‘পরবর্তী হামলায় বিন্দুমাত্র সংযম নয়’, হুঁশিয়ারি ইরানের
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি
ইরান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, দেশটির জ্বালানি স্থাপনা যদি আবারো লক্ষ্যবস্তু করা হয়, তাহলে তারা ‘বিন্দুমাত্র সংযম’ দেখাবে না।
ইসরায়েল ইরানের গুরুত্বপূর্ণ ‘সাউথ পার্স’ গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালানোর একদিন পর এবং এর প্রতিক্রিয়ায় তেহরান উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে পাল্টা হামলা চালানোর পর এই হুঁশিয়ারি এলো। খবর আল-জাজিরার।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে বলেন, “ইসরায়েলের আমাদের অবকাঠামোতে হামলার জবাবে আমরা আমাদের শক্তির মাত্র একটি ভগ্নাংশ ব্যবহার করেছি। সংযম দেখানোর একমাত্র কারণ ছিল উত্তেজনা প্রশমনের অনুরোধের প্রতি সম্মান প্রদর্শন। কিন্তু আমাদের অবকাঠামোতে পুনরায় আঘাত করা হলে আমরা আর কোনো সংযম দেখাব না।”
সাউথ পার্স হলো ইরানের অভ্যন্তরীণ গ্যাস সরবরাহের বৃহত্তম উৎস, যা দেশটির প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদার ৮০ শতাংশ পূরণ করে।
এই সতর্কতা এমন এক সময়ে এলো যখন কাতার তাদের ‘রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি’ সাইটের ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন করছে। এই সাইটটি বিশ্বব্যাপী লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত করে, যা ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কাতারএনার্জি-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাদ আল-কাবির মতে, এই হামলার ফলে কাতারের এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতার প্রায় ১৭ শতাংশ ধ্বংস হয়ে গেছে, যার ফলে বার্ষিক আনুমানিক ২০ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব ক্ষতি হতে পারে এবং ইউরোপ ও এশিয়ায় জ্বালানি সরবরাহ হুমকির মুখে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তিনি জানান, কাতারের ১৪টি এলএনজি ট্রেনের (গ্যাস তরলীকরণের যন্ত্র) মধ্যে দুটি এবং এর দুটি গ্যাস-টু-লিকুইড কারখানার মধ্যে একটি এই সপ্তাহের ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, এই মেরামতের কাজের জন্য বছরে ১২.৮ মিলিয়ন টন এলএনজি উৎপাদন ৩ থেকে ৫ বছরের জন্য বন্ধ থাকবে।
আল-কাবি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “আমি স্বপ্নেও ভাবিনি যে কাতার এবং এই অঞ্চলটি এমন একটি হামলার শিকার হবে, বিশেষ করে পবিত্র রমজান মাসে একটি ভ্রাতৃপ্রতিম মুসলিম দেশের কাছ থেকে এই ধরনের আক্রমণ আসবে।”
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যকার যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় তেহরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে।
এদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এক সংবাদ সম্মেলনে পুনর্ব্যক্ত করেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের লক্ষ্য হলো পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি দূর করা ‘সেগুলো মাটির গভীরে লুকিয়ে রাখার এবং আকাশপথের আক্রমণের নাগালের বাইরে যাওয়ার আগেই’।
নেতানিয়াহু বলেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ‘ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির উপাদান উৎপাদনকারী কারখানাগুলো ধ্বংস করছে এবং তাদের শিল্প ভিত্তিকে এমনভাবে নির্মূল করছে যা আগে কখনো করা হয়নি’। তিনি দাবি করেন, ইরানের ‘কমান্ড ও কন্ট্রোল কাঠামো সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খলার মধ্যে রয়েছে’।
নেতানিয়াহু জোর দিয়ে আরো বলেন, ইসরায়েল একাই ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালিয়েছে। তবে তিনি যোগ করেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুরোধে জ্বালানি অবকাঠামোতে আরও হামলা চালানো থেকে আপাতত বিরত থাকবে ইসরায়েল।
এর আগে বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি ইসরায়েলকে ইরানের প্রাকৃতিক গ্যাস অবকাঠামোতে হামলার পুনরাবৃত্তি না করতে বলেছেন, কারণ এই পাল্টাপাল্টি হামলার ফলে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়ে গেছে।
জ্বালানি অবকাঠামোতে ইরানের পাল্টা হামলাগুলো উপসাগরীয় আরব প্রতিবেশীদের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধি করেছে, তারা এই হামলাগুলোকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে। ইরান কার্যকরভাবে হরমুজ প্রণালীও অবরোধ করেছে, যা বিশ্বের তেল ও এলএনজি সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। এর ফলে পেট্রোলের দাম বেড়ে গেছে এবং বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আল-কাবি বলেন, “ইসরায়েল যদি ইরানকে আক্রমণ করে, তাহলে তা ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার বিষয়। এর সঙ্গে আমাদের বা এই অঞ্চলের কোনো সম্পর্ক নেই। তাই এখন আমি বলছি যে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য যেকোনো দেশ- সবারই তেল ও গ্যাস স্থাপনা থেকে দূরে থাকা উচিত।”
ঢাকা/ফিরোজ