ঢাকা     মঙ্গলবার   ২৬ মে ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ১২ ১৪৩৩ || ৯ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

সিলেটে ‘আইসোলেশনে’ ছিলেন বিদ্রোহী কবি 

মোসাইদ রাহাত || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৫:০৫, ২৬ মে ২০২৬   আপডেট: ১৫:০৬, ২৬ মে ২০২৬
সিলেটে ‘আইসোলেশনে’ ছিলেন বিদ্রোহী কবি 

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম

বর্তমানে ‘আইসোলেশন’ ও ‘কোয়ারেন্টাইন’ শব্দ দুটি পরিচিত। বিশেষ করে করোনা মহামারির পর শব্দ দুটির সঙ্গে পরিচিত নন এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু অনেকেই জানেন না, আজ থেকে প্রায় একশ বছর আগে সিলেটে এসে ‘আইসোলেশনে’ থাকতে হয়েছিল বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে। তাও আবার এক-দুই দিনের জন্য নয়, পুরো এক মাস। 

ঘটনাটি ১৯২৫ সালের। কিছু সূত্রে ১৯২৬ সালের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সিলেটের সাহিত্যিক ও গবেষকদের একটি বড় অংশের মতে, নজরুলের প্রথম সিলেট সফর হয়েছিল ১৯২৫ সালেই। সেই সফরের স্মৃতি, অসুস্থতা, আড্ডা আর কবির গুটিবসন্তে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা আজও সিলেটের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক ব্যতিক্রমী অধ্যায় হয়ে আছে।

কংগ্রেসের আমন্ত্রণে সিলেটে নজরুল

সে সময় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দেশজুড়ে ব্যাপক জনসংযোগ কার্যক্রম চালাচ্ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় সিলেটের কংগ্রেস নেতারা কবি নজরুলকে আমন্ত্রণ জানান। তখন বিদ্রোহী কবির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাজুড়ে। ‘বিদ্রোহী’, ‘ভাঙার গান’, ‘সাম্যবাদী’ কিংবা গণমানুষের চেতনায় আগুন ধরানো অসংখ্য কবিতা ও গান তাকে তরুণ সমাজের অনন্য প্রতীকে পরিণত করেছিল।

আমন্ত্রণ পেয়ে তরুণ নজরুল প্রথমবারের মতো সিলেটে আসেন। তখন তার বয়স মাত্র পঁচিশ কিংবা ছাব্বিশ। প্রাণবন্ত, হাস্যোজ্জ্বল, আড্ডাপ্রিয় এবং দুর্দান্ত বাকপটু এই কবিকে ঘিরে সিলেট শহরে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। কবিকে নিজেদের বাড়িতে আতিথ্য দিতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন শহরের প্রভাবশালী ও শিক্ষিত সমাজের অনেকেই। হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই তাকে কাছে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন।

রায় বাহাদুরের বাড়িতে ওঠেন নজরুল

সফরের শুরুতেই কবির থাকার ব্যবস্থা করা হয় নয়াসড়কে রায় বাহাদুর রমণী মোহন দাসের বাসায়। কংগ্রেসের নেতারা আগে থেকে এই ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। কিন্তু সিলেটে পৌঁছানোর পর কবির জ্বর দেখা দেয়। প্রথমে বিষয়টিকে সাধারণ জ্বর হিসেবেই ধরা হয়েছিল। কারণ দীর্ঘ সফর, মানুষের ভিড়, সভা-সমাবেশ— এসব কারণে ক্লান্তি থেকে জ্বর হওয়া অস্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু জ্বর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। তবুও কবিকে ঘিরে মানুষের উচ্ছ্বাস কমছিল না। রায় বাহাদুরের বাড়িতে দিনরাত দর্শনার্থীদের ভিড় লেগেই থাকত। কবির সঙ্গে কথা বলা, গান শোনা, কবিতা আবৃত্তি কিংবা শুধুই তাকে একনজর দেখার জন্য মানুষ ভিড় করত।

একলিমুর রেজার জেদের কাছে হার মানলেন সবাই

সেই সময় সিলেটের বিখ্যাত মরমী সাধক ও কবি হাসন রাজার পুত্র একলিমুর রেজা ছিলেন সাহিত্যপ্রেমী ও উদার ব্যক্তিত্বের মানুষ। তিনি নিজেও কবিতা লিখতেন। নজরুল সিলেটে এসেছেন শুনে তিনিও কবিকে নিজের বাসায় নিয়ে যেতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। সঙ্গে ছিলেন তরুণ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ। 

একলিমুর রেজা সরাসরি রায় বাহাদুরের বাসায় গিয়ে নজরুলকে তার জিন্দাবাজারের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু আয়োজকেরা এতে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না। কারণ নজরুলকে ঘিরে তখন সেখানে জমে উঠেছিল সাহিত্য ও রাজনীতির প্রাণবন্ত আড্ডা। কিন্তু হাসন রাজার পুত্র হিসেবে একলিমুর রেজার সামাজিক প্রভাব ছিল যথেষ্ট। শেষ পর্যন্ত তার জেদের কাছে হার মানেন সবাই।

জমে উঠেছিল আড্ডা ও কবিতার আসর

একলিমুর রেজার জিন্দাবাজারের বাড়িতে নেওয়ার পর আবারও জমে ওঠে আড্ডা। চায়ের আয়োজন হয়। সাহিত্য, গান, রাজনীতি নানা বিষয়ে প্রাণখোলা আলোচনা চলতে থাকে। এক পর্যায়ে একলিমুর রেজা নিজের লেখা ‘দেবতার পরিণাম’ কবিতাটি নজরুলকে শোনান। কবিতা শুনে নজরুল মজার ছলে বলেন “ভাই, আপনি ফার্স্টক্লাস বাপের ছেলে, তাই ফার্স্টক্লাস হয়েছেন। আমরা থার্ডক্লাস বাপের ছেলে, আর কতদূর অগ্রসর হতে পারি!”

