ঢাকা     রোববার   ০৫ এপ্রিল ২০২৬ ||  চৈত্র ২২ ১৪৩২ || ১৬ শাওয়াল ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

গলির মোড়ে শিমুল তুলা

শাহনেওয়াজ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৪:৪৮, ৩১ জানুয়ারি ২০১৭   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
গলির মোড়ে শিমুল তুলা

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে মোহাম্মদী হাউজিং লিমিটেডের ৫ নম্বর সড়কের মোড়ে তুলাসহ মোহাম্মদ আলী (ছবি: খান মো. শাহনেওয়াজ)

খান মো. শাহনেওয়াজ : বাংলাদেশের নাগরিক জীবনযাত্রায় ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে শিমুল তুলা। কৃত্রিম অনেক কিছু বাজারে আসার পরও এর কদর কমেনি।

শিমুল তুলার ব্যবহার মূলত বালিশ, লেপ, তোশকে। কিন্তু চাহিদা অনুপাতে জোগান কম থাকায় এবং দাম চড়া হওয়ায় শিমুল তুলার বিকল্প হিসেবে বাজারে এসে যায় কৃত্রিম তুলা। আখের ফুল ও কাপড় থেকে আহরিত হতে থাকে বিকল্প তুলা। দেশে পোশাক খাতে ব্যাপক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে গার্মেন্টস কারখানার ঝুট কাপড় থেকে তৈরি হতে থাকে তুলা। বর্তমান বাজারে লেপ-তোশক তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় ঝুট তুলা। দামে কম হওয়ায় এবং সহজলভ্য হওয়ায় লেপ-তোশকে একচেটিয়া জায়গা করে নিয়েছে ঝুট তুলা।

কিন্তু শিমুল তুলা ? প্রাকৃতিক উপায়ে উৎপন্ন হওয়া শিমুল তুলার কদর এতটুকুও কমেনি। জোগান কম হওয়ায় দাম চড়া। ফলে ধনাঢ্য ও  সচ্ছল পরিবারে এর ব্যবহার সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। রাজধানীতে শিমুল তুলার বেজায় কদর। কিন্তু বলতে গেলে এটি প্রায় দুষ্প্রাপ্য। এই দুষ্প্রাপ্য জিনিসটিই ঢাকায় ফেরি করে বিক্রি করেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানাধীন মোহাম্মদী হাউজিং লিমিটেড আবাসিক এলাকায় ৫ নম্বর সড়কের মোড়ে রোববার সকালে (২৯ জানুয়ারি ২০১৭) বস্তায় করে শিমুল তুলা বিক্রির জন্য নিয়ে বসেন মোহাম্মদ আলী। ‘হট কেক’ এর মতো মুহূর্তেই তার তুলা বিক্রি হয়ে যায় ৫৫০ টাকা কেজি দরে।  

মোহাম্মদ আলী জানান, তার বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদি উপজেলায়। তিনি প্রায় ১৮ বছর ধরে তুলা ব্যবসায় জড়িত। কেবল শিমুল তুলাই বিক্রি করেন। শুরুতে রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় নীলক্ষেতে ও আজিমপুরে লেপ-তোশকের দোকানে পাইকারি সরবরাহ করতেন। কিন্তু দোকানিরা টাকা বাকি রাখায় এবং সেই টাকা পরিশোধে গড়িমসি করায় অল্প দিনের মধ্যেই তিনি নিজে খুচরা বিক্রির পথ ধরেন। বিক্রি শুরু করেন কলাবাগান, শুক্রাবাদ, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায়। এর বাইরে কোথাও যান না। 

মোহাম্মদ আলী জানান, তিনি তুলা সংগ্রহ করেন টা্ঙ্গাইল থেকে। জামালপুর জেলার কিছু এলাকা থেকেও তুলা কেনেন। তার মতে, টাঙ্গাইল ও জামালপুরের যমুনা নদী পারের এলাকার শিমুল তুলা সবচেয়ে বেশি ভালো। ধবধবে সাদা, দেখতে সুন্দর, ফুলে-ফেঁপে থাকার ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী। বেশি দিন ব্যবহারে একটু বসে গেলেও রোদে দেওয়া হলে আগের মতোই ফুলে ওঠে। তিনি টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর, কালিহাতী, এলেঙ্গা ও করটিয়া এবং জামালপুরের সরিষাবাড়ী এলাকা থেকে তুলা সংগ্রহ করেন।   

