মন্দিরের জায়গায় টয়লেট, জবিতে দিনভর অবস্থান শেষে ভিত্তিপূজা
জবি প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) কেন্দ্রীয় মন্দির স্থাপনের জন্য প্রস্তাবিত স্থানে শৌচাগার নির্মাণের উদ্যোগের প্রতিবাদে দিনভর অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে রাতে নিজেরাই ভিত্তিপূজার মাধ্যমে ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মন্দির’ উদ্বোধনের ঘোষণা দেন তারা।
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে কর্মসূচি শুরু হয়ে রাত ১০টা পর্যন্ত চলে। পরে শিক্ষার্থীরা দেবদেবীর ছবি ও পূজাসামগ্রী নিয়ে প্রস্তাবিত স্থানে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কেন্দ্রীয় মন্দির উদ্বোধনের ঘোষণা দেন এবং সেখানে রাত্রিযাপনের সিদ্ধান্ত নেন।
হিসাববিজ্ঞান তথ্য ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী উজ্জ্বল চন্দ্র দাস বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের কাছে কেন্দ্রীয় মন্দির স্থাপনের যৌক্তিক দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু নানা অজুহাতে সেই দাবি উপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত সেখানে শৌচাগার নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়েছে। সারাদিন আন্দোলনের পরও কোনো সাড়া না পেয়ে আমরা আজ আনুষ্ঠানিকভাবে কেন্দ্রীয় মন্দির স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছি।”
দিনভর অবস্থান কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরা ‘এক, দুই, তিন, চার, মন্দির আমার অধিকার’, ‘প্রশাসন লজ্জা লজ্জা’, ‘মন্দির আমার অধিকার, রুখে দেবে সাধ্য কার’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন।
জবি শাখা শ্রীচৈতন্য শিক্ষা ও সংস্কৃতি সংঘের সাধারণ সম্পাদক অজয় পাল বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ২ হাজার ৭০০ সনাতনী শিক্ষার্থী থাকলেও এখনো কোনো কেন্দ্রীয় মন্দির নেই। বার বার স্মারকলিপি দেওয়ার পর প্রশাসন জায়গা নেই বলে জানায়। পরে মুক্তমঞ্চের পাশের একটি জায়গা প্রস্তাব করলে সেখানে পাবলিক টয়লেট নির্মাণ শুরু হয়, যা সনাতনী শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত অপমানজনক।”
ছাত্র ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি প্রিয়ন্ত স্বর্ণকার বলেন, “আমাদের কোনো ধরনের অবহিতকরণ ছাড়াই মন্দিরের জন্য নির্ধারিত স্থানে টয়লেট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা ধর্মীয় অবমাননার শামিল। তাই আমরা আন্দোলনে নেমেছি।”
জবি সনাতন বিদ্যার্থী সংসদের সভাপতি সুমন কুমার দাস বলেন, “আমরা প্রশাসনের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুমতি চেয়েছি। তারা ব্যর্থ হলে নিজ উদ্যোগেই কার্যক্রম চালিয়ে যাব, আজ তারই সূচনা হলো।”
এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দা জানিয়েছেন জকসুর ছাত্রদল–ছাত্র অধিকার প্যানেলের নির্বাচিত কয়েকজন সম্পাদক। জকসুর সাংস্কৃতিক সম্পাদক তাকরিম আহমেদ বলেন, “মন্দির স্থাপন কোনো বিলাসিতা নয়, এটি একটি সাংবিধানিক অধিকার। প্রস্তাবিত জায়গায় ওয়াশরুম নির্মাণের সিদ্ধান্ত সনাতনী শিক্ষার্থীদের অনুভূতির প্রতি চরম অবজ্ঞা।”
পরিবহন সম্পাদক মাহিদ হোসেন বলেন, “বার বার স্মারকলিপি দেওয়ার পরও তারা কোনো ইতিবাচক সাড়া পায়নি। উল্টো মন্দিরের জায়গায় টয়লেট নির্মাণ সনাতনীদের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ।”
অবন্তী রায় নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, “আমরা ২১ জন প্রতিনিধি নির্বাচন করেছি। কিন্তু সারাদিনে মাত্র দুই–তিনজনকে পেয়েছি। বাকিরা কেউ আসেনি, অথচ অন্য একটি অনুষ্ঠানে তারা অংশ নিয়েছে। এমনকি আমাদের সঙ্গে দেখা করতেও কেউ আসেনি। তাহলে কি আমরা ধরে নেব, সনাতনীদের বাদ দিয়েই জকসু পরিচালিত হচ্ছে?”
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম এবং জকসু জিএস আব্দুল আলীম আরিফের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি।
এছাড়াও, মঙ্গলবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চের পাশে অনুষ্ঠিত অবস্থান কর্মসূচিতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা উপস্থিত হয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেন।
এ সময় শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহবায়ক মো. শাহরিয়ার হোসেন বলেন, “আমাদের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে সবাই মিলেমিশে থাকবে একজন শিক্ষার্থী হিসেবে সকলেরই চাওয়া। সকল ধর্মের শিক্ষার্থীদের তাদের ধর্ম পালনের অধিকার রয়েছে। আমরা শুনেছি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আড়াই হাজারের বেশি সনাতনী শিক্ষার্থী রয়েছে, তাদের ধর্ম পালনের জন্য একটি মন্দির স্থাপনের দাবিও দীর্ঘদিনের। আমরা চাই প্রশাসন তাদের এই দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিবেন।”
এ সময় শাখা ছাত্রদল আহবায়ক মেহেদী হাসান হিমেল বলেন, “জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে হিন্দু-মুসলিম সবাই সমান হারে ভর্তি ফি প্রদান করে। তাহলে কোনো শিক্ষার্থী কেন ধর্মীয় সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে? বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র—এখানে সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরুর বিভাজন থাকার কথা নয়।”
জবিতে প্রায় ২৭০০ শিক্ষার্থীর জন্য ক্যাম্পাসে একটা মন্দির হবে এটা তাদের যৌক্তিক দাবি। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে সনাতনী শিক্ষার্থীদের এই দাবিকে আমলে নিয়ে প্রশাসনকে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করার অনুরোধ জানান তিনি।
ঢাকা/লিমন/জান্নাত