ঢাকা     রোববার   ০৫ এপ্রিল ২০২৬ ||  চৈত্র ২২ ১৪৩২ || ১৬ শাওয়াল ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

সোনালি ডানার চিল

আবদুল মান্নান পলাশ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৫:৪১, ৫ জুন ২০১৪   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
সোনালি ডানার চিল

সোনালি ডানার চিল

আবদুল মান্নান পলাশ, চাটমোহর (পাবনা) : ‘হায় চিল, সোনালী ডানার চিল/এই ভিজে মেঘের দুপুরে/ তুমি আর উড়ে উড়ে কেঁদো নাকো ধানসিঁড়ি নদীটির তীরে।’ জীবনানন্দের সোনালি ডানার চিল এখন আর ধানসিঁড়ি নদীর তীরে কাঁদতে দেখা যায় না। ধানসিঁড়ি নদীগুলো গেছে শুকিয়ে। চিল আর খুঁজে পাওয়া যায় না গ্রামবাংলায়।

প্রকৃতিতে এখন সোনালি ডানার চিলের দেখা মেলা সত্যিই ভার। সেই নীল আকাশ, সাদা মেঘের ভেলা এখনো আছে, নেই শুধু অলস ডানা মেলা সোনালি ডানার শূন্যদৃষ্টির সেই পাখি চিল। হায় সোনালি ডানার চিল তুমি কোথায়?
অথচ একসময় চিলের বিচরণ ক্ষেত্র ছিল এই বাংলার সর্বত্র। আকাশের অনেক উঁচুতে দল বেঁধে ডানা মেলে ঘুরে বেড়াত। শিকারের খোঁজে আকাশে ডানা স্থির রেখে চক্রাকারে ঘুরপাক খেত। চিল এলেই হাঁস-মুরগির বাচ্চাগুলো ভয়ে ছোটাছুটি শুরু করে দিত। হাঁস-মুরগি তাদের ছানাগুলো পালক ছড়িয়ে ঢেকে রাখত। গ্রামবাংলায় এমন পরিচিত দৃশ্য এখন আর চোখেই পড়ে না।

কালেভদ্রে দু-একটি চিল আকাশে চক্রাকারে ঘুরপাক খেতে দেখা যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চিল শিকারি পাখি। এদের ডানা দুটি বেশ দীর্ঘ এবং পা দুর্বল ও খাটো। এদের দৃষ্টিশক্তি প্রখর। শিকারের খোঁজে এরা আকাশে ডানা স্থির রেখে চক্রাকারে ঘুরপাক খায়। চিলের প্রজাতির সংখ্যা অনেক হলেও বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলোতে ভুবন ও শঙ্খচিল বেশি দেখা যেত। শস্যখেতে বিষটোপ, গবাদিপশু চিকিৎসায় প্রদাহরোধক ওষুধ ডাইক্লোফেনাক ব্যবহার, খাদ্যের অপর্যাপ্ততা বাসস্থানের অভাবের কারণে প্রজনন সমস্যায় চিল বিলুপ্তির পথে রয়েছে। সে কারণেই আগের মতো প্রকৃতিতে সেভাবে চিলের বিচরণ চোখে পড়ছে না। পাখি বিশেষজ্ঞদের মতে, বিভিন্ন কারণে প্রকৃতি থেকে চিল বিলুপ্তির পথে যাচ্ছে।

আজ থেকে ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগে আমাদের দেশে শঙ্খচিল পর্যাপ্ত সংখ্যায় ছিল। এখন এদের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ খাদ্য ও প্রজনন সংকট। এখন আর আগের অবস্থায় প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো নেই। নেই পর্যাপ্ত খাবার; যেখানে তারা দলগতভাবে মাছ শিকার করে বেঁচে থাকতে পারে। বড় বড় প্রাকৃতিক গাছের সমাহারও এখন নেই। যেখানে তারা নির্বিঘ্নে বাসা তৈরি করে ছানা উৎপাদন করতে পারবে।