নজরুলের কথায় উপস্থিত সবাই কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেও একলিমুর রেজা সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেন, “আমি ফার্স্টক্লাস বাপের ছেলে বলেই হয়েছি থার্ডক্লাস, আর তুমি থার্ডক্লাস বাপের ছেলে বলেই হয়েছো ফার্স্টক্লাস।” এই রসিক উত্তরে হেসে ওঠেন নজরুল। মুহূর্তেই পুরো ঘর প্রাণখোলা হাসিতে ভরে যায়। এ ঘটনাটি পরবর্তীতে সিলেটের সাহিত্যাঙ্গনে অনেকবার আলোচিত হয়েছে।

জ্বর বাড়তেই থাকে

কিন্তু আনন্দঘন পরিবেশ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। কারণ নজরুলের জ্বর ক্রমেই বাড়ছিল। অসুস্থতার কারণে বেশিক্ষণ একলিমুর রেজার বাসায় থাকতে পারেননি তিনি। পরে তাকে আবার রায় বাহাদুরের বাসায় ফিরিয়ে আনা হয়। সেখানে তার সেবা-শুশ্রূষার ত্রুটি হয়নি। তবুও জ্বর কমছিল না। বরং কয়েকদিনের মধ্যেই তার শরীরে গুটিবসন্তের লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে।
তখনকার সময়ে গুটিবসন্ত ছিল অত্যন্ত ভয়ংকর ও সংক্রামক রোগ। আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা তখনো এতটা উন্নত হয়নি। ফলে এই রোগে মৃত্যুহারও ছিল অনেক বেশি।

শুরু হয় ‘আইসোলেশন’

নজরুলের শরীরে গুটিবসন্ত দেখা দেওয়ার পর তাকে আলাদা কক্ষে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কারণ আশঙ্কা ছিল, অন্যদের মধ্যেও রোগটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। বর্তমান ভাষায় এটিকে ‘আইসোলেশন’ বলা যায়। আজকের মতো তখন ‘আইসোলেশন’ শব্দটি সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ছিল না। কিন্তু সংক্রামক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা করে রাখার প্রথা বহু আগে থেকেই ছিল। মূল উদ্দেশ্য ছিল রোগের বিস্তার ঠেকানো। সে অনুযায়ী নজরুলকে প্রায় এক মাস জনবিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকতে হয়েছিল।

প্রাণখোলা, আড্ডাবাজ ও মানুষের ভিড়ে থাকতে অভ্যস্ত নজরুলের জন্য সময়টা সহজ ছিল না বলেই ধারণা করা হয়। কারণ সিলেটে এসে যাকে ঘিরে শহরজুড়ে উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছিল, তাকেই হঠাৎ করে নিঃসঙ্গ ঘরে বন্দি হয়ে থাকতে হয়।

দীর্ঘ প্রায় এক মাস চিকিৎসা ও বিশ্রামের পর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন নজরুল। এরপর তিনি কলকাতা ফিরে যান। তবে সিলেটের সঙ্গে তার সম্পর্ক সেখানেই শেষ হয়নি। প্রায় দুই বছর পর, ১৯২৮ সালে আবারও সিলেট সফরে আসেন তিনি। এবার আর অসুস্থতা তাকে আটকে রাখতে পারেনি। বরং স্থানীয়দের সঙ্গে মিশে যান আরও ঘনিষ্ঠভাবে। বিভিন্ন স্মৃতিচারণে উল্লেখ রয়েছে, দ্বিতীয় সফরে এসে নজরুল সিলেটি ভাষাও কিছুটা রপ্ত করেছিলেন।

বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী কবির জীবন নিয়ে অসংখ্য আলোচনা থাকলেও তার সিলেট সফরের এই ঘটনাটি তুলনামূলক কম পরিচিত। অথচ এটি শুধু একজন কবির অসুস্থতার কাহিনী নয়; বরং সে সময়ের সামাজিক বাস্তবতা, মানুষের আন্তরিকতা এবং সংক্রামক রোগ মোকাবিলার পুরোনো পদ্ধতিরও একটি ঐতিহাসিক দলিল।

করোনা-পরবর্তী পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে তাই প্রায় এক শতাব্দী আগের সেই ঘটনাটি নতুন অর্থে ফিরে আসে। ইতিহাসের পাতায় ভেসে ওঠে এক তরুণ কবির ছবি যিনি সিলেটে এসে মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছিলেন, আবার একই শহরে কাটিয়েছিলেন এক মাসের নিঃসঙ্গ আইসোলেশন।

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়