বিক্ষোভে উত্তাল ইরান, নিহত অন্তত ৩৬
ইরানে গত ১০ দিন ধরে চলা বিক্ষোভে অন্তত ৩৬ জন নিহত হয়েছেন বলে একটি মানবাধিকার সংস্থা জানিয়েছে। খবর বিবিসির।
হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি (এসইআরএএনএ) দাবি করেছে, নিহতদের মধ্যে ৩৪ জন বিক্ষোভকারী এবং ২ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। ইরান কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক মৃত্যু তালিকা প্রকাশ করেনি। তবে তেহরান জানিয়েছে, ৩ জন নিরাপত্তা কর্মী নিহত হয়েছেন।
বিবিসি পার্সিয়ান সার্ভিস এখন পর্যন্ত ২০ জনের মৃত্যু ও পরিচয় নিশ্চিত করতে পেরেছে।
এসইআরএএনএ আরো জানিয়েছে, অর্থনৈতিক সংকট থেকে শুরু হওয়া এই অস্থিরতায় ৬০ জনেরও বেশি বিক্ষোভকারী আহত হয়েছেন এবং ২ হাজার ৭৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই বিক্ষোভ এখন পর্যন্ত ইরানের ৩১টি প্রদেশের মধ্যে ২৭টিতে ছড়িয়ে পড়েছে।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় ইরানের আধা-সরকারি গণমাধ্যম জানিয়েছে, পশ্চিমের ইলাম প্রদেশের মালেকশাহিতে ‘দাঙ্গাকারীদের’ গুলিতে একজন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। সেখানে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ব্যাপক বিক্ষোভ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমন-পীড়ন লক্ষ্য করা গেছে।
এর আগে, তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে দেশটির ধর্মীয় শাসকদের বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়ার সময় বিক্ষোভকারীদের ওপর টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপের ভিডিও পাওয়া গেছে।
গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভের মূলে ছিল মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রার (রিয়াল) ব্যাপক দরপতন। দেশটিতে মুদ্রাস্ফীতি ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে। পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে ইরানের ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে দেশটির অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে পড়েছে।
প্রাথমিকভাবে তেহরানের ব্যবসায়ীরা এই বিক্ষোভ শুরু করলেও দ্রুতই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এতে যোগ দেয় এবং তা বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়েছে।
গত শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়ে বলেছেন, “শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র আঘাত হানতে প্রস্তুত রয়েছে।”
অন্যদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেছেন, ‘দাঙ্গাকারীদের তাদের উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়া উচিত’ এবং তিনি ‘শত্রুর কাছে নতি স্বীকার করবেন না’ বলে অঙ্গীকার করেছেন।
ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম হোসেইন মোহসেনি এযেই গত সোমবার বলেছেন, কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকারীদের বৈধ অভাব-অভিযোগ শুনবে, কিন্তু ‘দাঙ্গাকারীদের’ প্রতি কোনো নমনীয়তা দেখানো হবে না।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং আরো হতাহত রোধে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
ইলাম প্রদেশের ইমান খোমেনি হাসপাতালে নিরাপত্তা বাহিনীর হামলার ভিডিও প্রকাশিত হওয়ার পর ব্যাপক জনরোষ সৃষ্টি হয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, রেভল্যুশনারি গার্ড ও পুলিশ সদস্যরা হাসপাতালের ভেতরে শটগান ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করেছে এবং চিকিৎসাকর্মীদের মারধর করেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এই হামলাকে ‘মানবতার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অপরাধ’ বলে অভিহিত করেছে। কুর্দি মানবাধিকার সংস্থা হেঙ্গাউ জানিয়েছে, তারা এখন পর্যন্ত ৫ শিশুসহ অন্তত ২৭ জনের মৃত্যুর খবর যাচাই করতে পেরেছে।
নরওয়েভিত্তিক সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস-এর পরিচালক মাহমুদ আমিরি-মোগাদ্দাম সতর্ক করে বলেছেন, “সরকার এখন নিজের অস্তিত্ব নিয়ে শঙ্কিত, তাই এবারের দমন-পীড়ন আগের চেয়ে আরও সহিংস হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”
এর আগে ২০২২ এবং ২০২৩ সালে ইরানজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখা দিয়েছিল। সে সময় কঠোর হিজাব আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে পুলিশ হেফাজতে ২২ বছর বয়সী মাহসা আমিনীর মৃত্যুর পর হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। সেই বিক্ষোভে ৫৫০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হন, ২০ হাজারেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
ঢাকা/ফিরোজ