এদের বিশেষ একটি বৈশিষ্ট্য হলো- ওরা ওদের ছানার দ্রুত শারীরিক বৃদ্ধি ও পুষ্টির জন্য মাঝে মাঝে হাঁস-মুরগির ছোট বাচ্চা ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে যায়। তবে এমনিতে সাধারণত ওরা নিজের খাবার জন্য হাঁস-মুরগি ছানা তুলে নেয় না। গ্রামাঞ্চলের বাড়ির উঠান থেকে এভাবে চমৎকার ভঙ্গিতে শিকার ধরতে ভীষণ পটু ওরা। মুহূর্তের মধ্যে মুরগির বাচ্চার ডাকগুলো আকাশে মিলিয়ে যেত। একসময় আমাদের গ্রামদেশের বিলে বা পুকুরে মাছ ধরা হলে দেখা যেত দল বেঁধে ১৫-২০ শঙ্খচিল এসে ভিড় করত। খলিসা, পুঁটি, চেলা, মলা, ঢেলা প্রভৃতি প্রাকৃতিক ছোট মাছ, কাঁকড়া, মেটেসাপ- এগুলো খেতে নামত। মানুষের একেবারে নাকের ডগায় এসে ফেলে দেওয়া মাছগুলো ছোঁ মেরে নিয়ে যেত। এ দৃশ্য এখন আর দেখা যায় না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, খোলা বিস্তীর্ণ এলাকা ভুবন চিলের প্রিয় এলাকা। এ ছাড়া ঘন বন, পাতলা বন, পার্বত্য অঞ্চল, নদীর পাড়, বেলাভূমি, বন প্রান্ত, ঘাসবন প্রভৃতি অঞ্চল চিলের বিচরণ ক্ষেত্র। বড় বড় বন্দর, শহরাঞ্চল ও গ্রামাঞ্চলেও একসময় দেখা যেত। বড় বড় গাছে এরা দলবদ্ধভাবে রাত কাটাত। ভোরে সূর্য উঠলে এরা দল বেঁধে আকাশে ওড়া শুরু করত। অনেকক্ষণ ঝাঁক বেঁধে চক্রাকারে ঘুরে বেড়াত। পরে খাদ্যের সন্ধানে বিভক্ত হয়ে পড়ত।

সন্ধ্যাবেলায় আবাসে ফিরে এসে আবার ভোরবেলার মতো চক্রাকারে কিছুক্ষণ উড়ে বেড়াত। তারপর গাছে এসে বসত। এরা সাধারণত শিকারের জন্য সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। খাদ্য তালিকা বেশ বিশাল। পানির আশপাশে আবাস হলে মাছই এদের প্রধান শিকার হয়। অনেক সময় এরা মৃত বা রুগ্‌ণ মাছও খায়। আহত, মৃত বা অপ্রাপ্ত বয়স্ক পাখি, স্তন্যপায়ী, ব্যাঙ, সরীসৃপ ও পোকামাকড়ও খায়। অন্য পাখি বা প্রাণীর কাছ থেকে এরা খাবার ছিনিয়ে নেয়। গ্রামে হাঁস-মুরগির ছানা ছিনতাই করতে এরা ওস্তাদ। বর্জ্যভুক পাখি হিসেবে কসাইখানা, বর্জ্যস্তূপ, ময়লাপোঁতা, মাছবাজার ও পোতাশ্রয়ে উচ্ছিষ্ট ও বর্জ্য খায়।

শকুনের সঙ্গে মিলে উচ্ছিষ্ট বা পশুর মৃতদেহও খায়। খাদ্যের সন্ধানে এরা আকাশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অলস ভঙ্গিমায় চক্কর কেটে বেড়ায়। খুব কমই ডানা ঝাপটায়। ডানার তুলনায় শরীর হালকা হওয়ায় অনেক্ষণ ডানা না ঝাপটে ভেসে বেড়াতে পারে। নৌকার হালের মতো লেজ ব্যবহার করে ঝটপট দিক বদল করতে পারে। উড়তে পারে বাতাসের প্রতিকূলেও। খাদ্যের সন্ধান পেলে ডানা গুটিয়ে ফেলে ও ঝাঁপ দেয় এবং মুহূর্তের মধ্যে উড়ে চলে যায়। শিকার ধরে।

