মমতা যখন আইনজীবীর ভূমিকায়
কলকাতা ব্যুরো || রাইজিংবিডি.কম
এসআইআর ইস্যুতে বিচারের দাবিতে ভারতের শীর্ষ আদালতে এবার আইনজীবীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন খোদ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভারতের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সুপ্রিম কোর্টের বিচার প্রক্রিয়ায় আইনজীবী হিসেবে অংশগ্রহণ করলেন কোনো মুখ্যমন্ত্রী। মামলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই নিজের দায়ের করা মামলায় সওয়াল করলেন।
বুধবার দুপুর ১টার পর সুপ্রিম কোর্টে শুরু হয় এসআইআর মামলার শুনানি। এদিন প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চে মামলার শুনানি শুরু হওয়ার সময় থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখা গিয়েছিল একেবারে সামনের সারিতে, আইনজীবীদের পাশে। এসআইআর নিয়ে তার দায়ের করা মামলায় সওয়াল করছিলেন বর্ষীয়ান আইনজীবী শ্যাম দেওয়ান। সওয়াল-জবাব চলাকালে মুখ্যমন্ত্রী পাঁচ মিনিট সময় চেয়ে নেন বক্তব্য রাখার জন্য। তাকে অনুমতি দেন বিচারপতিরা।
শুরুতেই মমতা জানিয়ে দেন আইনজীবী হিসেবে নয়, ব্যক্তিগতভাবে বঙ্গবাসীর হয়ে তার এই সওয়াল।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “আমি পশ্চিমবঙ্গের মানুষের হয়ে বলছি। এসআইআর পদ্ধতির মাধ্যমে নাম বাতিলের প্রক্রিয়া চলছে। ১০০জনের বেশি মারা গিয়েছেন। আমরা চাই, কোনো বৈধ ভোটারের যেন বাদ না পড়ে। আমাদের আইনজীবীরা লড়াই করছেন এর জন্য। এই লড়াই দলের জন্য নয়, রাজ্যের জন্য।”
রীতিমতো অভিমানী কণ্ঠে মমতা বলেন, “এনিয়ে আমি নির্বাচন কমিশনকে ছয়টি চিঠি লিখেছি, একটিরও উত্তর পাইনি। আমি সাধারণ মানুষ, হয়তো কম গুরুত্বপূর্ণ। আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না কী হচ্ছে। সুবিচারের জন্য কাঁদছি।”
প্রধান বিচারপতি বলেন, “মৃত ব্যক্তিদের নাম ভোটার তালিকায় থাকুক, নিশ্চয়ই চান না? যারা পশ্চিমবঙ্গ থেকে চলে গেলেন, তাদের নাম ভোটার তালিকায় থাকুক, নিশ্চয়ই চান না?”
এরপরেই মমতা বলেন, “বিয়ের পরে যেসব মেয়েদের নাম পরিবর্তন হয়েছে কিংবা স্থান পরিবর্তন হয়েছে তাদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও নথি হিসেবে আধার কার্ড নেওয়া হচ্ছে না। ভোটের আগে তাড়াহুড়ো করে এই কাজ হচ্ছে। নাম বাদ পড়ছে, কিন্তু নাম যুক্ত হচ্ছে না, সেটাও তো দরকার।”
প্রধান বিচারপতির সামনেই তৃণমূল সুপ্রিমো জাতীয় নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়ে বলেন, “বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলো থেকে লোকজনকে মাইক্রো অবজার্ভার করে পাঠাচ্ছে। তারা নাম ডিলিট করছে। ইলেকশন কমিশন তো হোয়াটসঅ্যাপ কমিশন হয়ে গিয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপে সব নির্দেশ দিচ্ছে। বিপক্ষের আইনজীবী সঠিক কথা বলছেন না। এসআইআর প্রক্রিয়ায় আমরা আধিকারিক দিয়েছি। ৫৯ লাখের নাম বাদ পড়েছে। আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ পায়নি। শুধুমাত্র বাংলার জন্য নিয়ম ভেঙে মাইক্রো অবজার্ভার। আসমে কেন এসআইআর হচ্ছে না? হঠাৎ ভোটের আগে ২৪ বছর পর কেন বাংলায় এসআইআর হচ্ছে? আমার শেষ আবেদন, মাইক্রো অবজার্ভারদের প্রত্যাহার করুন। গণতন্ত্রকে বাঁচান।”
পাঁচ মিনিটের জন্য বক্তব্য রাখার অনুমতি থাকলেও বাংলার সাধারণ মানুষের হয়ে গোটা পরিস্থিতির বর্ণনা করতে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বেশিক্ষণই বললেন। এদিন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি বিপুল এম পাঞ্চোলির ডিভিশন বেঞ্চে মামলার শুনানি হয়।
প্রধান বিচারপতিও তার বক্তব্য মন দিয়ে শোনেন। একাধিক জায়গায় তার যুক্তিসঙ্গত আপত্তির কথা মেনেও নেন। বৈধ ভোটারদের নাম বাদ যাক, তা শীর্ষ আদালতেও চায় না বলে জানান প্রধান বিচারপতি। স্রেফ নামের ছোটখাটো বানান বিভ্রাটের জন্য ভোটারদের লজিক্যাল ডিসক্রিপান্সির কথা উল্লেখ করে এসআইআর নোটিস পাঠানো কাম্য নয় বলে পর্যবেক্ষণ প্রধান বিচারপতির বেঞ্চের।
এদিনের মতো সওয়াল-জবাব শেষে দুই পক্ষকে নোটিস দেওয়া হয়। কী কী পদক্ষেপ করছে কমিশন, জানাতে হবে শীর্ষ আদালতে। এসআইআর প্রক্রিয়ায় কত অফিসার দিতে পারবে রাজ্য, তা জানাতে হবে নবান্নকে। সোমবার ফের এসআইআর মামলার শুনানি হবে বলে জানিয়েছেন প্রধান বিচারতি সূর্য কান্ত।
ঢাকা/সুচরিতা/শাহেদ