RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     মঙ্গলবার   ০১ ডিসেম্বর ২০২০ ||  অগ্রাহায়ণ ১৭ ১৪২৭ ||  ১৪ রবিউস সানি ১৪৪২

পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন

সালমা আফরোজ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৪:২০, ১৪ নভেম্বর ২০২০  
পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন

ঢাকার বাসিন্দা নাহার হকের (৬৭) দিন কাটে নিঃসঙ্গ, অবহেলায়। স্বামী মারা গেছেন ২০০৩ সালে। সেই থেকে কথা বলার মানুষ নেই। সকালে ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়ে খালি পেটে পান খাওয়া তার প্রথম কাজ। তারপর বড় ছেলের বউ সকালের নাশতা খেতে ডাকেন। ছেলে ও বউ চাকরি করেন। তাই সারাদিন বাসায় একা। তাদের ছেলেমেয়ে স্কুলে পড়ে। যখন ছেলের বউ খারাপ ব্যবহার করে, তিনি তখন মেজ ছেলেকে বলেন তার বাসায় নিয়ে যেতে। মেজ ছেলে বলেন, আপনার বউমাকে জিজ্ঞাসা করে নিয়ে যাব। তিনি আর কিছু বলতে পারেন না।

চট্টগ্রামের বাসিন্দা আবু নাসের। অবসর নেওয়ার পর আর্থিক সহযোগিতার জন্য ছেলেমেয়ের ওপর নির্ভরশীল। তার ভাষায়, ছেলেটি যথেষ্ট দায়িত্ববান ছিল; কিন্তু বিয়ের পরেই বদলে যাওয়া শুরু। মা-বাবার দেখভাল করা বন্ধ করে দিলো। এ কারণেই কোনো উপায় না দেখে ছেলের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তিনি আরও জানান, এটা তার জন্য অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল। তবুও করেছেন।

মা-বাবার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ছোটবেলা থেকেই রচনা হিসেবে পড়ে এসেছি। কিন্তু বিশ্বায়নের এ যুগে বড়ো হয়ে এ কর্তব্য ভুলে যাই। কয়েক দশক ধরেই আমরা এ উপমহাদেশের ঐতিহ্য যৌথ পরিবার প্রথা ভেঙে পশ্চিমা অনুকরণে একক পরিবারের দিকে ধাবিত হচ্ছি। পারিবারিক দায়িত্ববোধ ভুলে মা-বাবাকে ভরণপোষণ দিতে ভুলে যাচ্ছি। অথচ সন্তান জন্ম দেওয়া থেকে শুরু করে তাকে সাবালক করা পর্যন্ত মা-বাবাকে সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। তাই আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় মা-বাবার ভরণপোষণ করাকে নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করা হয়।

এসব বয়স্ক নাগরিকের কথা মাথায় রেখে সরকার ২০১৩ সালের ২৫ অক্টোবর ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন’ পাস করে। এ আইনে বলা হয়েছে, প্রত্যেক সন্তানকে তার মা-বাবার ভরণপোষণ দিতে হবে। কোনো মা-বাবার একাধিক সন্তান থাকলে সেক্ষেত্রে সন্তানরা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে তাদের ভরণপোষণ নিশ্চিত করবে। আর তা না করলে তাদের শাস্তি পেতে হবে। এতদিন কোনো সন্তান তার মা-বাবার ভরণপোষণ না দিলে বা খোঁজখবর না করলে কারও বলার কিছু ছিল না। এখন এই আইনের ফলে সন্তানরা আর পার পাবেন না। তাদের মা-বাবার ভরণপোষণ দিতে হবে, নয়তো শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। এই আইনের আওতায় চট্টগ্রামের আবু নাসের ছেলের কাছ থেকে ভরণপোষণের জন্য খরচ পাচ্ছেন।

পিতামাতার ভরণপোষণ আইন ২০১৩-এর ৫ ধারার (১) অনুযায়ী, কোনো প্রবীণ ব্যক্তি তাঁর সন্তানদের বিরুদ্ধে এ ধরনের কোনো অভিযোগ আনলে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের এক লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হবে। আইনে বলা হয়, কোনো সন্তানের স্ত্রী, ছেলেমেয়ে বা নিকটাত্মীয় যদি বৃদ্ধ মা-বাবার প্রতি সন্তানকে দায়িত্ব পালনে বাধা দেন, তাহলে তাদেরও একই শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।

এ আইনের ৩ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সন্তান তার বাবা বা মাকে অথবা উভয়কে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো বৃদ্ধনিবাস কিংবা অন্য কোথাও একত্রে কিংবা আলাদাভাবে বাস করতে বাধ্য করতে পারবেন না। তাছাড়া সন্তান তার মা-বাবার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর রাখবেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেবেন ও পরিচর্যা করবেন।