মার্চ থেকে মে ভুবন চিলের প্রধান প্রজনন ঋতু। এ সময় পুরুষ চিল আকাশে চক্রাকারে উড়তে থাকে। হঠাৎ ঝাঁপ দিয়ে ডালে বসে থাকা স্ত্রী চিলের পিঠে এসে নামে। স্থানভেদে প্রজনন মৌসুমে বিভিন্নতা দেখা যায়। উঁচু গাছে কাঠি, ডালপালা দিয়ে এলোমেলো মাচার মতো বাসা তৈরি করে। উঁচু দালানে পানির ট্যাঙ্কেও বাসা করতে পারে। বাসায় নষ্ট কাগজ, পাখির পালক, ছেঁড়া কাপড়, শুকনো গোবর, কাদা, উজ্জ্বল প্লাস্টিকের বস্তুও থাকে। বাসার উচ্চতা ভূমি থেকে ৫ মিটার থেকে ৩০ মিটার পর্যন্ত হয়।

বাসা বানানো হয়ে গেলে ২-৪টি ডিম পাড়ে। ৩০ থেকে ৩৪ দিনে ডিম ফুটে ছানা বের হয়। ছানারা প্রায় দুই মাস বাসায় থাকে। স্ত্রী ও পুরুষ উভয় চিলই বাসা বানায়, ডিমে তা দেয় ও সন্তান লালন-পালনের ভার নেয়। দুই বছর বয়সে ছানারা প্রজননক্ষম হয়।

ভুবন চিলের মতো শঙ্খ চিলও নদী-নালা, জলাশয়ের আশপাশে এদের বেশি দেখা যায়। শঙ্খের মতো সাদা এদের মাথা, ঘাড়, বুক। পেটের তলার পালকের ওপর মরিচাধরা খাড়া ছোট রেখা থাকে। ঠোঁট ছোট ও লেজ সব সময় গোলাকার ডগাযুক্ত। ডানায় থাকে লাল, দেহের নিচের দিক বহু রেখাসংবলিত। ডানা দুটি ও শরীরের অন্যান্য অংশ খয়েরি। শঙ্খচিলের গড় দৈর্ঘ্য ৪৮ সেন্টিমিটার। এরা জীবিত মাছ এবং জলজ প্রাণী খেয়ে জীবন ধারণ করে। ছোট সাপ, হাঁস-মুরগির বাচ্চা এদের প্রিয় খাদ্য। এরাও উঁচু স্থানে বাসা বাঁধে। ছোট ছোট ডাল ও শুকনো পাতা দিয়ে তৈরি হয় এসব বাসা। একই বাসা এরা বছরের পর বছর ধরে ব্যবহার করে। শঙ্খ চিল দুটি করে ডিম দেয়। মা-বাবা দুজনে মিলে বাচ্চা বড় করে। ডিমে তা দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে শুধু স্ত্রী চিল। ২৬-২৯ দিনে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। এরা বড় জলাশয়ের পাশে এবং সুন্দরবনে বড় বড় ঝাঁকে বাস করে। সুযোগ পেলে জেলে নৌকা বা ট্রলার অনুসরণ করে। ডানা মেলে শূন্যে ভেসে থাকে।

কিন্তু বর্তমানে গ্রামবাংলায় এদের বিচরণক্ষেত্র একেবারেই সীমিত হয়ে পড়ছে। আগের মতো আর চোখে পড়ে না সোনালি ডানার চিল। চিল রক্ষায় সরকারি উদ্যোগও চোখে পড়ে না। ১৯৭৪ সালের বন্য প্রাণী আইনে আলাদাভাবে চিলের প্রজাতিকে রক্ষা করার কথাও বলা হয়েছে।

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৫ জুন ২০১৪/পলাশ/রণজিৎ/এএ


রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়