তিনি আরো জানান, তুলা তিনি কোনো হাট থেকে কেনেন না। এলাকায় সরাসরি গৃহস্থের কাছ থেকে এবং স্থানীয় কিছু কারবারির কাছ থেকে সংগ্রহ করেন। স্থানীয় কারবারিরা শিমুল ফুল আসার সময় গৃহস্থের গাছের তুলা আগাম কিনে রাখেন। সুবিধাজনক কিছু এলাকায় মোহাম্মদ আলী নিজেও এভাবে তুলার জন্য মৌসুম চুক্তিতে গাছ রেখে দেন।

ঢাকায় দিনে গড়ে ২০ কেজি তুলা খুচরা বিক্রি করতে পারেন মোহাম্মদ আলী। তিনি জানান, শিমুল তুলার ব্যাপক চাহিদা। বস্তার মুখ খোলার পর কথাবার্তা বলতেই যতটুকু সময় তারপর মুহূর্তেই বিক্রি হয়ে যায়। তিনি একটি চটের বস্তায় ১০ কেজি তুলা বহন করেন। রায়েরবাজারে তার তুলা রাখার জায়গা ভাড়া নেওয়া আছে। ঢাকায় প্রতি কেজি তুলা খুচরা বিক্রি করেন একদর সাড়ে পাঁচ’শ টাকায়।

তুলা উন্নয়ন বোর্ডের উপপরিচালক (সম্প্রসারণ) মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘টাঙ্গাইল অঞ্চলের যেকোনো তুলাই উৎকৃষ্ট। শিমুল ছাড়াও এই এলাকার কার্পাস ও হাইব্রিড জাতের তুলার মান অত্যন্ত ভালো। ১৯৮৩-৮৪ সাল থেকে টাঙ্গাইলে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ডেল্টাপাইন জাতের তুলার চাষ হচ্ছে। বর্তমানে সেখানে সিবি-১৩ ও সিবি-১৪ নামের দুটি নতুন উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল জাতের তুলা চাষ হচ্ছে। মধুপুর, ধনবাড়ী, ঘাটাইল, সখীপুর, দেলদুয়ার ও নাগরপুর উপজেলা এবং গোপালপুর এলাকায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার একর জমি তুলা চাষের আওতায় আনা হয়েছে। আর বিশেষ করে যমুনা বিধৌত এলাকায় শিমুল তুলার গাছ হয় বেশি। এই গাছ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে বহু বছর বেঁচে থাকতে পারে। অন্যান্য এলাকার তুলনায় এই এলাকায় শিমুল গাছ বেশি। তবে যে শিমুল তুলা উৎপন্ন হয় তা চাহিদার তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। এখানে বাণিজ্যিকভাবে শিমুল তুলা চাষেও লোকজনকে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।’

কালিহাতী উপজেলা প্রেসক্লাবের সদস্য স্থানীয় সাংবাদিক কাজল আর্য জানান, এই এলাকায় অনেক পরিবার আছে যারা অন্য কাজের পাশাপাশি মৌসুমে গৃহস্থ বাড়ি থেকে শিমুল তুলা সংগ্রহ করে এবং তা বিক্রি করে বাড়তি অর্থ আয় করে। তবে এখানকার হাটে শিমুল তুলা খুব একটা বিক্রি হতে দেখা যায় না। এটা ভেতরে ভেতরেই বিক্রি হয়ে যায়।

টাঙ্গাইল শহরে ছয়আনি বাজারে রয়েছে তুলাপট্টি। এখানে তুলা, লেপ, তোশক ও আনুষঙ্গিক জিনিসের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আলহাজ ম্যাট্রেসের স্বত্বাধিকারী মো. জসিমউদ্দিন জানান, শিমুল তুলা বলতে গেলে দুষ্প্রাপ্য। তারা আঞ্চলিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এই তুলা সংগ্রহ করেন। একটা সময়ে করটিয়ার হাটে উঠত শিমুল তুলা। এখন মঙ্গলবার করটিয়া হাটে তুলা ওঠে কিন্তু সেটা বলার মতো কিছু না।

তিনি বলেন, ‘টাঙ্গাইলের তুলা গুণেমানে ভালো। এখানকার শিমুল তুলার কোনো জুড়ি নেই। বলতে হয়, টাঙ্গাইল হচ্ছে তুলার জায়গা। কিন্তু স্থানীয় বাজারে শিমুল তুলার খুচরা দাম ৩৫০ টাকা থেকে ৩৮০ টাকা। সাধারণ গ্রাহকরা কাপড় থেকে তৈরি কম দামের তুলাতেই বালিশ তোশক নেন। ফলে শিমুল তুলা দোকানে তেমন রাখা হয় না। কোনো গ্রাহক এসে শিমুল তুলা চাইলে তাৎক্ষণিকভাবে তা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।’

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩১ জানুয়ারি ২০১৭/শাহনেওয়াজ/এএন

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়