ফেনীতে ৪২ বছরে ১৫৬ রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড
সৌরভ পাটোয়ারী || রাইজিংবিডি.কম
ফেনী জেলার মানচিত্র
সৌরভ পাটোয়ারী : ভয়ংকর আলোচিত হত্যাকাণ্ড এবং ঘটনাবলির কারণে ফেনী জেলা পরিচিতি পেয়েছে সন্ত্রাসের এক ভয়াল জনপদ হিসেবে। এসব ভয়াবহ ঘটনার নেপথ্যের নায়করা সব সময় থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। আর রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের দোহাই দিয়ে বছরের পর বছর ধরে বিচার হচ্ছে না এসব নির্মম হত্যাকাণ্ডের।
স্থানীয় সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, ১৯৭২ সাল থেকে ২০১৪ পর্যন্ত ৪২ বছরে ফেনীতে ১৫৬ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী খুন হয়েছেন। এর মধ্যে একটি হত্যাকাণ্ডেরও বিচার পায়নি ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।
একাধিক ভুক্তভোগী পরিবারের মতে, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা অতীতে মামলা করলেও সুবিচার পাননি। খুনিরা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে পার পেয়ে গেছে বারবার। এতে করে জেলায় সুস্থ রাজনীতির অভাবে ‘অসুস্থ’ নেতার জন্ম হচ্ছে। বাড়ছে খুনোখুনির রাজনীতি। যার সর্বশেষ শিকার হয়েছেন ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ সভাপতি একরামুল হক একরাম।
গত ২০ মে ফেনী শহরের একাডেমি সড়কে প্রকাশ্যে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যার পর একরামকে বহনকারী গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। পুড়ে ছাই হয়ে যায় সরকারি দলের এ প্রভাবশালী নেতা। বীভৎস এই ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই সন্দেহের আঙুল যায় ফেনী সদর আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারীর দিকে। দলীয় আধিপত্য নিয়ে চলা ঠান্ডা লড়াইয়ের জেরে তার এ করুণ পরিণতি বলে সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে।
অবশ্য আওয়ামী লীগ নেতা নিজাম উদ্দিন হাজারী তার জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রাক্তন নেতা জয়নাল হাজারীর দিকেই ঠেলে দেন। এ নিয়ে দুই হাজারী পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করলেও তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে ঘটনার আদ্যোপান্ত উদ্ঘাটন করেছেন বলে জানা গেছে। ইতিমধ্যে ঘটনায় জড়িতদের মধ্যে প্রায় দুই ডজন সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
তবে একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা ও অভিজ্ঞ আইনজীবীরা মর্মন্তুদ এ হত্যা মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, মামলায় রাঘব বোয়ালেরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় তদন্ত ব্যাহত হচ্ছে। এজন্য ফেনীতে অতীতে ঘটে যাওয়া আলোচিত ঘটনাগুলোর মতো একরাম হত্যা মামলাও কেবল আলোচনায় বন্দি থাকবে বলে ভুক্তভোগীরা মনে করছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের নেতা কাজী নাসিরকে ট্রাংক রোডে প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাত করে নির্মমভাবে খুন করেন তৎকালীন সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। তখন এ হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী হিসেবে জয়নাল হাজারীর নাম উঠলেও শেষতক সেই মামলার কিছুই হয়নি।
এ ছাড়া জেলার আলোচিত হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে ‘চন্দ্রপুর ট্র্যাজেডি’ হিসেবে পরিচিত ২০০১ সালে দাগনভূঞার চন্দ্রপুরে ট্রিপল মার্ডার ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পৃথক পাঁচটি মামলা হয়। ওই ঘটনায় তৎকালীন সংসদ সদস্য জয়নাল হাজারী, জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি আজহারুল হক আরজু, সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সাজু, উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি দিদারুল কবির রতনসহ ছাত্রলীগ-যুবলীগের ৩০০-৪০০ নেতা-কর্মীকে আসামি করা হয়। পরে চারদলীয় জোট ক্ষমতায় থাকাকালীন এসব মামলা থেকে খালাস পেয়ে যান জড়িতরা।
