সুমেরীয় রূপকথা: লিলিথ নির্বাসিত, অভিশপ্ত ও অন্ধকারের প্রতীক
সাতসতেরো ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম
লিলিথ স্বেচ্ছায় স্বর্গ ত্যাগ করেছিলেন। ছবি: সংগৃহীত
অন্ধকার ও আকর্ষণের মিশেলে গড়া এক রহস্যময় নারী—লিলিথ। সুমেরীয় রূপকথায় অনুযায়ী লিলিথ এমন এক চরিত্র, যাকে ঘিরে ভয়, বিস্ময় আর বিদ্রোহ একসঙ্গে জড়িয়ে আছে। ইহুদি দর্শন অনুযায়ী, আদমের একাকীত্ব দূর করতে স্রষ্টা প্রথম যে নারীকে সৃষ্টি করেন, তার নাম লিলিথ। লিলিথ জন্ম নিয়েছিলেন ঠিক সেই একই মাটি থেকে, যেখান থেকে আদমের সৃষ্টি। ফলে জন্মগতভাবেই তিনি ছিলেন সমান—না অধীন, না অনুগত।
লিলিথ ছিলেন আত্মসম্মানবোধে পূর্ণ এক নারী। নিজের অস্তিত্ব ও স্বাধীনতা নিয়ে আপসহীন। এই দাবিই আদমের সঙ্গে তার দ্বন্দ্বের মূল কারণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষেত্রেই সংঘাত চরমে পৌঁছায়। আদম নিজেকে শ্রেষ্ঠ দাবি করে লিলিথকে অধীনস্থ অবস্থান মেনে নিতে বলেন। কিন্তু লিলিথ তা স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। তার যুক্তি ছিল সরল অথচ দৃঢ়—যদি দু’জনেরই সৃষ্টি একই মাটি থেকে, একই উপায়ে হয়ে থাকে, তবে একজন কেন অন্যজনের উপর আধিপত্য করবে?
এই মতানৈক্য ক্রমেই অসহনীয় হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত লিলিথ স্বেচ্ছায় স্বর্গ ত্যাগ করেন। আদমের কর্তৃত্বের অধীনে থাকার চেয়ে নির্বাসনই তার কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। স্বাধীনতার মূল্য হিসেবে তিনি বেছে নেন একাকীত্ব ও অনিশ্চয়তা।
লিলিথের এই চলে যাওয়া আদম মেনে নিতে পারেননি। তিনি স্রষ্টার কাছে অভিযোগ জানান—এমন এক সঙ্গিনী তাকে কেন দেওয়া হলো, যে তার কথা শোনে না, যে তাকে ছেড়ে পালিয়ে যায়? স্রষ্টা তিনজন ফেরেশতাকে পাঠান লিলিথকে ফিরিয়ে আনতে। ফেরেশতারা তাকে খুঁজে পান মিশরের এক সমুদ্রতীরে। তারা স্রস্টার বার্তা পৌঁছে দেন—যদি সে ফিরে আসে এবং আদমের কর্তৃত্ব মেনে নেয়, তবে তাকে ক্ষমা করা হবে। আর যদি সে প্রত্যাখ্যান করে, তবে অপেক্ষা করছে কঠোর শাস্তি।
লিলিথ সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। তিনি ফিরে যেতে অস্বীকার করেন। শাস্তির কথা জেনেও মাথা পেতে নেন নিজের নিয়তি। স্বর্গে ফিরে গিয়ে অধীনতার জীবন বেছে নেওয়ার চেয়ে অভিশপ্ত হওয়াই তার কাছে বেশি সম্মানজনক মনে হয়। এভাবেই লিলিথ হয়ে ওঠেন নির্বাসিত, অভিশপ্ত—অন্ধকারের এক প্রতীক।
ইহুদি শাস্ত্রে লিলিথ নামের অর্থ ‘রাত্রি’। সেখান থেকেই তাকে অনেক সময় অন্ধকারের পিশাচ, ভয়ংকর নারী সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু সাহিত্যিক ও দার্শনিক দৃষ্টিতে লিলিথ কেবল অশুভ কোনো চরিত্র নন। তিনি এক গভীর প্রতীক—বিদ্রোহের, আত্মমর্যাদার এবং স্বাধীনতার।
কারও চোখে লিলিথ স্বর্গের সুখ ত্যাগ করা এক নির্বোধ নারী। আবার কারও দৃষ্টিতে তিনি নিজের অধিকারের জন্য একা দাঁড়িয়ে পড়া এক দৃঢ়চেতা প্রতিবাদী চরিত্র। অন্ধকারের প্রতিরূপ হয়েও তিনি হয়ে ওঠেন প্রশ্ন তোলার সাহসী কণ্ঠস্বর। লিলিথের চরিত্র তাই একমাত্রিক নয়—তার অর্থ ও মূল্যায়ন সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে দৃষ্টিভঙ্গির ওপর।
এই দ্বৈততা, এই বিদ্রোহ আর এই আত্মমর্যাদাই লিলিথকে যুগ যুগ ধরে করে তুলেছে ভয়ংকর হলেও অসম্ভব আকর্ষণীয়।
ঢাকা/লিপি