তেলবাহী ট্যাংকার নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া
মার্কিন বাহিনীর ধাওয়া করা একটি তেলবাহী ট্যাংকারের নিরাপত্তায় যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছে রাশিয়া। ট্যাংকারটি জব্দ করার চেষ্টা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে রাশিয়া সেটিকে পাহাড়া দিয়ে আটলান্টিক মহাসাগর দিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে খালি থাকা এই ট্যাংকারটি ঐতিহাসিকভাবে ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল পরিবহন করে থাকে। মঙ্গলবার এটি স্কটল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের মধ্যবর্তী কোনো অবস্থানে ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত মাসে প্রেসিডেন্ট মার্কিন ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলায় আসা-যাওয়া করা নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর ওপর ‘অবরোধ’ আরোপের নির্দেশ দিয়েছিলেন। ভেনেজুয়েলা সরকার এই পদক্ষেপকে ‘তেল চুরি’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
গত শনিবার ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো মার্কিন বাহিনীর হাতে আটকের আগে, ট্রাম্প বারবার অভিযোগ করেছিলেন যে, ভেনেজুয়েলা সরকার তেলবাহী ট্যাংকার ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচার করছে।
গত মাসে ক্যারিবীয় অঞ্চলে থাকাকালীন মার্কিন কোস্ট গার্ড ‘বেলা-১’ নামের ওই ট্যাংকারটিকে আটকের চেষ্টা করেছিল। ট্যাংকারটির বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইরানি তেল পরিবহনের অভিযোগ ছিল এবং সেটি জব্দের পরোয়ানা ছিল।
কিন্তু এরপর ট্যাংকারটি নাটকীয়ভাবে তার গতিপথ পরিবর্তন করে এবং নাম বদলে ‘মেরিনেরা’ রাখে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ধাওয়ার মুখে তেল ট্যাংকারটি গায়ানার পতাকা পরিবর্তন করে রাশিয়ার পতাকাবাহী জাহাজে পরিণত হয়।
এরপর ইউরোপের দিকে ট্যাংকারটি এগিয়ে যেতে থাকলে প্রায় ১০টি মার্কিন সামরিক পরিবহন বিমান এবং হেলিকপ্টারের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। রাশিয়া জানিয়েছে, তারা তেল ট্যাংকারটি ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি ‘উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ’ করছে।
মঙ্গলবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজকে দুজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, মার্কিন বাহিনী ট্যাংকারটিতে ওঠার পরিকল্পনা করছিল এবং ওয়াশিংটন তেল ট্যাংকারটি ডুবিয়ে দেওয়ার চেয়ে জব্দ করাকেই প্রাধান্য দিচ্ছে।
মঙ্গলবার রাতে মার্কিন বাহিনী স্কটল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের মাঝখানে ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবে দূরত্ব এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ট্যাংকারটিতে অভিযান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
যুক্তরাজ্যর মার্কিন ঘাঁটি থেকে সামরিক অভিযান চালানোর আগে ওয়াশিংটন তাদের মিত্র যুক্তরাজ্যকে অবহিত করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আপাতত যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অন্য দেশের সামরিক কার্যক্রম নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
সিবিএস নিউজকে মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র গত মাসের মতো একটি অভিযান পরিচালনা করতে পারে। গত মাসে মার্কিন মেরিন এবং বিশেষ বাহিনী কোস্ট গার্ডের সঙ্গে মিলে ‘দ্য স্কিপার’ নামক একটি বড় অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকার জব্দ করেছিল।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনো দেশের পতাকাবাহী জাহাজ সেই দেশের সুরক্ষায় থাকে।
তবে মেরিটাইম ইন্টেলিজেন্স ফার্ম ‘কেপলার’-এর বিশ্লেষক দিমিত্রিস আম্পাতজিদিস বিবিসিকে জানান, জাহাজের নাম বা পতাকা পরিবর্তন খুব একটা কাজে নাও আসতে পারে। তিনি বলেন, “মার্কিন পদক্ষেপ মূলত জাহাজের আইএমও নম্বর, মালিকানা এবং নিষেধাজ্ঞার ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়, জাহাজের গায়ের নাম বা পতাকার ওপর নয়।”
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, “বর্তমানে আমাদের ট্যাংকারটি রুশ ফেডারেশনের পতাকাতলে এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন মেনেই উত্তর আটলান্টিকের আন্তর্জাতিক জলসীমায় চলাচল করছে।” রাশিয়া আরো অভিযোগ করেছে, একটি শান্তিপূর্ণ ট্যাংকার হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো বাহিনী কেন সেটির প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ দিচ্ছে তা তাদের কাছে অস্পষ্ট।
তেল ট্যাংকারটি নিয়ে এই উত্তেজনা এমন এক সময়ে তৈরি হলো যখন কয়েক দিন আগেই ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস থেকে দেশটির প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে ‘অপহরণ’ করে বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অস্ত্র ও মাদক অপরাধের সন্দেহে মাদুরো এবং তার স্ত্রীকে আটক করার সময় কারাকাসে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে বোমাবর্ষণ করা হয়েছিল।
ঢাকা/ফিরোজ