আইনের ৩-এর (৭) ধারা অনুযায়ী, কোনো বাবা বা মা কিংবা দুজনই সন্তানদের সঙ্গে বসবাস না করে পৃথকভাবে বসবাস করলে, সেক্ষেত্রে প্রত্যেক সন্তান তাদের দৈনন্দিন আয়-রোজগার বা ক্ষেত্রমতো মাসিক আয় বা বার্ষিক আয় থেকে যুক্তিসংগত পরিমাণ অর্থ বাবা বা মা অথবা উভয়কে নিয়মিত দেবেন। অথবা মাসিক আয়ের কমপক্ষে ১০ শতাংশ বাবা-মায়ের ভরণপোষণের কাজে ব্যয় করবেন।

আইনের ৪ ধারা অনুযায়ী, মা-বাবার ভরণপোষণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দাদা-দাদি, নানা-নানিরও ভরণপোষণ করতে হবে। তবে বাবা যদি বেঁচে থাকেন তাহলে সন্তানকে দাদা-দাদির এবং মা বেঁচে থাকলে নানা-নানির ভরণপোষণ করতে হবে না।

এ আইনের অধীনে অপরাধ হবে আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য এবং আপসযোগ্য। আদালত ইচ্ছা করলে প্রথমেই বিষয়টি আপস-মীমাংসার মাধ্যমে নিষ্পত্তির জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন। আপস-নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা মেম্বার কিংবা ক্ষেত্রমতে, সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার মেয়র বা কাউন্সিলর কিংবা অন্য যে কোনো উপযুক্ত ব্যক্তির কাছে পাঠাতে পারবে। আদালত থেকে কোনো আপস-মীমাংসার জন্য পাঠানো হলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি বাবা-মা এবং সন্তান উভয় পক্ষের শুনানি শেষে নিষ্পত্তি করতে পারবেন। কোনো অভিযোগ এভাবে নিষ্পত্তি হলে তা আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে বলে গণ্য করা হবে।

একজন মা ১০ মাস ১০ দিন গর্ভে কষ্টের তীব্রতা সহ্য করে সন্তানের জন্ম দেন। মা-বাবার মিলিত ত্যাগেই বেড়ে ওঠে সন্তান। জীবনের সবটুকু দিয়ে সন্তানকে মানুষ করেন তারা। কিন্তু সেই সন্তানরা বড়ো হলে মা-বাবার এই কষ্টের কথা ভুলে যায়। সন্তানের কাছে মা-বাবার বেশি কিছু চাওয়ার থাকে না। থাকে শেষ বয়সে আদরের সন্তানের পাশে থেকে সুখ-দুঃখ ভাগ করার ইচ্ছা। কিন্তু অনেকেরই সেই সন্তানের কাছে আশ্রয় না হয়ে আশ্রয় হয় আপনজনহীন বৃদ্ধাশ্রমে। 

মা-বাবাকে সুখী রাখতে কঠিন কিছু করতে হয় না। যে পরিবারে স্বামী-স্ত্রী চাকরি করেন, অফিস থেকে ফিরে একটু তাঁদের খোঁজখবর নিলেই তাঁরা খুশি। সারাদিনের ঘটনাগুলো তাঁদের কাছে শেয়ার করুন। ছুটির দিনে শুধু ছেলেমেয়েকে না নিয়ে সবাই মিলে ঘুরতে যান। তাদের ছোটোখাটো সারপ্রাইজ দিন। মর্নিং ওয়াকে তাঁদের সঙ্গী হতে পারেন, এতে তাঁরা ভালো অনুভব করবেন। পারিবারিক কোনো সিদ্ধান্ত তাঁদের অবহিত করুন। প্রয়োজনে তাঁদের কাছে পরামর্শ চাইতে পারেন, এতে তাঁরা খুবই খুশি হবেন, নিজেদের কোনোভাবেই গুরুত্বহীন ভাববেন না। যে ছেলেমেয়েরা মা-বাবার কাছ থেকে দূরে থাকে, তারা যদি প্রতিদিন না পারলেও দুই-তিন দিন পর ফোন করে তাঁদের খোঁজ রাখেন, তাহলে তারা খুবই খুশি হবেন। প্রবীণতম ব্যক্তি সমাজের সম্পদ। তাঁদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মানুষ করতে সাহায্য করে। অথচ আমাদের ব্যস্ত সমাজ প্রবীণদের সেই মর্যাদা না দেওয়ায় একাধিক সন্তান থাকা সত্ত্বেও নাহার হকের মতো অসহায় প্রবীণদের জীবন কাটে অনিশ্চিত অবস্থায়। সরকারের ভরণপোষণ আইন-২০১৩ এনে দিয়েছে প্রবীণদের সেই সুরক্ষা ও নিশ্চয়তা।

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়