামড়া দান করে দিয়েছেন বলে জানান। 

গত ১৩ মে চামড়া খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করে চামড়া দাম নির্ধারণ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। এবার ঢাকায় গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬২ থেকে ৬৭ টাকা, যা গত বছর ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। সাধারণত বড় আকারের গরুর চামড়া ৩১ থেকে ৪০ বর্গফুট, মাঝারি আকারের গরুর চামড়া ২১ থেকে ৩০ এবং ছোট আকারের গরুর চামড়া ১৬ থেকে ২০ বর্গফুটের হয়। এই হিসাবে লবণযুক্ত ছোট আকারের এক পিস চামড়ার দাম ৯৯০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। মাঝারি আকারের লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকা এবং বড় আকারের লবণযুক্ত গরুর চামড়া ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। 

কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে লবণ ও শ্রমিকের মজুরি বাবদ গড়ে ৩৫০ টাকা খরচ হয়। সেই হিসাবে ঢাকার বাজারে ছোট চামড়া ৬৫০-৮৫০ টাকা এবং বড় চামড়া ১৫৫০-২৩০০ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা। কিন্তু বাজারে কাঁচা চামড়া কম দামে বিক্রি হওয়ার পরও এ বছর অনেক চামড়া নষ্ট হওয়া এবং লোকসানের আশঙ্কা করছেন মৌসুমী ব্যবসায়ীরা।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, এ বছর কোরবানির পশুর চাহিদা প্রায় ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার। সেখানে গরু-ছাগলসহ কোরবানির জন্য প্রস্তুত ছিল প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৪ হাজার পশু। এবার কোরবানি কম হতে পারে এমন ধারণা আগে থেকে করছিলেন ট্যানারির মালিকেরা। এ জন্য তারা সব মিলিয়ে ৭৫ থেকে ৮০ লাখ পিস চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন। গতবার এই লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮০ থেকে ৮৫ লাখ পিস।

চামড়ার বাজার সম্পর্কে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মো. শাহীন আহমেদ রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, ‘‘আসলে আমরা তো ট্যানারির মালিক, তাই সরাসরি মাঠপর্যায়ে মার্কেটিং বা চামড়া সংগ্রহ করতে পারি না। আমরা মূলত ঢাকার চামড়াগুলো বিভিন্ন এতিমখানা এবং মাদ্রাসা থেকে সংগ্রহ করেছি। গতকাল রাত পর্যন্ত আমাদের কাছে যে তথ্য এসেছে, সেই অনুযায়ী প্রায় ৩ লাখ পিস চামড়া সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে প্রবেশ করেছে। এছাড়া কাঁচা চামড়ার আড়তগুলোতে আরও প্রায় দেড় লাখ পিস চামড়া সংগ্রহ হয়েছে।’’

সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া বিক্রি না হওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘আমি অনেকের সাথেই কথা বলেছি, নির্ধারিত দামের চেয়ে কিছুটা কম দামেই বেচাকেনা হচ্ছে। তবে এই দাম কম হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ, কোরবানিদাতারা বা মৌসুমী ব্যবসায়ীরা যদি ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা পর লবণ ছাড়া কাঁচা চামড়া বাজারে নিয়ে আসেন, তবে সেটির গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়। বাতাসে ও গরমে চামড়ার পশম উঠে যায়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এর বাজারমূল্য কমে যায়।’’

তিনি আরো বলেন, ‘‘এখানে আরেকটি বড় বিষয় হলো মৌসুমী ব্যবসায়ীদের ‘বার্গেনিং পাওয়ার’ বা দরদাম করার সক্ষমতা। তারা যদি চামড়াটি কেনার পরপরই দ্রুত লবণ দিয়ে রাখতেন, তবে তারা আড়তদার বা ট্যানারির কাছে ভালো দাম দাবি করতে পারতেন। কিন্তু চামড়া সংরক্ষণ করার মতো কোনো বিকল্প ব্যবস্থা বা অপশন না থাকার কারণে মৌসুমী ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়েই কিছুটা কম দামে চামড়া কেনাবেচা করেছেন।’’

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মো. শাহীন আহমেদ বলেন, ‘‘ঈদের আগে আমরা যে ৭৫ থেকে ৮০ লাখ পিস চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার কথা বলেছিলাম। সরকার যদিও ১ কোটিরও বেশি পশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত রেখেছিল, কিন্তু বাস্তবে এবার ৭৫ থেকে ৮০ লক্ষের মতোই পশু কোরবানি হয়েছে। আমাদের আগের ধারণাই সত্যি হয়েছে। দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা অনেকাংশে কমে যাওয়ার কারণেই এবার পশু কোরবানি কম হয়েছে। আর এই কারণেই গত বছরের তুলনায় এবার আমাদের চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রাও কিছুটা কম।’’

ঢাকা/রায়হান//

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়