একইভাবে ২০০১ সালে সোনাগাজীর চর ইঞ্জিমানে বিএনপি-যুবদল ও ছাত্রদলের ১০-১২ জন নেতা-কর্মীকে গুলি করে হত্যার পর লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার ঘটনাটি দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচিত হয়। ‘চর ইঞ্জিমান ট্র্যাজেডি’ হিসেবে পরিচিত ওই মর্মন্তুদ ঘটনায় দায়ের করা মামলা থেকেও খালাস পেয়ে যান আওয়ামী লীগ দলীয় নেতা-কর্মীরা।
এর আগে ১৯৯৭ সালে তুষার নামে এক ছাত্রদল নেতাকে ড্রিল মেশিন দিয়ে ছিদ্র করে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। ঘটনার প্রতিবাদে পরদিন আহূত হরতাল চলাকালে শহরে বের হওয়া বিএনপির মিছিলে প্রকাশ্য ব্রাশফায়ার করেন ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতা-কর্মীরা। এতে ঘটনাস্থলে নিহত হন জেলা যুবদলের তৎকালীন যুগ্ম আহ্বায়ক শরিফুল ইসলাম নাসির। তুষার-নাসির হত্যার ঘটনাটি ব্যাপক আলোচিত হয়। কিন্তু এসব ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাও একপর্যায়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহার করা হয়।
১৯৯৭ সালে বিএনপির নেতা ভিপি জয়নালের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও যুবদল নেতা নুর নবীকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলাও ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে প্রত্যাহার করা হয়। এর আগে ধলিয়ায় নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয় জেলা যুবলীগের সভাপতি মোহাম্মদ হোসেন ভেন্ডু হাজারীকে। সেই ঘটনায় বিএনপি-জাতীয় পার্টি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায়ও সুবিচার পাননি ক্ষতিগ্রস্তরা।
২০০০ সালে শহরের একাডেমি সড়কে যুবলীগ নেতা আবুল বশর ওরফে বৈশ্যাকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় তৎকালীন যুবলীগ নেতা একরাম ও ছাত্রলীগ নেতা জাহিদ চৌধুরী জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলেও ওই মামলায়ও অভিযুক্তরা বেঁচে যান। ২০০১ সালে মহিপালে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে যুবদল নেতা গিয়াস উদ্দিন খুনের ঘটনায় জড়িতদের কিছুই হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কেবল ১৯৯৬-২০০১ সালে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের শতাধিক নেতা-কর্মী রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এসব ঘটনায় দায়ের হওয়া বেশির ভাগ মামলায়ই জড়িতরা আইনের ফাঁকফোকরে রেহাই পেয়ে যান।
ফেনী রামপুর সওদাগরবাড়ীর বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. রুস্তম বলেন, ‘রাজনীতিকে গুডবাই জানিয়েছি অনেক আগে। ভোট দিতে যাই না কেন্দ্রে। কারণ, ভোট দেওয়ার মতো যোগ্য লোকের নাকাল যাচ্ছে ফেনী জেলায়।’
স্টার লাইন অটো রাইস মিলের ম্যানেজার ও মুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমান বলেন, ‘যুদ্ধ করেছি দেশ, মা, মাটি ও মানুষের জন্য। অসুস্থ রাজনীতির জন্য নয়। বর্তমান রাজনীতি সুস্থতার পরিচায়ক নয়।’
পিপি আবুল হোসেন বলেন, ‘বিচার চলে প্রমাণ দিয়ে। বিচারক যদি যথাযথ সাক্ষ্য-প্রমাণ পান, তাহলে বিচারকাজ চালাতে পারেন। প্রমাণের অভাবে হত্যা মামলায় জড়িতরা রেহাই পেয়ে যায়। এজন্য তারা পরে আরো বেশি সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে।’
ফেনীর প্রাক্তন ছাত্রনেতা বাহার উল্ল্যাহর মতে, অতীতে ঘটে যাওয়া অনেক নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়ায় একের পর এক ভয়ংকর ঘটনা ঘটে চলেছে এই জেলায়। আর ন্যায়বিচারবঞ্চিত হয়ে বিচারপ্রার্থীরা যেমন মনোবল হারান, তেমনি অপরাধীরাও দ্বিগুণ উৎসাহে সহিংসতায় মেতে ওঠে। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় ফেনীতে সন্ত্রাসের ভয়াবহ বিস্তারকে তিনি ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত বলে মনে করেন।
রাইজিংবিডি/ফেনী/১ জুলাই ২০১৪/সৌরভ পাটোয়ারী/সন্তোষ/কমল কর্মকার
রাইজিংবিডি.কম
২৪ ঘণ্টায় হামে মৃত্যু ৭, আক্রান্ত ১২১৫